মাদারীপুরে নিখোঁজ ১০ জন তরুণের সন্ধান দাবি স্বজনদের। গত সোমবার বিকেলে সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের নয়াকান্দি এলাকায়
মাদারীপুরে নিখোঁজ ১০ জন তরুণের সন্ধান দাবি স্বজনদের। গত সোমবার বিকেলে সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের নয়াকান্দি এলাকায়

অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার পথে ১০ মাস ধরে নিখোঁজ ১০ তরুণ

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার পথে মাদারীপুরের ১০ জন তরুণ নিখোঁজ আছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। পরিবারের দাবি, প্রায় ১০ মাস ধরে তাঁরা নিখোঁজ। তাঁরা জীবিত আছেন নাকি মারা গেছেন তা-ও জানেন না কেউ। সন্তানদের সন্ধান পেতে দালাল চক্রকে তাঁরা ২৮ থেকে ৩০ লাখ টাকা করে দিয়েছেন।

নিখোঁজ তরুণেরা হলেন সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের নয়াকান্দি এলাকার আনোয়ার ব্যাপারীর ছেলে লিমন ব্যাপারী (১৯), হেমায়েত মাতুব্বরের ছেলে রবিউল মাতুব্বর (২২), একই ইউনিয়নের দত্তেরহাট এলাকার টিটু মাতুব্বরের ছেলে মো. জয় মাতুব্বর (২০), মোক্তার হাওলাদারের ছেলে জীদান হোসেন হাওলাদার (১৮), মস্তফাপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া এলাকার জুলহাস চোকদারের ছেলে ওয়ালিদ হাসান (১৯), পেয়ারপুর ইউনিয়নের মাছকান্দি এলাকার মোহাম্মদ আলী (২২), রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের মাচ্চর এলাকার আবুল বাশার মাতুব্বরের ছেলে শরিফুল ইসলাম (২৭), পাখুল্লা এলাকার হাশেম খাঁর ছেলে আজমুল খাঁ (৩০), মোল্লাকান্দি এলাকার কালু মজুমদারের ছেলে তুহিন মজুমদার (২৩) এবং মাদারীপুর শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকার মো. মাহাবুব হোসেন (২১)।

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাত্র ১৫ লাখ টাকায় ইতালি পৌঁছানোর প্রলোভনে পড়েন ওই ১০ তরুণ। তাঁদের প্রলোভন দেখান মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের গাজীরচর এলাকার জাহাঙ্গীর ঢালীর স্ত্রী পেয়ারা বেগম ও তাঁর চক্রের সদস্যরা। দালাল নিখোঁজ তরুণদের পরিবারের সঙ্গে ১৫ লাখ টাকায় প্রত্যেকের সঙ্গে সরাসরি ইতালি পৌঁছে দেওয়ার চুক্তি করেন। গত বছরের জানুয়ারিতে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে বাড়ি ছাড়েন লিমন ব্যাপারী, জয়, রবিউল মাতুব্বর, ওয়ালিদ হাসান, জীদান হোসেন, শরিফুল ইসলাম, আজমুল খাঁ, মোহাম্মদ আলী, তুহিন মজুমদার ও মাহবুব। তাঁদের বাংলাদেশ থেকে প্রথমে দুবাই নেওয়া হয়। সেখানে কয়েক দিন রাখার পর সবাইকে লিবিয়ার একটি শহরের বন্দীশালায় আটকে রাখা হয়। এরপরে তাঁদের মুক্তিপণের জন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে লিবিয়ার দালাল চক্র। পরে প্রত্যকের পরিবার থেকে মুক্তিপণের জন্য ১৩ থেকে ১৫ লাখ টাকা আদায় করা হয়। শেষমেশ দালালের মাধ্যমে ওই বছরের এপ্রিলের শুরুতে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় লিবিয়ার উপকূল থেকে ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করে ওই তরুণেরা। কিন্তু এরপর আর তাঁদের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

নিখোঁজ লিমনের বাবা আনোয়ার ব্যাপারী বলেন, ‘দালাল পেয়ারা বেগমের প্রলোভনে পড়ে আমার ছেলে পাগল হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে পাসপোর্ট ও টাকা জমা দেই। লিবিয়া আটকে আদায় করে মোট ২৮ লাখ টাকা। কিন্তু গত ১০ মাস ধরে আমার সন্তানের কোনো খোঁজ নাই। আমার টাকাও গেল। ছেলেডারও কোনো সন্ধান আজ অবদি পাইলাম না।’

জয়ের বাবা টিটু মাতুব্বর বলেন, ‘আমার ছেলে পেয়ারা বেগমের বাড়িতে কাজ করত। সেখান থেকেই লোভ দেখায়। পরে লিবিয়া নিয়ে একবার মাফিয়াদের কাছে ধরা খাওয়াইছে। পরে ১২ লাখ টাকা দিলে মুক্তি হয়। এরপর গত বছরের এপ্রিল মাস থেকে আর কোনো খবর পাচ্ছি না। টেলিফোনেও কোনো যোগাযোগ হয় না। একমাত্র পেয়ারা বেগমই জানেন, আমার আদরের সন্তানেরা কোথায় আছে। এখন পেয়ারা বেগমেরও খোঁজ পাই না।’

শরিফুলের মা রাজিয়া বেগম বলেন, ‘পেয়ারা বেগম ও তার লোকজন গত বছরের ১২ এপ্রিলের পর আমার ছেলের সাথে আর যোগাযোগ করতে দেয় নাই। আমার ছেলে বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে তা-ও জানি না। আমি আমার ছেলের সন্ধান চাই। আর দালালদের কঠিন বিচার চাই।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় দালাল পেয়ারা বেগমের বড় ছেলে ফারদিন ঢালী ইতালিপ্রবাসী। তিনি ইতালি অবস্থান করে মানবপাচারের নির্দেশনা দেন। আর ছোট ছেলে সৌরভ ঢালী অভিবাসনপ্রত্যাশী পরিবারের কাছে থেকে টাকা আদায় করেন। এর সঙ্গে জড়িত আছেন শরীয়তপুরের জালাল কাজীর ছেলে সবুজ কাজী ও লিয়াকত শেখের মুজাহিদ শেখও। সবুজ ও মুজাহিদ সম্পর্কে শ্যালক ও ভগ্নিপতি। এ ছাড়া পেয়ারা বেগমের ভাই আলী আকবরও এ চক্রে সঙ্গে জড়িত।

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে পেয়ারা বেগমের বাড়িতে গেলে পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেশীরা বলেন, প্রায় এক মাস ধরে লাপাত্তা পেয়ারা বেগম। জানতে চাইলে পেয়ারা বেগমের ছেলে সৌরভ ঢালী মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার মা কাউকে প্রলোভন দেখায় নাই। এটা ভুল কথা। তারা স্বেচ্ছায় গেছে। এখন উল্টো আমাদের নামে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে হয়রানির চেষ্টা করা হচ্ছে।’

মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অনুসন্ধান) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, নিখোঁজ ১০ তরুণের পরিবারের মধ্যে একজনের পরিবার একটি মামলা করেছে। সেই মামলায় তিনজন গ্রেপ্তার আছে। নিখোঁজ বাকিদের পরিবার থেকে লিখিত অভিযোগ দিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, কোনো দালাল ধরে বিদেশ যাত্রা থেকে বিরত থাকতে। কিন্তু এই কথা কেউই শুনছে না। এতে অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে। পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখের পড়ছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। মানবপাচার রোধে সবাইকে সচেতন হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।