
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো অবদান ছিল না, বক্তব্যে এমন মন্তব্য করায় পটুয়াখালীতে জেলা জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের এক নেতাকে অনুষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রতিবাদের মুখে তাঁকে বের করে দিতে বাধ্য হয় জেলা প্রশাসন।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ওই নেতার নাম মাওলানা আবদুল হক কাওসারী। তিনি পটুয়াখালী জেলা শাখার সভাপতি। অনুষ্ঠান থেকে তাঁকে বের করে দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহান স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে গতকাল বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজন করে জেলা প্রশাসন। এদিন দুপুরে জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে জেলা-উপজেলার প্রায় ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী, পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ তারেক হাওলাদারসহ আরও অনেকে।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা আবদুল হক কাওসারী মঞ্চে উঠে বক্তব্যের শুরুতে বলেন, তিনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করেন, কিন্তু স্বাধীনতার যুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো অবদান নেই এবং তিনি তা স্বীকার করেন না। তাঁর এমন বক্তব্য শুনে উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং তাঁকে রাজাকার বলে গালমন্দ করেন। এ সময় মিলনায়তনে হট্টগোল ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে জেলা প্রশাসন ও দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের শান্ত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এরপর মুক্তিযোদ্ধাদের দাবির মুখে আবদুল হককে অনুষ্ঠান থেকে চলে যেতে বলে জেলা প্রশাসন। এ সময় তিনি দ্রুত শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তন ত্যাগ করেন।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি কাজী দেলোয়ার হোসেন (দিলিপ) বলেন, ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পটুয়াখালী জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা আবদুল হক কাওসারী মঞ্চে উঠে প্রথমেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো অবদান ছিল না বলে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। তাঁর এমন বক্তব্য শুনে আমরা প্রতিবাদ করে তাঁকে অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যেতে বলি। এরপর তিনি দ্রুত অনুষ্ঠান থেকে চলে যান।’
সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুর সরদার রশীদ বলেন, জেলা প্রশাসন ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সংবর্ধনার আয়োজন করে। সেখানে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। এ সময় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আসা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম দলের এক নেতা তাঁর বক্তব্যে বলেন, মহান স্বাধীনতার যুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো অবদান ছিল না। এটি শুনে সব মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে বেরিয়ে যেতে বলেন। পরে জেলা প্রশাসন তাঁকে বের করে দেয়।
বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী জানান, জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারকে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করা হয়। সেখানে সব রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিমন্ত্রণ করা হয়। অনুষ্ঠানে আসা এক রাজনৈতিক ব্যক্তি শেখ মুজিবুর রহমানকে জড়িয়ে আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়া হলে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা ক্ষিপ্ত হন এবং প্রতিবাদ করেন। এরপর ওই রাজনৈতিক ব্যক্তিকে অনুষ্ঠান ত্যাগ করতে বলা হলে তিনি চলে যান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা আবদুল হক মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেখানে আমরা সদ্য স্বাধীনতা পেয়েছি, দেশ স্বাধীন হয়েছে। তবে ২৫ মার্চ রাত থেকে স্বাধীনতা পর্যন্ত শেখ মুজিব সাহেবের এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পেছনে কোনো অবদান নেই—এটা সবাই স্বীকার করবে। আমি স্বাধীনতা বলতে বুঝিয়েছি ২৫ মার্চ রাত থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত শেখ মুজিবের কোনো ভূমিকা ছিল না। তখন তিনি পাকিস্তানে ছিলেন।’