ঢাবিতে ভর্তি হলেও পড়াশোনার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আকতারুল

আকতারুল ইসলাম
ছবি: সংগৃহীত

স্থানীয় লোকজনের আর্থিক সহযোগিতা পেয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আকতারুল ইসলাম ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে ঢাকায় থেকে পড়াশোনার খরচ চালানো নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর হয়নি। আকতারুল চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়নের নিমইল গ্রামের ক্ষুদ্র বর্গাচাষি মো. সাইফুদ্দিনের ছেলে। তিনি ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছেন। তবে দরিদ্র বাবার পক্ষে আকতারুলের পড়াশোনাসহ যাবতীয় খরচ চালানো সম্ভব নয়।

ছয় ভাইবোনের মধ্যে আকতারুল সবার ছোট। তাঁর তিন ভাইয়ের আলাদা সংসার। তাঁদের আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। মাঝেমধ্যে আবাদের কাজে বাবাকে সাহায্য করেন তাঁরা। আকতারুলের বাবা সাইফুদ্দিনের বয়স ৬০ বছর। তিনি অন্যের দুই বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করেন। তিনি এখন বেশির ভাগ সময় অসুস্থ থাকেন। তাই দিনমজুর দিয়ে আবাদ করতে হয়।

সাইফুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, আকতারুল পড়াশোনায় বেশ ভালো। কিন্তু তিনি কখনো ছেলের পড়াশোনার খরচ দিতে পারেননি। চার ছেলের মধ্যে এখন পর্যন্ত এক ছেলে স্নাতক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। অন্য ছেলেমেয়েরা বেশি দূর পড়তে পারেননি। এখন আখতারুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু ঢাকায় থেকে কীভাবে পড়াশোনার খরচ জোগাড় করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।

এসব কথা বলতে গিয়ে সাইফুদ্দিনের কণ্ঠ জড়িয়ে এল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, ‘হামি এমনই বাপ যে অল্পস্বল্প খরচই জুটাইতে পারছি না। ব্যাটাটা হামার কাজকাম কইর‍্যা লেখাপড়াটা চালাইলে। এখুন অকে লিয়াই হামার যত স্বপ্ন। চাকরি-বাকরি কইর‍্যা বাপ-মার দুখ দূর কোরবে। নিজের পায়ে দাঁড়াইবে। জীবনে মেলা কষ্ট কইরাছে ছেলা হামার।’

ছোটবেলা থেকেই আখতারুলের পড়াশোনার প্রতি বেশ আগ্রহ। পঞ্চম শ্রেণি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত সব পরীক্ষায় তিনি জিপিএ-৫ পেয়েছেন। স্থানীয় মৃধাপাড়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছেন আখতারুল। তাঁর পড়াশোনার ব্যাপারে ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন।

মৃধাপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই আখতারুল ছোটদের প্রাইভেট পড়িয়ে, জমিতে কাজ করে পড়াশোনা চালিয়ে আসছে। এখান থেকে এসএসসি পাস করার পর রাজশাহীতে পড়তে গিয়েছিল। রাজশাহীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হওয়ার টাকা জোগাড়ের জন্য সে যশোরে গিয়ে রাজমিস্ত্রির কাজ করেছে। আমরা শিক্ষকেরা মিলে তাঁর এসএসসির ফরম পূরণের টাকা দিয়েছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার খবর শুনে আমরা খুবই খুশি। আখতারুল এই গ্রামের মুখ, গ্রামের বিদ্যালয়ের মুখ উজ্জ্বল করেছে। মানুষের সহায়তা পেয়ে তাঁর উচ্চশিক্ষা সুগম হোক, এটাই চাই।’

রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক শাহাদত হোসেন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, আকতারুল খুব ভালো ছেলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার কথা শুনে কলেজের শিক্ষকেরা খুশি হয়েছেন। তাঁর সংগ্রামের কথা কলেজের শিক্ষকেরাও জানতেন। ফলে এখানে পড়াশোনার সময় বিনা খরচে তাঁকে কলেজের হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল।

ছোটবেলা থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখতেন আখতারুল। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এবার বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। আকতারুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘গোমস্তাপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও রহনপুর পৌর মেয়রের আর্থিক সহায়তা নিয়ে কেবল ভর্তি হয়েছি। সামনের দেড়-দুই বছর সহায়তা পেলে ভালো হতো। পরে আমি নিজেই প্রাইভেট পড়িয়ে চলতে পারব। ছোট থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখতাম। এখন বিসিএস ক্যাডার হয়ে মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাতে চাই। সে স্বপ্নও একদিন পূরণ হবে বলে বিশ্বাস করি।’

রহনপুর পৌর মেয়র মতিউর রহমান খান বলেন, মেধাবী আখতারুলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় তিনি সাধ্যমতো আর্থিক সহায়তা করেছেন। ভবিষ্যতেও সাহায্য করার চেষ্টা করবেন। তাঁর পড়াশোনার খরচ চালিয়ে নেওয়ার জন্য সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান মেয়র।