নওগাঁ শহরের ব্রিজের মোড়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে নির্মিত 'সশস্ত্র প্রতিরোধ' ভাস্কর্যটি ভাঙচুর করা হয় ৫ আগস্টের পর। এখন সেখানে ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতারা ফল বিক্রি করেন
নওগাঁ শহরের ব্রিজের মোড়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে নির্মিত 'সশস্ত্র প্রতিরোধ' ভাস্কর্যটি ভাঙচুর করা হয় ৫ আগস্টের পর। এখন সেখানে ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতারা ফল বিক্রি করেন

নওগাঁয় ভাঙচুরের দেড় বছরেও সংস্কার করা হয়নি মুক্তিযুদ্ধের তিন ভাস্কর্য

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নওগাঁয় মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে থাকা তিন ভাস্কর্য ভাঙচুরের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সংস্কার হয়নি। ভাঙাচোরা অবস্থায় ভাস্কর্যগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। জেলা প্রশাসন কিংবা গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সেগুলো সংস্কারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর নওগাঁ শহরের ব্রিজের মোড় ও মান্দা উপজেলার প্রসাদপুর বাজারের গোলচত্বরে মুক্তিযোদ্ধা স্তম্ভ এবং পত্নীতলা উপজেলার নজিপুর পৌরসভার জিরো পয়েন্ট এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর করা হয়। এখন কোথাও ভাস্কর্যগুলো মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, কোথাও ভাস্কর্যের অবশিষ্টাংশ পড়ে আছে।

জেলা প্রশাসন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের নওগাঁ কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছরেও ভেঙে ফেলা ভাস্কর্যগুলো সংস্কারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলো সংস্কারে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নওগাঁর নির্বাহী প্রকৌশলী এ এইচ এম শাহরিয়ার প্রথম আলোকে বলেন, নওগাঁর যেসব ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছে, সেগুলো সংস্কারে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। নতুন সরকারও এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা দেয়নি। সরকারি নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এগুলো সংস্কারের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নিতে তাঁরা পারছেন না।

৭ মার্চ শহরের ব্রিজের মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, ভাস্কর্যের একটি ভাঙা অংশ পড়ে আছে। ভাস্কর্যের জায়গায় ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতারা ফল বিক্রি করছেন। ফল বিক্রেতা জমির উদ্দিন বলেন, ‘এখানে মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর্য আছিল। ছাত্র আন্দোলনের সময় এটি ভ্যাঙে ফেলা হয়। ভাস্কর্যের কিছু ভাঙা অংশ অন্য জায়গায় সরে ফেলা হইছে। কিছু অংশ এখনো পড়ে আছে।’

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নওগাঁ জেলা ইউনিটের আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে নওগাঁর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেসব মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান জানাতে নওগাঁ শহর, নজিপুর পৌরসভা ও মান্দার প্রসাদপুরে মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছিল। ৫ আগস্ট সেই ভাস্কর্যগুলো মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে ফেলা হয়। এসব স্মৃতিচিহ্ন না থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলো আবার নির্মাণ করা উচিত।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও স্থানীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন একুশে পরিষদ নওগাঁর সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা আল মেহমুদ বলেন, নওগাঁ শহরের ব্রিজের মোড়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য ছিল। ৫ আগস্ট ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলা হয়। পরে স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা ভাস্কর্যটি সংস্কার করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু একটি ধর্মান্ধ গোষ্ঠী তাঁদের বাধা দেয়। সংস্কৃতিকর্মীদের মারধর করে সংস্কারকাজ করা থেকে তাড়িয়ে দেন। ভাঙা ভাস্কর্যটি আর সংস্কার করা সম্ভব নয়। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে নতুন করে কিছু করা যায়।