বাঁশি তৈরী করছেন যতীন্দ্র বিশ্বাস ও তাঁর স্ত্রী রীনা বিশ্বাস। শ্রীমদ্দি, হোমনা, কুমিল্লা, ১১ এপ্রিল
বাঁশি তৈরী করছেন যতীন্দ্র বিশ্বাস ও তাঁর স্ত্রী রীনা বিশ্বাস। শ্রীমদ্দি, হোমনা, কুমিল্লা, ১১ এপ্রিল

পয়লা বৈশাখ ঘিরে কুমিল্লার ‘বাঁশির গ্রামে’ অন্য রকম ব্যস্ততা

গ্রামে ঢুকতেই ভেসে আসে বাঁশির সুর—যেন বাতাসে মিশে আছে এক প্রাচীন কারুশিল্পের গল্প। দুই শতকের ঐতিহ্য ধারণ করে বংশপরম্পরায় বাঁশি তৈরি করেন গ্রামের বাসিন্দারা। ছোট ছোট মুলি বাঁশ, আগুনের ছেঁকা আর নিপুণ হাতে তৈরি সেই বাঁশি শুধু দেশের সীমানায় আটকে নেই, ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। জীবিকা, শিল্প আর আবেগ—সব মিলিয়ে গ্রামটি পরিচিতি পেয়েছে ‘বাঁশির গ্রাম’ হিসেবে।

কুমিল্লার হোমনা উপজেলার শ্রীমদ্দী গ্রামের বাসিন্দারা বংশপরম্পরায় পূর্বপুরুষের এই সৃষ্টিশীল কাজ করছেন। শ্রীমদ্দী গ্রামের অন্তত ৪০টি পরিবার ১৪ ধরনের বাঁশি তৈরির কাজে জড়িত। গ্রামের নারী-পুরুষ, এমনকি শিশুরা এই কাজ করে। পয়লা বৈশাখ সামনে রেখে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন বাঁশি তৈরির কারিগরেরা। বাঁশি কিনতে গ্রামে ভিড় করছেন দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা।

২০০ বছরের ঐতিহ্য

প্রবীণ বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রায় ২০০ বছর আগে শ্রীমদ্দী গ্রামে বাঁশি তৈরির প্রচলন শুরু হয়। গ্রামের কোকিল দাস বৈরাগী ও দীনবন্ধু দাস প্রথম বাঁশি তৈরির কাজটি শুরু করেন। তাঁদের ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে যাতায়াত ছিল। তাঁরা সেখান থেকে বাঁশি তৈরির প্রক্রিয়া শিখে এসে এই কাজ শুরু করেন। শুরুর দিকে অল্পসংখ্যক বাঁশি তৈরি করে নিজেরাই বিভিন্ন স্থানে ফেরি করে বিক্রি করতেন। নিজেরাও চমৎকার সুরে বাঁশি বাজাতে পারতেন। তাঁদের দেখে গ্রামের অন্যরা এ কাজ শেখেন। পরে গ্রামের বাসিন্দারা বংশপরম্পরায় বাঁশি তৈরি করে আসছেন।

শ্রীমদ্দী গ্রামের যতীন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস (৭০) ও তাঁর স্ত্রী রীনা রানী বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে বাঁশি তৈরি করছেন। ছোটবেলায় বাবা ভগবান বিশ্বাসের কাছ থেকে তিনি এই কাজ শিখেছেন। যতীন্দ্র বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বাবা তাঁর দাদা হরিচরণ বিশ্বাসের কাছ থেকে বাঁশি তৈরির কাজ শিখেছেন। তাঁর (যতীন্দ্র) কাছ থেকে তাঁর তিন মেয়ে শিখেছেন। তাঁরা এখন স্নাতকে পড়ছেন। লেখাপড়া শেষ করে প্রয়োজনে তাঁরা এই কাজ করবেন। বর্তমানে বাঁশি তৈরির আয় দিয়েই তাঁর সংসার চলছে। তিনি বলেন, আগে বাঁশির বাজার অনেক ভালো ছিল। চৈত্র মাস এলেই ঢাকার চকবাজারের ব্যবসায়ীরা এসে বাঁশি কিনে নিয়ে যেতেন। এখন চাহিদা না বাড়লেও কদর তেমন কমেনি।

বাঁশির গ্রাম শ্রীমদ্দী। হোমনা, কুমিল্লা, ১১ এপ্রিল

বাঁশির কারিগর আবুল কাশেম (৬০) বলেন, তিনি ৫০ বছর ধরে বাঁশি তৈরি করছেন। বাবা ও বড় ভাইয়ের কাজ থেকে এই কাজ শিখেছেন। তাঁর চার সন্তানও লেখাপড়ার পাশাপাশি এ কাজ শিখেছেন। লেখাপড়া শেষে ভালো চাকরি না পেলে এই কাজই করবেন। তিনি বাঁশি তৈরির পাশাপাশি অনলাইনে দেশ-বিদেশে বাঁশি বিক্রি করেন। তিনি ভালো বাঁশিও বাজাতে পারেন।

যেভাবে তৈরি হয় বাঁশি

একটি বাঁশি তৈরি করতে ১৩ থেকে ১৪টি ধাপ থাকে। মূলত মুলি বাঁশ দিয়ে এটি তৈরি হয়। বাঁশিগুলো লম্বা হয় ১৩ থেকে ২০ ইঞ্চি পর্যন্ত। প্রথমে মুলি কেটে শুকাতে হয়। পরে বাঁশের ছাঁচ (ওপরের আবরণ) চেঁচে ফেলা হয়। তবে আড়বাঁশির ক্ষেত্রে তা করা হয় না। ছিদ্র করার জন্য দাগ কাটা হয়।

আড়বাঁশির ক্ষেত্রে কাদামাটি দিয়ে বিভিন্ন নকশা তৈরি করে আগুন দিয়ে ছেঁকা হয়। এতে বাঁশির গা থেকে মাটি শুকিয়ে পড়ে যায় এবং নকশা ফুটে ওঠে। বাঁশিতে ছিদ্র করার জন্য বিশেষ ধরনের চোখা শিক ব্যবহার করা হয়। পরে সিরিশ দিয়ে ঘষে মসৃণ করে নিয়ে রং দিয়ে নকশা করা হয়। এভাবেই তৈরি হয় বাঁশি। এরপর প্যাকেট করে বাজারজাত করা হয়।

বাঁশির যত ধরন

নানা ধরনের বাঁশি তৈরি করেন শ্রীমদ্দী গ্রামের বাসিন্দারা। বাঁশির কারিগরেরা জানান, এখানে আড়বাঁশি, বেলুন বাঁশি, মুখ বাঁশি, সানাই বাঁশি, কেলেনেট বাঁশি, পাতা মুড়ালি বাঁশি, ছোট নাগ বাঁশি, বড় নাগ বাঁশি, পাখি বাঁশি, মোহন বাঁশি, তোতা বাঁশি, টিপেরা ফুলট বাঁশি, থ্রিপিস বাঁশি, টেলি বাঁশি তৈরি হয়। তাঁদের তৈরি করা বাঁশি দেশের বাজার ছাড়াও ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, স্পেন, ইতালিসহ বেশ কয়েকটি দেশে যায়।

ই শতকের ঐতিহ্য ধারণ করে বংশপরম্পরায় বাঁশি তৈরি করেন হোমনার শ্রীমদ্দী গ্রামের বাসিন্দারা। শনিবার সকালে

বাঁশির কারিগর আবুল কাশেম প্রথম আলোকে বলেন, বিদেশে মুখ বাঁশি ও আড়বাঁশির কদর বেশি। এই বাঁশিগুলো একেবারেই প্রাকৃতিক। দেশে চাহিদা বেশি মোহন বাঁশির। তিনি বলেন, ঢাকার কিছু ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে বাঁশির অর্ডার নিয়ে তা তৈরির জন্য তাঁদের কাছে নমুনা সরবরাহ করেন। তাঁরা সে অনুযায়ী তৈরি করে দেন। সরকারি সহযোগিতা পেলে বাঁশি ব্যাপকভাবে বিদেশে পাঠানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

সরেজমিন একদিন

গত শনিবার সকালে শ্রীমদ্দী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে বাড়িতে বাঁশি তৈরির কাজ চলছে। কেউ ছোট ছোট করে মুলি (বাঁশ) কাটছেন। কেউ শিক দিয়ে বাঁশিতে ছিদ্র করছেন, কেউ আগুনের ছেঁকা দিয়ে বাঁশির গায়ে নকশা করছেন। কেউবা নকশা ফুটিয়ে তুলছেন রংতুলিতে। শুধু জীবিকার জন্যই নয়, মনের টান থেকেও তাঁরা এ কাজ করেন বলে জানালেন।

গ্রামের প্রবীণ বাঁশি কারিগর অনিল বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, শ্রীমদ্দী গ্রামের অন্তত ৪০টি পরিবার বাঁশি তৈরির সঙ্গে যুক্ত। পরিবারের সব বয়সের নারী, পুরুষ, শিশু—সবাই কোনো না কোনো ধাপে বাঁশি তৈরিতে হাত লাগান।

বাঁশির বাজার

শ্রীমদ্দী গ্রামে তৈরি করা বাঁশি সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় যায়। ঢাকার চকবাজার ছাড়াও চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা এখান থেকে বাঁশি কিনে নিয়ে যান। পাশাপাশি দেশের বাইরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও যায়। বাঁশির ধরনভেদে দামও ভিন্ন হয়। খুচরা পর্যায়ে একেকটি বাঁশি ১০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। সাধারণত বৈশাখী মেলা সামনে রেখে চৈত্র মাসে ব্যবসায়ীদের ভিড় সবচেয়ে বেশি হয়।

নেত্রকোনার মদন উপজেলার ত্রিয়শ্রী গ্রামের ব্যবসায়ী রাজু মিয়া বাঁশি কিনতে শ্রীমদ্দী গ্রামে এসেছেন। তিনি বলেন, ৪৩ বছর ধরে তিনি শ্রীমদ্দী গ্রাম থেকে বাঁশি কিনে বিক্রি করছেন। যুবকেরাই আসল গ্রাহক। বাচ্চারাও কেনে। ঢাকায় তাঁর দোকান আছে। সারা বছর কিনে নিয়ে দোকানে বিক্রি করেন। বৈশাখী মেলার জন্য টানা ছয় দিন তিনি শ্রীমদ্দী গ্রামে অবস্থান করে বাঁশি কিনছেন।

একটি বাঁশি তৈরি করতে ১৩ থেকে ১৪টি ধাপ থাকে। মূলত মুলি বাঁশ দিয়ে এটি তৈরি হয়। শনিবার সকালে হোমনার শ্রীমদ্দী গ্রামে

বাঁশির কারিগর রতন চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, দেশি-বিদেশি প্লাস্টিকের নানা খেলনা বাজারে থাকায় বাঁশির কদর আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। এরপরও চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেটসহ সারা দেশের ব্যবসায়ীরা বাঁশি কিনে নিয়ে যান। বিভিন্ন মেলা ও ওরসে তাঁদের তৈরি বাঁশি বেশি বিক্রি হয়। বিদেশেও যাচ্ছে। বাঁশির গুণগত মান বাড়িয়ে বিদেশে পাঠাতে ব্যাংক থেকে ঋণসুবিধাসহ সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন।

হোমনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, দেশি ঐতিহ্য ধরে রাখতে শ্রীমদ্দী গ্রামের বাসিন্দাদের বাঁশি তৈরিতে উৎসাহ দেওয়া উচিত। তাঁরা এলে ঋণের বিষয়ে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সে ব্যাপারে আলোচনা করা হবে।