জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দিচ্ছেন একজন ভোটার। গত বৃহস্পতিবার সকালে রংপুর নগরের কেল্লাবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দিচ্ছেন একজন ভোটার। গত বৃহস্পতিবার সকালে রংপুর নগরের কেল্লাবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে

রংপুর বিভাগের ৩৩ আসন

জাতীয় পার্টি নিয়ে মানুষের আর ‘ওই আবেগ নাই’

রংপুর নগরের কেরামতিয়া জামে মসজিদ। গতকাল শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর সামনের চা-দোকানে গল্পে মেতেছিলেন মুন্সিপাড়ার সবুজ আলী, মকবুল হোসেন, আহম্মদ মিয়ারা। আলোচনার মূল বিষয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল।
ভোটের ফলাফলে বিস্মিত সবুজ আলী বলেন, ‘ভোটের আগে মনে হচ্ছিল এবার রংপুরে জাতীয় পার্টি হারবে। কিন্তু এ রকম শোচনীয়ভাবে হারবে, এটা চিন্তা ছিল না।’

কথার ফাঁকে সত্তরোর্ধ্ব সবুজ আলী নিজেকে জাতীয় পার্টির একজন কর্মী পরিচয় দেন। বলেন, ‘এরশাদ যখন জেলে, সেই ’৯১ সালে, তখন থেকে লাঙ্গলকে ভোট দেই। এবারও দিছি। কিন্তু জাতীয় পার্টিক নিয়া রংপুরের মানুষের আর ওই আবেগ নাই। মানুষ এবার মুখ ফিরি দিছে।’

রংপুরের ৬টি আসনে শাপলা কলি ও দাঁড়িপাল্লার বিজয়ের মধ্য দিয়ে যেমন আওয়ামী লীগ নাই হয়ে গেছে, তেমনি জাতীয় পার্টিকেও রংপুরের মানুষ প্রত্যাখান করেছেন।
আখতার হোসেন, এনসিপির সদস্যসচিব

সবুজ আলীর এই বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যায় গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে। জাতীয় পার্টির ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত রংপুর বিভাগে কোনো আসন পায়নি জাতীয় পার্টি। এমনকি রংপুর-৩ (সিটি করপোরেশন ও সদর) আসনেও দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের হেরেছেন।

বিভাগের ৮ জেলায় সংসদীয় আসন ৩৩টি। এর মধ্যে ১৮টি আসনে নির্বাচিত হয়েছেন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা। জামায়াতের প্রার্থীরা ১৬টিতে এবং ২টিতে জয় পেয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীরা। বিএনপি পেয়েছে ১৪টি আসন। একটি আসনে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র (বিএনপির বিদ্রোহী) প্রার্থী।

জাপার প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রংপুরের মানুষ। শহরে তাঁর পুরোনো বাড়ি রয়েছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি জেল থেকে প্রার্থী হয়ে পাঁচটি আসনে দাঁড়িয়ে সব কটিতেই জিতেছিলেন। সেই নির্বাচনে রংপুর বিভাগে ১৭টি আসন জিতে জাপা। ১৯৯১ সালের পর আরও তিনটি নির্বাচনে রংপুর বিভাগে ভালো ফল করে জাপা। ১৯৯৬ সালে ২১টি, ২০০১ সালে ১৪টি এবং ২০০৮ সালে ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৩টি আসন পেয়েছিল জাপা।

রংপুর-৪ আসনের জয় পাওয়া এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রংপুরের ৬টি আসনে শাপলা কলি ও দাঁড়িপাল্লার বিজয়ের মধ্য দিয়ে যেমন আওয়ামী লীগ নাই হয়ে গেছে, তেমনি জাতীয় পার্টিকেও রংপুরের মানুষ প্রত্যাখান করেছেন।

জামায়াতের এমন বিজয়ে বিস্ময়

এবার বিভাগে সর্বোচ্চ আসন পাওয়া জামায়াতের আগে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে মাত্র একটিতে করে জয়লাভ করেছিল। ২০০১ সালে বিভাগে জামায়াতের আসন বেড়ে চারটি হলেও ২০০৮ সালে এসে একটি আসনও পায়নি জামায়াত। ১৮ বছর পর এই অঞ্চলে জামায়াতের এমন বিজয়ে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি ফখরুল আনাম প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক নেতৃত্বের বিকাশ নেই। তারা কী করতে চায়, তার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নেই। তারা রংপুর অঞ্চলের মানুষের ইমোশন (আবেগ) নিয়ে রাজনীতি করেছে। কিন্তু মানুষ এবার ‘হামার ছওয়াল ইমোশনে’ সাড়া দেয়নি। জাতীয় পার্টিকে প্রত্যাখান করা ‘সংক্ষুব্ধ’ ভোটারদের জামায়াত কাজে লাগাতে পেরেছে বলেই মনে করেন তিনি।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, গাইবান্ধার পলাশবাড়ি, সুন্দরগঞ্জ, রংপুরের মিঠাপুকুরসহ বিভিন্ন পার্শ্ববর্তী জেলা ও উপজেলায় ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হয়ে আসছিল জামায়াত। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এসব আসনে ঘিরে জোরালো তৎপরতা শুরু করে দলটি। ভোঠের মাঠে তাদের এমন সাংগঠনিক দক্ষতা ও কৌশল এবার ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে।

এ বিষয়ে রংপুর মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির এ টি এম আজম খান প্রথম আলোকে বলেন, এর আগে এই এলাকায় জামায়াত-বিএনপির প্রভাব ছিল না। যার কারণে মানুষ নতুনটাকে বেছে নিয়েছে।

আগামী দিনে ভালো করতে চায় বিএনপি

অতীতের তুলনায় এবার রংপুরে বিএনপির আসনও বেড়েছে। ১৯৯১ সালে বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে মাত্র ১টি ও ১৯৯৬ সালে ৩টি আসন পায় বিএনপি। ২০০১ সালে বিএনপি ৯টি আসন পেলেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলটিকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফলাফলে দেখা গেছে, বিএনপি দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও লালমনিহাটের ১৪টি আসন পায়। দিনাজপুর-৫ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীসহ ধরলে এই ৪ জেলার ১৫টি আসনেই তাদের দখলে। কিন্তু বিভাগীয় শহর রংপুরসহ কুড়িগ্রাম, নীলফামারীতে কোনো আসন পায়নি বিএনপি। গাইবান্ধার ৫টি আসনের মধ্যে শুধু গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী শামীম কায়সার জয়লাভ করেন।

বিএনপি রংপুর, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলার কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে রংপুর বিভাগে বিএনপির আরও ভালো করার সুযোগ ছিল। কিন্তু নেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, তৃণমূল কর্মীদের অবম্যূল্যায়ন না করার কারণে সেই সুযোগ ঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি।
রংপুরের একজন বিএনপি নেতা প্রথম আলোকে বলেন, রংপুর বিভাগীয় শহর হলেও বিএনপি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে রংপুরকে নেতৃত্ব দেওয়ার লোক নগন্য। আবার যাঁরা আছেন, তাঁরাও রংপুর থেকে ভোট করেননি। স্থানীয় নেতাদের ওপর ভোটারদের আস্থার সংকট ছিল। যে সংকট ঠাকুরগাঁও বা লালমনিরহাটে ছিল না।

তবে বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক (রংপুর বিভাগ) আবদুল খালেক প্রথম আলো বলেন, ‘প্রতিটি জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। অনেক জায়গায় বিএনপি-জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা ভোট কাটাকাটি করেছেন, মাঝখান দিয়ে জামায়াত প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। তবে বিএনপির যাঁরা হেরেছেন, খুব অল্প ভোটে হেরেছেন। এটা কোনো সমস্যা নয়। সাংগঠনিকভাবে কাজ করলে আগামী দিনে এগুলো ভালো হবে।’

ভুলত্রুটি খুঁজছে জাতীয় পার্টি

রংপুর বিভাগে নীলফামারী সদর আসন বাদ দিয়ে ৩২ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল জাতীয় পার্টি। কোনোটিতে জাতীয় পার্টি জিতেনি। দলের সাধারণ সম্পাদক গাইবান্ধার দুটি আসনে ভোট করলেও একটিতে তৃতীয় হয়েছেন, আরেকটিতে জামানত হারান।
রংপুরে জাপা নেতা-কর্মীদের ধারণা ছিল, দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের অন্তত তাঁর আসনে জিতবেন। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর মাহবুবুর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের কাছে তিনি পরাজিত হয়েছেন। দীর্ঘদিন এ আসন ধরে রাখার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে। এর পর থেকে রংপুরের মানুষের আলোচনায় জি এম কাদের।

জাপা নেতারা অবশ্য দলের চেয়ারম্যানের হারকে মেনে নিতে পারছেন না। তাঁরা এটিকে ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ হিসেবে দেখছেন। জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক আজমল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা গণসংযোগ করেছি। প্রতিটা বাড়ি বাড়ি গিয়েছি। সবাই স্বতঃস্ফূর্ত জাতীয় পার্টির পক্ষে সাড়া দিছে। এখানে জাতীয় পার্টির এই ধরনের রেজাল্ট হওয়ার কথা না। এটা “সূক্ষ্ম কারচুপি” ছাড়া আর কিছু হয়নি।’

জাপা চেয়ারম্যানের গতকাল ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন ও সাংবাদিকদের বিফ্রিং করার কথা থাকলেও করেননি। সারা দিন তাঁর রংপুরের বাসভবন দ্য স্কাই ভিউতে ছিলেন।
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিলন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, আজ সকাল থেকে জাতীয় পার্টি রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারীসহ বিভিন্ন এলাকার নেতা–কর্মীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। বেলা দুইটার পর তিনি ঢাকার উদ্দেশে চলে যান। জি এম কাদের ভোট নিয়ে কোনো মন্তব্য করেছেন কি না, তা জানতে চাইলে মিলন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের বলেছেন, সবাই মিলে সংগঠন ঠিক করো। ভুলক্রটি কোথায়, কী কারণে এমন হলো।’