চট্টগ্রাম নগরের সড়কে গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয় হাতের ইশারায়। গতকাল বেলা ৩টায় টাইগারপাস মোড়ে
চট্টগ্রাম নগরের সড়কে গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয় হাতের ইশারায়। গতকাল বেলা ৩টায় টাইগারপাস মোড়ে

ঢাকায় এআই ‘জাদু’, চট্টগ্রামের সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আসছে কোন প্রকল্প

চট্টগ্রাম নগরে গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণে সংকেত বাতি স্থাপনে কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল। ১৪ বছর আগে স্থাপন করা সংকেত বাতিগুলো দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এর পর থেকে বন্দর নগরে গাড়ি চলাচল করে ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায়।

এখনো সেভাবেই চলছে। তবে এই অবস্থার পরিবর্তন করতে চায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। নগরের ট্রাফিক ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে ‘স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল’ চালুর পরিকল্পনা করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এ জন্য একটি প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সংস্থাটি, যাতে ব্যয় হতে পারে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা।

সম্ভাব্য এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প’। এই প্রকল্প নিয়ে সিটি করপোরেশনে আজ সোমবার একটি সভা হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সভায় প্রকল্পের প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান।

সিটি করপোরেশন থেকে পাওয়া প্রকল্প সংক্রান্ত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নগরের ৫৩টি স্থানে স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল বসিয়ে সেগুলো কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টার থেকে পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পুরো ব্যবস্থায় থাকবে ক্যামেরা, পথচারী শনাক্তকারী যন্ত্র, সিগন্যাল কন্ট্রোলার, সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম এবং যান চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণের ব্যবস্থা।

স্মার্ট সিগন্যাল পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে পারলে ভালো। তবে এই নগরে তা কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কেননা, এখানে একই রাস্তায় ভিন্ন ভিন্ন গতির বিভিন্ন ধরনের গাড়ি চলাচল করে। আবার এখানে কোনো লেন বা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নেই। তাই এসব অব্যবস্থাপনা দূর না করে শুধু স্মার্ট সিগন্যাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে খুব বেশি লাভবান হওয়া যাবে না।
প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া, পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি ও পরিবহনবিশেষজ্ঞ  

বর্তমানে নগরে গাড়ির চাপ বাড়লে পুলিশ সদস্যরা কখনো এক দিকের গাড়ি ছাড়েন, কখনো আরেক দিকের। ব্যস্ত সময়ে এই ব্যবস্থায় সাময়িক নিয়ন্ত্রণ হয় ঠিকই, কিন্তু মোড়ভিত্তিক চাপ, গাড়ির সারি, পথচারী পারাপার কিংবা জরুরি যানবাহনের জন্য কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নেই। ভরসা হচ্ছে হাতের ইশারা।

দেশের রাজধানী ঢাকায় ৩০টি মোড়ে বা ক্রসিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্যামেরা বসিয়ে যান চলাচলে শৃঙ্খলা আনার সুফল পাওয়া গেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে ঢাকার মতো চট্টগ্রামেও সুফল পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীরা।

সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু সাদাত মোহাম্মদ তৈয়ব প্রথম আলোকে বলেন, স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল প্রকল্প বাস্তবায়নে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা খরচ হতে পারে। এক মাসের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হবে। এরপর অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তিনি বলেন, নগর পুলিশ, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম নগরের সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে।

নগরের ট্রাফিক ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে ‘স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল’ চালুর পরিকল্পনা করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এ জন্য একটি প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সংস্থাটি, যাতে ব্যয় হতে পারে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা।

৫৩ স্থানে প্রয়োজন স্মার্ট সিগন্যাল

সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরে ১৯৬টি ইন্টারসেকশন বা মোড় এবং ৩২টি ইউটার্ন রয়েছে। এর মধ্যে ৫৩টি স্থানে স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যালের মাধ্যমে নজরদারি ও সহায়তা প্রয়োজন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থান কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টার থেকে পর্যবেক্ষণ করা হবে।

সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনায় শুধু সংকেত বাতি বসানো নয়; সড়কের নেটওয়ার্ক, মোড়ের ধরন, যানজটপ্রবণ এলাকা, নজরদারি ক্যামেরা বসানোর জায়গা, সংকেত বাতি স্থাপনের জন্য উপযুক্ত মোড় এবং সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রাথমিক হিসাব তৈরির কথা বলা হয়েছে। প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ চলমান রয়েছে বলেও এক নথিতে উল্লেখ আছে।

সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, স্মার্ট সিগন্যাল প্রকল্পের জন্য চট্টগ্রাম নগরের কিছু মোড়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আছে জিইসি, ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, ওয়াসা, লালখান বাজার, টাইগারপাস, স্টেশন রোড, কদমতলী, অক্সিজেন, এ কে খান, ফৌজদারহাট, সিটি গেট, আগ্রাবাদ, বাদামতলী, বারিক বিল্ডিং, নিউমার্কেট, কাস্টম হাউস, সিইপিজেড গেট, হালিশহর বাজার, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, কালুরঘাট, চকবাজার, আন্দরকিল্লা, জামালখান, সিআরবি, ডিসি হিল ও কাজীর দেউড়ি।
কীভাবে কাজ করবে স্মার্ট সিগন্যাল

দেশের রাজধানী ঢাকায় ৩০টি মোড়ে বা ক্রসিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্যামেরা বসিয়ে যান চলাচলে শৃঙ্খলা আনার সুফল পাওয়া গেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে ঢাকার মতো চট্টগ্রামেও সুফল পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীরা।  

সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীরা জানান, বর্তমানে নগরের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ মূলত ম্যানুয়াল (প্রথাগত পদ্ধতি)। অর্থাৎ ট্রাফিক পুলিশ চোখে দেখে সিদ্ধান্ত নেন, কোন দিকের গাড়ি ছাড়বেন।

প্রস্তাবিত স্মার্ট সিগন্যাল ব্যবস্থা গাড়ির চাপ, গতি, সারির দৈর্ঘ্য ও পথচারীর উপস্থিতি বুঝে সিগন্যালের সময় নিয়ন্ত্রণ করবে।

সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য প্রকল্পের জন্য তৈরি করা এক নথিতে বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থায় ট্রাফিক ফ্লো ক্যামেরা, সিগন্যাল কন্ট্রোলার, পথচারী ডিটেক্টর, ইন্টারনেট ট্রাফিক ডেটা এবং ফ্লোটিং কার ডেটা ব্যবহার করা যাবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সংকেত সময় নির্ধারণ, পরিবর্তন ও মূল্যায়ন করা হবে।

পিক আওয়ারে (অফিসে যাওয়া-আসার সময়) একধরনের ব্যবস্থা থাকবে। তখন যেদিকে গাড়ির চাপ বেশি, সেই দিকের সবুজ বাতির সময় বাড়ানো যাবে।

অফ-পিক আওয়ারে আরেক ধরনের ব্যবস্থা থাকবে। তখন অকারণে কোনো ফাঁকা সড়কে সবুজ বাতি জ্বলবে না। কোনো দিক থেকে গাড়ি এলে সংকেত সাড়া দেবে।
পথচারী পারাপারের সময় শেষ হওয়ার আগে যদি দেখা যায় কেউ তখনো জেব্রা ক্রসিংয়ে আছেন, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পথচারী পারাপারের সময় বাড়ানো যাবে।

কম যান চলাচলের মোড়ে সিগন্যাল ‘হোল্ড স্টেট’ ও ‘রেসপন্স স্টেট’—এই দুই অবস্থায় থাকবে। গাড়ি না এলে অপেক্ষায় থাকবে, গাড়ি এলে সাড়া দেবে। এ ব্যবস্থায় রাডার দিয়ে ২৫০ মিটার এবং ভিডিও ক্যামেরা দিয়ে ৬০ মিটার পর্যন্ত গাড়ি শনাক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

প্রধান সড়কে ‘গ্রিন ওয়েভ’

স্মার্ট সিগন্যাল প্রকল্পে প্রধান সড়কগুলোতে ডায়নামিক গ্রিন ওয়েভ চালুর কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ একই সড়কের ধারাবাহিক কয়েকটি মোড়ের সিগন্যাল এমনভাবে সমন্বয় করা হবে, যাতে গাড়ি এক মোড় পার হয়ে পরের মোড়েও সবুজ বাতি পায়। এতে গাড়ির বারবার থামা কমবে। সময় ও জ্বালানি সাশ্রয় হবে—এমন দাবি করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের বাস্তবতায় এই গ্রিন ওয়েভ ব্যবস্থা সিডিএ অ্যাভিনিউ, শেখ মুজিব রোড, পোর্ট কানেকটিং (পিসি) রোড, বিমানবন্দর সড়ক, বায়েজিদ বোস্তামী সড়ক, আরাকান রোড, শাহ আমানত সেতু সংযোগ সড়ক বা কর্ণফুলী টানেল অ্যাপ্রোচ রোডের মতো করিডরে ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রকল্পের ওই নথিতে নগরের ১৩টি প্রবেশ ও বের হওয়ার পথসহ ১৩০ কিলোমিটারের বেশি প্রধান সড়ককে গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংকেত অমান্য করলে জরিমানা

স্মার্ট সিগন্যাল প্রকল্পের সঙ্গে ট্রাফিক আইন প্রয়োগের ডিজিটাল ব্যবস্থাও যুক্ত করার প্রস্তাব আছে। ক্যামেরা দিয়ে সংকেত না মানা, অবৈধ ইউটার্ন, অবৈধ লেন পরিবর্তন, অতিরিক্ত গতি, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, অবৈধ পার্কিং, বাস লেন দখলসহ বিভিন্ন নির্দেশনা অমান্য করলে তা শনাক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

জরিমানা প্রক্রিয়ায় বলা হয়েছে, সড়কে আইন বা সংকেত অমান্য করলে সেই তথ্য বিআরটিএর সার্ভারে যাবে। এরপর পুলিশ সদর দপ্তরের ব্যবস্থার মাধ্যমে জরিমানা অনুমোদনের পর গাড়ির মালিকের কাছে প্রমাণসহ এসএমএস (খুদে বার্তা) যাবে।

স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল চালুর বিষয়ে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি ও পরিবহনবিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, স্মার্ট সিগন্যাল পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে পারলে ভালো। তবে এই নগরে তা কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কেননা, এখানে একই রাস্তায় ভিন্ন ভিন্ন গতির বিভিন্ন ধরনের গাড়ি চলাচল করে। আবার এখানে কোনো লেন বা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নেই। তাই এসব অব্যবস্থাপনা দূর না করে শুধু স্মার্ট সিগন্যাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে খুব বেশি লাভবান হওয়া যাবে না।