ট্রেন চলে যাওয়ার পর ছেলেকে নিয়ে উঠে আসছেন বাবা। মঙ্গলবার দুপুরে কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলস্টেশনে
ট্রেন চলে যাওয়ার পর ছেলেকে নিয়ে উঠে আসছেন বাবা। মঙ্গলবার দুপুরে কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলস্টেশনে

‘ছেলের বিপদ, দাঁড়াইয়া থাকি কেমন করে’

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুড়ি ইউনিয়নের চরকাউনিয়া গ্রামের জহিরুল ইসলাম ও সুমাইয়া বেগম দম্পতি ট্রেন থেকে নামার সময় তাঁদের দেড় বছর বয়সী সন্তান ট্রেন ও প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে পড়ে যায়। সন্তানের বিপদ দেখে মুহূর্তের মধ্যেই প্ল্যাটফর্ম থেকে নিচে নেমে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকেন বাবা। এই দৃশ্য দেখে দম বন্ধ করে তাকিয়ে থাকেন লোকজন। সৃষ্টিকর্তার নাম জপতে থাকেন কেউ কেউ। ধীরে ধীরে ট্রেনটি চলে যায়। বাবা–ছেলেকে অক্ষত অবস্থায় উঠে আসতে দেখে সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন।

ট্রেন চলা অবস্থায় ছেলেকে বাঁচাতে এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হয় জহিরুল ইসলামের কাছে। আজ বুধবার দুপুরে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘দেখলাম ছেলে নিচে পড়ে গেছে, ছেলের বিপদ। দাঁড়াইয়া থাকি কেমন করে, তাকে বাঁচাইতে হইব। এই চিন্তা থেকেই লাফ দিলাম।’

ট্রেনে ওঠার সময় মনে হলো বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বাড়িতে রেখে এসেছি। বললাম, এই ট্রেনে যাওয়া যাবে না। আমরা ট্রেন থেকে সরে আসতে চাচ্ছিলাম। অনেক মানুষ। ভিড় ঠেলে নেমে আসার সময় ইয়ামিন হাত ফসকে নিচে পড়ে যায়। ট্রেন চলতে শুরু করে। নিচে নেমেই ইয়ামিনকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ি।
জহিরুল ইসলাম, প্রবাসী

জহিরুল ইসলামের ভাষ্য, সন্তানকে নিয়ে বিপদমুক্ত হওয়ার পর তাঁর নিজের কাছেই সবকিছু অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। তখন কেবল সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করেন তিনি।

জহিরুল ইসলাম ওমানপ্রবাসী। ১০ বছর ধরে ওই দেশেই আছেন। এই সময়ে তিনি কেবল দুইবার দেশে এসেছেন। দুই বছর আগে একই গ্রামের মেয়ে সুমাইয়াকে বিয়ে করেন। তাঁদের একমাত্র সন্তানের নাম ইয়ামিন।

কিছুদিন আগেই দেশে আসা জহিরুলের বৃহস্পতিবার ভোরে ওমানে তাঁর কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে। বিমানের ফ্লাইট ধরতেই স্ত্রী–সন্তানকে নিয়ে ট্রেনে করে ঢাকায় যেতে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে গ্রামের বাড়ি থেকে ভৈরব স্টেশনে আসেন।

জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘ট্রেনে ওঠার সময় মনে হলো বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বাড়িতে রেখে এসেছি। বললাম, এই ট্রেনে যাওয়া যাবে না। আমরা ট্রেন থেকে সরে আসতে চাচ্ছিলাম। অনেক মানুষ। ভিড় ঠেলে নেমে আসার সময় ইয়ামিন হাত ফসকে নিচে পড়ে যায়। ট্রেন চলতে শুরু করে। নিচে নেমেই ইয়ামিনকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ি।’

জহিরুল ইসলাম জানান, ঘটনার পর তাঁরা সড়কপথে ঢাকায় যান।

এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে স্তব্ধ জহিরুলের বাবা দুলাল মিয়া। বারবার তিনি কেবল সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করছেন। দুলাল মিয়া বলেন, ‘বাসে চলাচলে ছেলের অসুবিধা হয়। এ কারণে ট্রেনে যেতে ভৈরব গিয়েছিল। একটু এদিক–ওদিক হইলে ছেলে ও নাতি দুজনই শেষ হয়ে যাইত। তখন আমি কী করতাম।’

জহিরুল ইসলাম

আজ দুপুরে ভৈরব স্টেশনে গিয়ে কথা হয় প্ল্যাটফর্মের কয়েকজন দোকানির সঙ্গে। ঘটনার সময় সোহেল মিয়া নামের এক দোকানি প্ল্যাটফর্মে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘তিতাস ট্রেনে যাত্রী অনেক থাকে। ওই দিনও অনেক যাত্রী ছিল। হুড়াহুড়ি করে ওঠানামা করার সময় শিশুটি মায়ের হাত ফসকে পড়ে গিয়েছিল।’

কথা হয় ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশনমাস্টার মো. ইউসুফের সঙ্গে। তিনি জানালেন, জহিরুল ইসলাম-সুমাইয়া দম্পতি তিতাস ট্রেনের যাত্রী হতে চেয়েছিলেন। ভৈরব স্টেশনে ট্রেনটির যাত্রাবিরতির সময় বেলা ১টা ৩৫ মিনিট। গতকাল এক ঘণ্টা আট মিনিট বিলম্বে ভৈরব স্টেশনে আসে। ২টা ৫৫ মিনিটে ছেড়ে যায়। ওই সময়ের ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তাঁরা ট্রেনে উঠতে গিয়েও না উঠে ফিরে আসার সময় শিশুটি নিচে পড়ে যায়।

স্টেশন মাস্টার ইউসুফ বলেন, রেললাইন থেকে প্ল্যাটফর্মের উচ্চতা প্রায় তিন ফুট। আবার লাইন থেকে প্ল্যাটফর্মের দূরত্ব প্রায় তিন ফুট। শিশুটি লাইন ও প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে পড়েছিল। ট্রেনটিতে ১৪টি বগি ছিল। ইঞ্জিনের পরের তৃতীয় বগির কাছে দুর্ঘটনাটি ঘটে। ওপর দিয়ে ট্রেন গেলেও চাকা থেকে বাবা–ছেলের অবস্থান দূরে থাকায় তাঁরা বেঁচে যান।

ভৈরব রেলওয়ে পুলিশের কয়েকজন সদস্য দুর্ঘটনার সময় কাছেই ছিলেন। ট্রেন চলে যাওয়ার পর বাবা–ছেলে রেলওয়ে পুলিশের হেফাজতে ছিলেন।

ভৈরব রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক আফজাল হোসেন বলেন, ‘একটি বগির দুই পাশে চার দরজা। একটি ট্রেনে ১৪ থেকে ১৫টি বগি থাকে। ৬০টি দরজা পাহারা দেওয়ার মতো লোকবল আমাদের নেই। ফলে ওঠানামার সময় যাত্রীদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হয় না।’