বগুড়া 

আমন চাষে বাড়তি খরচ 

এবার জেলায় ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। 

বৃষ্টি না হওয়ায় আমন ধানের খেত ফেটে গেছে। গত মঙ্গলবার বগুড়া সদর উপজেলার গোপালবাড়ী গ্রামের মাঠে
ছবি: সোয়েল রানা

শ্রাবণ মাসের প্রায় তিন সপ্তাহ পার হচ্ছে, কিন্তু বগুড়ায় বৃষ্টিপাত তেমন হয়নি। ফলে সেচযন্ত্র চালু করে আমন রোপণ করছেন চাষিরা। এতে সেচ বাবদ বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে চাষিদের। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার জেলায় আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৮২ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমিতে ধান রোপণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সেচযন্ত্র চালু করে ৪২ হাজার ৬২০ হেক্টর জমিতে আমন রোপণ করতে হয়েছে। এই পরিমাণ জমিতে গড়ে তিন দফা সেচ দিতে হয়েছে। সেচ বাবদ প্রতি বিঘায় বাড়তি খরচ হয়েছে গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা। সেই হিসাবে ৪২ হাজার ৬২০ হেক্টর জমির আমন খেতে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের পেছনে কৃষককে গুনতে হয়েছে প্রায় ৪৮ কোটি টাকা।

শ্রাবণ মাসের তিন সপ্তাহেও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা মেলেনি। ফলে আমন চাষের জন্য উত্তরের চাষিদের পুরোপুরি সেচযন্ত্রের ওপর ভরসা করতে হচ্ছে। আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, জুলাই মাসের স্বাভাবিক গড় বৃষ্টিপাত ধরা হয় ৪০৬ মিলিমিটার। বগুড়ায় বিগত ৫ বছরে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত কমে তিন ভাগের এক ভাগে নেমেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালের জুলাই মাসে জেলায় ৪৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। ২০২০ সালে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৪৮৫ মিলিমিটার। তবে পরের বছর ২০২১ সালে বৃষ্টির পরিমাণ কমে প্রায় অর্ধেক ২৭৭ মিলিমিটারে নেমেছে। গত বছরের জুলাইয়ে আরও কমে ২১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।  এ বছরের জুলাই মাসে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১৫২ মিলিমিটার। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, রোপা আমন চাষাবাদ অনেকটা বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। জমিতে পর্যাপ্ত পানি থাকলে ১৫ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে রোপা আমন লাগানো শেষ হয়। কিন্তু এবার ভরা বর্ষা মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা মেলেনি। এবার ৩০ আগস্ট পর্যন্ত আমন চাষের মৌসুম ধরা হয়েছে।

শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক এলাকার কৃষক নাজমুল হক বলেন, অন্যবার আষাঢ়েই প্রচুর বৃষ্টিপাত হতো। এবার শ্রাবণেও বৃষ্টির দেখা নেই। ফলে এলাকার কয়েক শ কৃষক ডিজেলচালিত গভীর নলকূপ চালু করে জমিতে সেচ দিয়ে আমনের চারা রোপণ করছেন।

গাবতলী উপজেলার কাতলাহার বিলের জমিতে হালচাষ দিচ্ছিলেন এলাকার কৃষক আনছার আলী। তিনি বলেন, এ এলাকায় সেচের পানিতে কয়েক হাজার বিঘা জমিতে রোপা আমন চাষ করতে হচ্ছে। সেচযন্ত্রের মালিকেরা উৎপাদিত ধানের ১৬ ভাগের ৩ ভাগ চুক্তিতে সেচ দিচ্ছেন। এতে আমন চাষে কৃষকের তেমন লাভ হবে না। 

ধুনট উপজেলার বিলকাজলি এলাকার কৃষক শাহজাহান আলী বলেন, ডিজেলচালিত অগভীর নলকূপে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে দেড় লিটার ডিজেল লাগে। এক বিঘা জমিতে একবার সেচ দিতে গড়ে তিন ঘণ্টা সেচযন্ত্র চালাতে হয়। এতে সাড়ে ৪ লিটার ডিজেল লাগে। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০৯ টাকা। সেই হিসাবে এক বিঘা জমিতে একবার সেচ দিতে খরচ গড়ে ৫০০ টাকা। দেড় মাসে গড়ে তিন দফা সেচ দিতে খরচ প্রতি বিঘায় ১ হাজার ৫০০ টাকা। 

বগুড়া কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, গত অর্থবছরে আমন আবাদ হয়েছিল ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৭৫ হেক্টর জমিতে। আমন ধান উৎপাদিত হয় ৫ লাখ ৯৬ হাজার ২৮৫ মেট্রিক টন। এবার ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষাবাদ করে ৫ লাখ ৯৯ হাজার ১৩৪ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। 

বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মতলুবর রহমান বলেন, বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রভাবে এবার আমন মৌসুমে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় সেচযন্ত্র চালু করে আমন চাষাবাদ করতে হচ্ছে। তবে বৃষ্টিপাত কম হওয়ার কারণে ফলনে কোনো প্রভাব পড়বে না। ৩০ আগস্ট পর্যন্ত আমনের চারা রোপণ করা যাবে। বৃষ্টির আশায় না থেকে যেখানে যেমনটা সুযোগ আছে, সেখানে বিকল্প উপায়ে সেচ দিয়ে আমনের চারা রোপণ করতে হবে। মাস দেড়েক সেচ দিতে কৃষকের উৎপাদন খরচ গুনতে হবে ঠিক, তবে ভালো ফলন হলে কৃষক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন।