বিজয়ের মাসে চারঘাটের শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে চিঠি

বিজয়ের মাসে রাজশাহীর চারঘাটের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ইউএনওর লেখা চিঠি
বিজয়ের মাসে রাজশাহীর চারঘাটের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ইউএনওর লেখা চিঠি

পরীক্ষা হল থেকে বের হলো সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরাফাত রহমান। তার হাতে প্রশ্নপত্রের সঙ্গে একটি চিঠি। মাঠে দাঁড়িয়েই খাম খুলে সে পড়তে শুরু করল।

‘কেমন আছ? তুমি নিশ্চয়ই জানো যে মানবজীবনের সবচেয়ে স্বর্ণালি সময় এই মুহূর্তে অতিবাহিত করছ। জীবনযুদ্ধের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য নিজেকে যথাযথ প্রস্তুত করার জন্য এখনই সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সময়। সঠিক জীবনচর্চা, জীবনবোধ ও সু-অভ্যাসের অনুশীলন নিশ্চিতভাবেই তোমার ভবিষ্যৎকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে। সব সময় মনে রাখবে, “সূর্যের মতো দীপ্তিমান হতে হলে প্রথমে তোমাকে সূর্যের মতোই পুড়তে হবে।”’

চিঠির শেষ বাক্য হচ্ছে ‘তুমি নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে।’ চিঠিটা পড়ে সে সহপাঠী ফয়সাল আহমেদের দিকে তাকাল। তার হাতেও একটি খাম। সে–ও পড়ার জন্য খুলতে লাগল। পাশ দিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির নাদিয়াতুল মুস্তারিও একটি খাম নিয়ে বের হলো।

আজ সোমবার দুপুরে রাজশাহীর চারঘাট উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের চিঠি পড়ার এ দৃশ্য দেখা গেছে। বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ, সপ্তম ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সঙ্গেই তাদের এ চিঠি বিলি করা হয়। বিজয়ের মাসে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে চিঠিটি লিখেছেন চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সোহরাব হোসেন। গত রোববার চারঘাট পৌর এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য এ চিঠি দেওয়া হয়েছে।

আজকের এই শিক্ষার্থীরাই ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশের নাগরিক হবে। তাদের সেইভাবে গড়ে তুলতে প্রেরণা দেওয়ার জন্য বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে এ চিঠি লিখেছি।
সোহরাব হোসেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, চারঘাট

বিদ্যালয়ের বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলেন শিক্ষিকা নূরুন্নাহার। তিনি বললেন, যাদের চিঠি দেওয়া হচ্ছে, তাদের নামের তালিকা করা হয়েছে। কতজনকে দেওয়া হলো, সেটা আবার নিশ্চিত করতে হবে।

চিঠির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে ইউএনও শিক্ষার্থীদের ‘প্রিয় বন্ধু’ বলে সম্বোধন করে বলেছেন, ‘জীবন সত্যিই সুন্দর। আর সেটাকে সুন্দরতম করে তুলতে পারে উপযুক্ত পরিবেশ ও মানসম্মত শিক্ষা, যা এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা-০৪-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনের পূর্বে এক টেলিভিশন ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগের চেয়ে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর কিছু হতে পারে না।”’

চিঠিতে ইউএনও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের দায়িত্ব দেশজ সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে নিজেকে বর্তমান সময়ের উপযোগী যোগ্যতর নাগরিকরূপে অধিষ্ঠিত করা। মনে রেখো, Every blessing ignored becomes a Curse।’

তারপর শিক্ষার্থীদের ‘প্রিয় শিক্ষার্থী’ বলে সম্বোধন করে ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিজেদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রেরণা দিয়ে বলেছেন, ‘চিত্ত হোক ভয়শূন্য, উচ্চ হোক শির।’ সবাই মিলে জ্ঞানের মুক্ত রাজ্যে বিচরণ করতে হবে।

সীমান্তবর্তী প্রান্তিক উপজেলা হিসেবে চারঘাটে বাল্যবিবাহ ও মাদকের বিস্তার রয়েছে। এর সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক বার্তা দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম, ঝরনার মতো চঞ্চল, বিধাতার মতো নির্ভয় এবং প্রকৃতির মতো সচ্ছল’—এই তারুণ্যই ১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে লড়াই করে শত্রুর কবল থেকে স্বাধীনতার সোনালি সূর্যকে ছিনিয়ে এনেছিল।

চারঘাট পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, চমৎকার এ চিঠি পেয়ে তাদের ভালো লেগেছে। শিক্ষার্থীরা এ চিঠি পড়ে উজ্জীবিত হবে। সোমবার তাঁর বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ, সপ্তম ও নবম শ্রেণির ৩২০ শিক্ষার্থীর মধ্যে এ চিঠি বিলি করা হয়েছে। মঙ্গলবার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এ চিঠি দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও সোহরাব হোসেন বলেন, আজকের এই শিক্ষার্থীরাই ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশের নাগরিক হবে। তাদের সেইভাবে গড়ে তুলতে প্রেরণা দেওয়ার জন্য তিনি বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে এ চিঠি লিখেছেন।