আল আমিন যখন মালয়েশিয়া রওনা হন, তখন বুকের ভেতরটা কেমন মুষড়ে উঠেছিল মা নূর জাহান বেগমের (৬৫)। মুহূর্তেই তিনি মূর্ছা যান। জ্ঞান ফিরলে দেখতে পান, কিছুটা দূরে গাড়িতে উঠছে ছেলে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেন ছেলের চলে যাওয়া। এরপর ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি।
এরপর প্রায় ১২ বছর ধরে ছেলের জন্য শুধু কেঁদেই যাচ্ছেন নূর জাহান বেগম। তাঁর কান্না কিছুতেই থামে না। ছেলে আসবে বলে প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকেন নূর জাহান। নির্ঘুম রাত কাটে। কিন্তু সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়া ছেলে আল আমিন আর ফেরেন না।
নূর জাহান বেগমের বাড়ি যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বেনেয়ালী গ্রামে। গতকাল বুধবার দুপুরে ছেলের সন্ধানে তিনি নাতিকে নিয়ে যশোর শহরে এসেছিলেন। সেখানে কথা হয়।
নূর জাহান বেগম জানান, ১৩ বছর আগে তাঁর স্বামী মারা যান। তাঁর চার ছেলে তিন মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে ট্রাক চালান। মেজ ছেলে মালয়েশিয়াপ্রবাসী। সেজ ছেলে গ্রাম্য পশুচিকিৎসক। ছোট ছেলে আল আমিন ২০১২ সালে যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজে স্নাতকে পড়তেন। এ সময় মুজিত মোড়ল নামের এক দালালের প্রলোভনে পড়ে চট্টগ্রাম থেকে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দালালের সঙ্গে আল আমিনের ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী মুজিতকে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা দিতে হয়। বাকি ১ লাখ ৫ হাজার টাকা মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা ছিল। আল আমিনের দলে এলাকার পাঁচজন ছিলেন।
ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান আলী বলেন, অভাবের কারণে ভাগ্য ফেরাতে সহায় সম্বল বিক্রি করে আল আমিন এবং অপর চারজন একসঙ্গে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। যাত্রার চার দিন পর থেকে তাঁদের আর কোনো সন্ধান পায়নি পরিবারের সদস্যরা। পরিবারগুলো একবারেই পথে বসে গেছে।
ছেলের যাওয়ার সময়কার স্মৃতিচারণা করে নূর জাহান বলেন, ২০১২ সালের মার্চ মাস। তারিখটা মনে নেই। সেদিন ছিল শুক্রবার। আগের দিন বৃহস্পতিবার রাতে ছিল শবে মিরাজ। তিনি সারা রাত ধরে ইবাদত করেছেন। আল আমিনের জন্য আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করেছেন। পরদিন শুক্রবার বেলা তিনটার দিকে দালাল আল আমিনকে নিয়ে রওনা দেন। হঠাৎ তাঁর বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। তিনি আর কিছু বলতে পারেন না। জ্ঞান ফেরার পর তিনি দেখেন, দালাল তাঁর ছেলেকে নিয়ে গাড়িতে উঠছেন।
নূর জাহান জানান, পরদিন শনিবার এবং তার পরদিন রোববার মুঠোফোনে আল আমিনের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। সর্বশেষ সোমবার সকাল ১০টার সময় তাঁর সঙ্গে কথা হয়। সে সময় আল আমিন তাঁকে বলেন, ‘মা, আমি টেকনাফে একরকম বন্দী আছি। এখানে অনেক লোক আছে। আমাদের দিনে মাত্র দুটি করে রুটি খেতে দিচ্ছে। একটু পরে আমাদের জাহাজে ওঠাবে।’ এই ছিল আল আমিনের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা। পরে তাঁর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এরপর ছেলের সন্ধানে তিনি বহুবার দালালের কাছে গিয়েছেন। দালাল বলেছেন, তাঁর ছেলে মালয়েশিয়ার কারাগারে আটক আছেন। দুই বছর পর জেল থেকে বের হবেন। দুই বছর পর আবার দালাল বলেছেন, ১০ বছর পর আল আমিন কারাগার থেকে ছাড়া পাবেন।
কাঁদতে কাঁদতে নূর জাহান বেগম বলেন, ‘ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। রাতে ঘুম হয় না। বাইরে গাছের পাতা নড়লে মনে হয়, এই বুঝি আমার আল আমিন বাড়ি এল। জোরে জোরে বলছে, ‘‘মা, আমি বাড়ি এসেছি।’’ ১২ বছর ধরে আমি আমার ছেলের সন্ধানে পথে পথে ঘুরছি। যে যেখানে বলেছে, সেখানে যাচ্ছি। পথে পথে ঘুরতে অনেক টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু আমি আমার আলা আমিনের কোনো সন্ধান পাচ্ছি না। আপনারা আমার আল আমিনকে ফিরিয়ে দেন। আমি যে আর পারছি না।’