মো. আনোয়ার হোসেন ও দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন
মো. আনোয়ার হোসেন ও দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন

সুনামগঞ্জ-৩ ও ৪ আসনে আলোচনায় দুই ‘বিদ্রোহী’, বিএনপিতে অস্বস্তি

সুনামগঞ্জে সংসদীয় আসন পাঁচটি। এর মধ্যে দুটিতে বিএনপির দুজন নেতা মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দল তাঁদের বহিষ্কার করেছে। ভোটের মাঠে এখন নানা সমীকরণ আর হিসাব-নিকাশে তাঁরা আলোচনায় আছেন।

এই দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেন সুনামগঞ্জ-৩ আসনে (জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ) মো. আনোয়ার হোসেন ও সুনামগঞ্জ-৪ আসনে (সদর ও বিশ্বম্ভরপুর) দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন। বিএনপিসহ অন্য প্রার্থীদের সঙ্গে মাঠে জোরেশোরে প্রচারণায় আছেন তাঁরাও। মো. আনোয়ার হোসেনের প্রতীক তালা ও দেওয়ান জয়নুল জাকেরীনের মোটরসাইকেল।

এই আসনের ভোটারদের অনেকেই বলছেন, ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, এই দুজনকে নিয়ে আলোচনা ততই ডালপালা মেলছে। এতে অস্বস্তির সঙ্গে খানিকটা চাপ বাড়ছে বিএনপিতে।

জেলা বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, দুটি আসনে দলের বহিষ্কৃত দুই নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় তাদের নিয়ে কিছুটা অস্বস্তি আছে, তবে কোনো চাপ নেই। শেষ পর্যন্ত ধানের শীষকে আটকানো যাবে না বলে মনে করেন তিনি।

সুনামগঞ্জ-৩

এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাতজন। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমদ। এখানে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও যুক্তরাজ্য জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন। এর আগেও তিনি এই আসনে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু আসনটিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট থেকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মো. শাহীনুর পাশাকে ২০০৮ ও ২০১৮ সালে মনোনয়ন দেওয়া হয়। সাবেক সংসদ সদস্য শাহীনুর পাশা এবারও নির্বাচন করছেন, তবে তিনি এখন আর জমিয়তে নেই। এবার তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীকের প্রার্থী।

ভোটের মাঠের খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ-৩ আসনে সাতজন প্রার্থীর মধ্যে আলোচনায় থাকা পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে চারজনের বাড়ি জগন্নাথপুর ও একজনের বাড়ি শান্তিগঞ্জ উপজেলায়। জগন্নাথপুরের তিনজনের মধ্যে মোহাম্মদ কয়ছর আহমদ, শাহীনুর পাশা চৌধুরী, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) সৈয়দ তালহা আলম (ঈগল) ও খেলাফত মজলিসের শেখ মুশতাক আহমেদ (দেওয়াল ঘড়ি) আছেন। অন্যদিকে আনোয়ার হোসেনের বাড়ি শান্তিগঞ্জ উপজেলায়। এই উপজেলায় আনোয়ার হোসেনকে ঘিরে ‘তলে তলে’ একটা ভোটের আঞ্চলিকতার বলয় গড়ে উঠছে। আবার জগন্নাথপুরের প্রার্থীদের ভোট ভাগাভাগির সুযোগ কাজে লাগাতে চান আনোয়ার। যদিও বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ কয়ছর আহমদ দুই উপজেলাতেই দলকে ঐক্যবদ্ধ করে রেখেছেন। তিনি দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন। অনেক প্রবাসীও এসে তাঁর পক্ষে মাঠে নেমেছেন।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, এখানে জামায়াতে ইসলামী দলের নেতা ইয়াসীন খানকে প্রার্থী দিয়েছিল। পরে জোটের স্বার্থে ইয়াসীন মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। জামায়াতের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নিলেও ‘১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে’র শরিক তিন দলের তিনজন এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন। এই তিন প্রার্থীর শর্ত ছিল আসনটিতে যেন জামায়াতের প্রার্থী না থাকে। তবে তাঁদের তিন প্রার্থীর জন্য আসনটি উন্মুক্ত থাকবে। তাই এই জোটের শরিক তিন প্রার্থীর কাউকেই এখনো সমর্থন দেয়নি জামায়াত। এখন জামায়াতের ভোট কোনদিকে যায় সেটি দেখার বিষয়।

আনোয়ার হোসেন বলেছেন, ‘দুই উপজেলার যেখানেই যাচ্ছি মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। মানুষ উন্নয়ন চায়, ভালো মানুষকে ভোট দিতে চায়।’

মোহাম্মদ কয়ছর আহমদ দলের চেয়ারম্যানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, মানুষ জানে এখানে ধানের শীষ জয়ী হলে জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলায় সর্বোচ্চ উন্নয়ন হবে। মানুষ উন্নয়নের স্বার্থেই ধানের শীষে ভোট দেবে।

এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা অন্য দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেন মাহফুজুর রহমান খালেদ (টেবিল ঘড়ি) ও হুসাইন আহমেদ (ফুটবল)।

সুনামগঞ্জ-৪

সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পাঁচজন। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী দলের জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য নূরুল ইসলাম। এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হলেন দলটির জেলা নায়েবে আমির আইনজীবী মোহাম্মদ শামস্ উদ্দীন।

এই আসনে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন। তিনি মরমি কবি হাছন রাজার প্রপৌত্র। চারবার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদ ও একবার সুনামগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। একবার তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সুনামগঞ্জ-৩ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। একাধিকবার নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে নুরুল ইসলাম বয়সে তরুণ। ছাত্রজীবন থেকেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যুক্ত। জেলা বিএনপির দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক। বিগত ১৬ বছর দলের দুর্দিনে মাঠে ছিলেন, নেতা-কর্মীদের আগলে রেখেছেন। এখানে মনোনয়নকেন্দ্রিক নেতাদের মধ্যে যে দূরত্ব ও পৃথক বলয় গড়ে উঠেছিল সেটি মিটমাট করে এখন সবাইকে নিয়ে মাঠে কাজ করছেন। নুরুল ইসলাম বলেন, এটি বিএনপির আসন, ঘাঁটি বলা যায়। দলের সব নেতা-কর্মী ধানের শীষের পক্ষে মাঠে কাজ করছেন। এখানে ধানের শীষের জয় নিশ্চিত।

দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন বলেছেন, ‘আমি বিএনপির প্রতিষ্ঠা থেকে দলের সঙ্গে যুক্ত। আমার বয়স ৭৯ বছর। দলীয় মনোনয়ন নিয়ে তৃণমূলে অসন্তোষ আছে। আমি দলমত-নির্বিশেষে সবার সমর্থন পাচ্ছি।’

এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. শামস উদদীন দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। জয়ের ব্যাপারে তিনিও আশাবাদী। এই আসনে অন্য দুজন প্রার্থী হলেন জাতীয় পার্টির নাজমুল হুদা (লাঙ্গল) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শহীদুল ইসলাম পলাশী (হাতপাখা)। এই দুই প্রার্থীও মাঠে প্রচারণায় ব্যস্ত আছেন।