
মনু সেতুর ওপর থেকে হঠাৎ গাছের সারিতে চোখ আটকে যায়। এ এক চেনা ‘রূপসী বাংলা’র নতুন রূপ—গাছে গাছে রঙের মেলা। তখন দুপুর। গ্রীষ্মের ঝাঁজমাখা রোদ। গাছে-পাতায়, নদের জলে রোদের ঝিলিক।
গাড়িটা মনু সেতু দ্রুত পার হতে গিয়ে জটে আটকে যায়। চোখে পড়ে পশ্চিমে ঢালের দিকে। তখন মনে হয়, কোনো গাছের পাশ দিয়ে হাঁটলে হয়তো গাছের ছায়া–মায়া গায়ে লাগে। কিন্তু এভাবে গাছের উপচে পড়া সৌন্দর্য দেখতে পাওয়া যায় না। ওপর থেকে যেভাবে পাতার সবুজের সঙ্গে, আকাশের নীল ও রঙিন মেঘের সঙ্গে গা মিশিয়ে ফুলেদের ঝুলে থাকা, দোল খাওয়া দেখা যায়। নিচ থেকে বা পাশ থেকে সহসা বোঝা যায় না। গাছে গাছে তখন বেগুনি রঙের বন্যা বইছে। ফুলেরা ঢলে পড়ছে, হালকা বাতাস, পালকের মতো কিছু মেঘ ভাসছে আকাশে।
এটা ছিল সোমবার দুপুরের একটি রূপ। মঙ্গলবারের সকাল সেই মুগ্ধ করা মুহূর্তটিকেই মনে করিয়ে দেয়। মৌলভীবাজার শহরের উত্তর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মনু নদ। খরস্রোতা এই নদে এখন ধীর, শান্তগতিতে জল বয়ে চলেছে। সকালের আলো এই জলে ঝিলিক দিচ্ছে। শহরের কাছে, মনু নদের পাড়ে শান্তিবাগ এলাকায় তখন অন্য এক মনকাড়া, চোখজুড়ানো রঙের ঢেউ।
মনু নদের পাড়কে এখন যে ফুলটি পৃথক সৌন্দর্য দিয়েছে, রাঙিয়ে তুলছে, সেটি জারুল ফুল। একটা সময় জলাভূমির গাছ জারুল হয়তো এ রকম নদ-নদীর ধারে আপনা থেকে মাথা তুলেছে। যুগ যুগ ধরে ফুল ফুটেছে, শোভা ছড়িয়েছে। এখন জারুল ফুল দেখা গেলেও আগের মতো একসঙ্গে এত গাছের, এত ফুলের দেখা সচরাচর পাওয়া যায় না। মনু নদের পাড়ে এই গাছগুলো মাত্র কয়েক বছর আগে লাগানো হয়েছে। ধীরে ধীরে গাছগুলো বড় হয়ে উঠেছে। পাতাঝরা গাছগুলো সবুজ হয়েছে। এখন প্রায় অর্ধশত গাছের ডালে ডালে ফিরে এসেছে বেগুনি রঙের বন্যা। নদের পাড় ধরে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গাছের সারি। জলের দিকে ডালপালা ছড়িয়ে থাকা গাছগুলো এখন ফুলে ফুলে ভরে আছে। এমন বেগুনি মায়া—চোখ ফেরানো কঠিন।
জারুল নিম্নাঞ্চলের জলাভূমির উদ্ভিদ। যদিও জলাভূমি ছাড়া স্বাভাবিক শুষ্কতায় বাঁচে। বাংলাদেশ, ভারত ছাড়াও চীন, মালয়েশিয়ায় জারুলের দেখা মেলে। জারুল ফুলের নমনীয় বেগুনি রং আকর্ষণীয়। অনেকটা দূর থেকেই সবুজ পাতার ভিড়ে নিজেদের আলাদা করে চেনাতে পারে। বেগুনি রঙের ছয়টি পাপড়িতে গঠিত এই ফুল কখনো সাদা রঙের কাছাকাছিও হয়। বেগুনি রঙের ভেতর কখনো সাদার এমন মিশ্রণ—গাছে নতুন বৈচিত্র্য নিয়ে আসে। ফুলের কেন্দ্রে বহু ছোট পুংকেশর পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। পরাগকোষ হলুদ। বৃতি দৃঢ়, ধূসর-সবুজ, রোমশ ও যুক্ত। ফুল ফোটা শেষেও বৃতি ঝরে পড়ে না, ফলের সঙ্গে লেগে থাকে। জারুলের কাণ্ড অনেকটা পেয়ারাগাছের মতো। পাতা লম্বা, চওড়া ও গাঢ় সবুজ। শীতে পাতা খসে পড়ে। বসন্তের শেষে আবার কচি পাতার উজ্জ্বল সবুজে ভরে ওঠে। শাখায় আসে উজ্জ্বল বেগুনি রঙের ফুল। ফল ডিম্বাকৃতির ও বৃতিযুক্ত। বীজ সহজেই অঙ্কুরিত হয়। জারুলের লালচে রঙের কাঠ দৃঢ়, দীর্ঘস্থায়ী ও অনেক কাজে ব্যবহার করা যায়। ঘরের কড়ি-বর্গা থেকে নৌকা, গরুর গাড়ি, চাষের যন্ত্রপাতি থেকে সাধারণ আসবাব—সবই হয় জারুল কাঠে।