নিজের বাড়ির উঠানে বসে হান্নান সরদার নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। সম্প্রতি তোলা
নিজের বাড়ির উঠানে বসে হান্নান সরদার নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। সম্প্রতি তোলা

সুন্দরবনে দস্যুতা

‘ডাকাইতের গুলিতে এক পা হারালাম; তবু তো বাঁইচে আছি, এইডা সান্ত্বনা’

সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন হান্নান সরদার (৪৩)। বনদস্যুদের হাতে অপহরণ, নির্মম নির্যাতন এবং গুলিবিদ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁকে হারাতে হয়েছে একটি পা। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে দিন কাটছে তাঁর।

হান্নান সরদারের বাড়ি খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর গ্রামে। গত মঙ্গলবার তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানের এক কোণে একটি চেয়ারে বসে আছেন হান্নান। সামনে রাখা আরেকটি চেয়ারে ব্যান্ডেজে মোড়া কাটা পা। আশপাশে ভিড় করা স্বজনদের চোখে উৎকণ্ঠা আর কষ্ট। কয়েক সপ্তাহ আগেও যিনি দুই পায়ে ভর করে চলতেন, এখন তিনি স্থায়ীভাবে পঙ্গু।

সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা হয় হান্নানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি নিয়মিত সুন্দরবনে যাইনে। কৃষিকাজ করি। মাঝেমধ্যি বাড়ির খাবারের জন্যি মাছ ধরতি যাই। গত ৭ ডিসেম্বর চাচা কাসেমের সঙ্গে নদীতে মাছ ধরতিছিলাম। হঠাৎ দেখি, বনের মধ্যের খাল ধইরে একটা নৌকা আমাগের দিকে আসতিছে। বুঝে ওঠার আগেই ১০ থেকে ১২ জন অস্ত্রধারী আমাগেরে ঘিরি ফেলে।’

হান্নান সরদার জানান, দস্যুদের মধ্যে মহেশ্বরীপুর গ্রামের আল আমিন সরদার, আসাদুল ইসলাম ওরফে কোকিল ও জাহাঙ্গীরকে তিনি চিনতে পারেন। অস্ত্রের মুখে তাঁকে ও তাঁর চাচাকে জিম্মি করে সুন্দরবনের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই কয়েকজন জেলেকে বেঁধে রাখা ছিল।

ডাকাতদের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন হান্নান। তিনি বলেন, ‘আমারে গাছের সঙ্গে বাঁইধে মারতি শুরু করে। মারার সময় ডাকাত আল আমিন জানায়, অনেক দিন ধইরে সে আমারে খুঁজতিছিল। এলাকায় থাকতিই নাকি আমার ওপর তার রাগ। আমি কানতি কানতি বলি, আমি তো কারও ক্ষতি করিনি। কিন্তু সে কোনো কথা শোনেনি। আল আমিন বন্দুক তুলি আমার হাঁটুর নিচি গুলি কুরলো। গুলির লাইগে মনে হুলো পা শরীরিত্তে আলদা হুয়ি গেছে। আমি তখন চিৎকার করি কলাম, আমারে মারিস না, জানডা ভিক্ষা দে। কিন্তু আমার কথা শুনল না। কিছুক্ষণ থাইমে গালাগালি দিতে দিতে আবার গুলি কুরলো একই পায়ে। তখনো আমি হুঁশি ছিলাম। শুধু বলতিছিলাম, আমি মইরে যাচ্ছি, আমারে বাঁচা। তারপর আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।’

হান্নান সরদার জানান, পরে কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে। প্রথমে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সর্বশেষ ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে তাঁর বাঁ হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয়।

পঙ্গু হয়ে আয়রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে হান্নান সরদারের। পরিবার নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন। তিনি বলেন, ‘আমার সংসারে বৃদ্ধ মা, স্ত্রী আর দুই সন্তান। এখন আমি কীভাবে চলব, কীভাবে সংসার চালাব—সব অন্ধকার। ডাকাইতের গুলিতে এক পা হারালাম, তবু তো বাঁইচে আছি—এটাই এখন সান্ত্বনা।’

হান্নানের মা সালেহা বেগম বলেন, ‘ছেলেটার কষ্ট আমি চোখে দেখতি পারিনে। যারা এই কাজ করিছে, তাদের শাস্তি চাই।’

হান্নানের সঙ্গে অপহৃত হয়েছিলেন কাসেম সরদার। তিনি বলেন, ‘ডাকাইতের নির্মমতা ভাষায় বোঝানো যাবে না। হান্নানের চিৎকার আজও কানে বাজে।’

কয়রা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় আল আমিন সরদার, আসাদুল ইসলাম ও আবদুর রহমানকে আসামি করে মামলা হয়েছে। তাঁদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

কোস্টগার্ড ও স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়রার মহেশ্বরীপুর গ্রামের আল আমিন দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনভিত্তিক দস্যুচক্রের সঙ্গে জড়িত। গত বছরের ১৮ এপ্রিল অস্ত্র–গোলাবারুদসহ সুন্দরবন থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি আবার দস্যুতায় জড়িয়ে পড়েন। এর আগে ২০১৮ সালের শেষ দিকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিলেন আল আমিন।

কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক বলেন, ‘সুন্দরবনে দস্যু দমনে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত এক বছরে ৫২ জন জেলেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৪৯ জন দস্যুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’