সুনামগঞ্জের হাওরে এখন আর কোনো ধানই ভেসে নেই। সবই পানির নিচে। তলিয়ে থাকতে থাকতে ধানে পচন ধরেছে। তবে উঁচু অংশে এখনো কিছু ধান আছে। সেগুলো কাটছেন কৃষকেরা। আবার যাঁদের উঁচুতে জমি নেই, তাঁরা শেষ সম্বল পানির নিচের আধপচা ধানেরই কিছু কিছু কাটার চেষ্টা করছেন। এ জন্য নৌকা লাগছে। গলাসমান, কোথাও তার চেয়ে বেশি পানিতে নেমে ধান কাটতে হচ্ছে। এটি কৃষকদের জন্য বড় কষ্টের।
টানা কয়েক দিন রোদ থাকায় হাওরের খলায় রাখা ধান শুকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কৃষকেরা। এসব ধানেও চারা গজিয়েছে, আবার অনেকের ধান শুকাতে না পারার কারণে খলার স্তূপেই নষ্ট হয়েছে। গন্ধ ধরে গিয়েছিল সেই ধানে। হাওরে রোদে ধানপচা গন্ধ এখন কাটছে, তবে কৃষকের দুঃখ-দুর্ভোগ এখনো রয়েই গেছে। এরই মধ্যে আগামী সপ্তাহে আবারও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির আভাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
জেলার দেখার হাওরে পানির নিচে এখনো কৃষক আবদুল মতিনের (৬০) দেড় বিঘা জমির ধান। ধানের ওপর পুরোপুরি নির্ভর আবদুল মতিন সোমবার দুপুরে কলেজপড়ুয়া ছেলে জুনায়েদ আহমদকে সঙ্গে নিয়ে সেই ধান কাটার চেষ্টা করছেন। এ জন্য এক হাজার টাকায় এক দিনের জন্য একটি ছোট নৌকা ভাড়া নিয়েছেন। বাবা-ছেলে মিলে গভীর হাওর থেকে ধান কেটে এনে রাখছিলেন হাওরপাড়ে। মাথার ওপর কড়া রোদ।
ধান রাখতে রাখতে কথা হয় আবদুল মতিনের সঙ্গে। তিনি জানান, ৯ বিঘা জমির মধ্যে এবার বৈশাখের শুরুর দিকেই জলাবদ্ধতায় ৪ বিঘা তলিয়েছে। এরপর তিন বিঘার কিছু বেশি জমির ধান কেটেছেন। পরে ঢলের পানি এসে বাকি জমির সব ধান তলিয়ে দেয়। এখন রোদ থাকায় পানির নিচের সেই ধান কাটার চেষ্টা করছিলেন। সদর উপজেলার রাবারবাড়ি গ্রামে এই কৃষকের বাড়ি।
হাওরে গিয়ে দেখা যায়, ধান শুকানোতেই ব্যস্ততা বেশি কিষানিদের। কেউ কেউ কাটা ভেজা ধান শুকাতে দিচ্ছেন। শুকানোর পর সেগুলো মেশিনে মাড়াই করা হবে। আবার দূরে গভীর হাওরে ডুবে যাওয়া ধান কেটে এনে পাড়ে রাখছিলেন কেউ কেউ। তবে এই সংখ্যা কম। কারণ, অনেকেই ডুবে যাওয়া ধানের আশা ছেড়ে দিয়েছেন।
কৃষকেরা জানালেন, পানির নিচে এক সপ্তাহ ধান আছে। সেই ধান কাটলেও কোনো লাভ হবে না। আবার কোথাও কোথাও পানি বেশি থাকায় কাটাও যাচ্ছে না। রয়েছে নৌকা ও শ্রমিকের অভাব। দিনে বৃষ্টি না হলেও রাতে বৃষ্টি হওয়ায় ভোগান্তি কমছে না কৃষকদের। খলা ভিজে যাওয়ায় ধান শুকাতে সময় লাগে বেশি। তবে ধীরে ধীরে হাওরে ব্যস্ততা কমছে কিষান-কিষানিদের। অনেকেই হতাশ, ফসল না পাওয়ার কষ্ট নিয়ে এবার হাওর থেকে ফিরেছেন। কৃষকেরা বলছেন, হাওর থেকে ধানপচা গন্ধ যাবে। হাওরে বর্ষার থই থই পানি আসবে। কিন্তু কৃষকের মনের কষ্ট থেকেই যাবে।
কৃষক আবদুল মতিন আলাপকালে জানান, পানির নিচের ধান শ্রমিকেরা ভাগিতে কাটেন না। এ জন্য এক হাজার টাকা এক দিনের জন্য মজুরি লাগে। হাতে টাকা নেই, লোকও পাওয়া যায় না। তাই ছেলেকে নিয়েই যা পারেন কাটার চেষ্টা করছেন। মতিন বলছিলেন, ‘সব জমি কাটা যাবে না। পানিতে বেশি সময় থাকা যায় না। শরীর চুলকায়। পানিতেও ধানপচা গন্ধ।’ ছেলে জুনায়েদ আহমদ বলেন, ‘এই ধানই ত আমার সব। ঘরের খরচ, আমার লেখাপড়া—সবই ধান থাকি আয়। এর লাগি আমিও বাবার লগে হাওরে আছি।’
পাশে থাকা নীলপুর গ্রামের কৃষক আবু বকর (৫৫) তখন রোদের মধ্যে খড় শুকানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এই কৃষক জানালেন, এবার হাওরের কৃষকদের ফসল গেছে। মানুষের সংকটের সঙ্গে গো-খাদ্যের সংকটও দেখা দেবে। ধান না উঠলে, খড়ও ওঠে না।
খলায় চার দিন আগে একইভাবে পানির নিচ থেকে এক বিঘা জমির ধান কেটে এনে স্তূপ করে রেখেছিলেন মোহাম্মদ আলী (৬৭)। আগের কাটা ও মাড়াই করা ধান শুকানো নিয়ে ব্যস্ত থাকায় নতুন করে কাটা ধান মাড়াই করতে পারেননি। স্তূপ থেকে এসব ধানের চারা গজিয়েছে। সেই ধান রোদে মেলে দিচ্ছিলেন তিনি। ধানে গজানো চারা দেখিয়ে এই কৃষক বলছিলেন, ‘কোনটা করতায়। ওই রইদ, তে ওউ মেঘ। আমার ইবার বড় মুছিবতে পড়িগিছি। আমরা কষ্ট আর যাইত না।’
পাশেই কৃষক সালাম মিয়া (৬০) স্ত্রী সায়েরা বেগমকে নিয়ে স্তূপ থেকে ভেজা জটবাঁধা ধান ঝেড়ে ময়লা ছাড়াছিলেন। সায়েরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আর কয়দিনরে বাবা, হাওর ত ঠান্ডা অইজিব। তোমরাও আইতায় না, আমরার কথাও কেউ আর মাত ত না। আমরার কষ্ট আমরাই পাইমু।’
এখনো ২০ ভাগ ধান হাওরে
এবার সুনামগঞ্জ জেলার ১৩৭টি হাওরে বোরো আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। আবাদ হওয়া জমির মধ্যে হাওরে (নিচু অংশে) জমির পরিমাণ ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর, নন–হাওরে (উঁচু অংশে) ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর।
কৃষি বিভাগের হিসাবে, রোববার পর্যন্ত হাওরে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৭৯ হেক্টর ধান কাটা হয়েছে। নন–হাওরে ৩৬ হাজার ৯৩৫ হেক্টর। গড়ে এ পর্যন্ত সুনামগঞ্জে ধান কাটা হয়েছে ৮০ দশমিক ৭১ শতাংশ। সেই হিসাবে এখনো হাওরে ২০ ভাগ ধান আছে। অতিবৃষ্টি ও ঢলে জমির ক্ষতির পরিমাণ ১৬ হাজার ৩৯৫ হেক্টর। যদিও স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি।
এ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মোহাম্মদ রাজু আহমেদ বলেন, ‘কৃষি অফিস ক্ষতি কম দেখায় কেন আমি বুঝি না। হাওরে তো আর কোনো ধান নাই, যা আছে কিছুটা উঁচু অংশে। হাওরের অর্ধেক ধানের ক্ষতি হয়েছে।’
অবশ্য জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক সোমবার বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। তাঁরা এখনো চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করেননি।
ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, ধান রাখা যাবে না
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পক্ষ থেকে সোমবার বলা হয়েছে, সামনে ভারী ও অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। তাই হাওরে উঁচু-নিচু কোথাও আর ধান রাখা যাবে না। যা আছে, তা কেটে ফেলতে হবে।
পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনজুর রহমান জানিয়েছেন, সুনামগঞ্জে আগামী এক সপ্তাহ বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। এর মধ্যে ১৪ থেকে ১৮ মে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে। এতে সুনামগঞ্জের নদ-নদী ও হাওরে পানি আরও বাড়বে।
সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী (পওর বিভাগ-২) মোহাম্মদ এমদাদুল হক বলেছেন, যেহেতু অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে, তাই কৃষকদের প্রতি অনুরোধ, হাওরে ধান রাখা যাবে না। দ্রুত সব কেটে তুলতে হবে। তিনি জানান, এবার সুনামগঞ্জের হাওরে ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার হয়েছে।