
২০১৪ সালের মে মাসে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মারা যান লিপি বেগমের স্বামী জাকারিয়া রহমান। দিনমজুর স্বামীর মৃত্যুর পর তিন সন্তানকে নিয়ে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েন তিনি। কী করবেন কিছুই ভেবে পাচ্ছিলেন না। মানুষের সহায়তা পেতে বাধ্য হয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে হয়েছিল তাঁকে। লিপি বেগমের দুরবস্থার কথা পরিচিত একজনের মাধ্যমে জানতে পারেন বেসরকারি একটি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা মোরশেদুল হক।
এক যুগ আগে একদিন একটি সেলাই মেশিন কিনে লিপি বেগমের বাড়িতে হাজির হন মোরশেদুল। এর পরই নতুনভাবে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে পান তিনি। সেলাই মেশিন পাওয়ার ১২ বছর পর এসে দেখা যাচ্ছে রংপুরের বদরগঞ্জের মানসিংহপুর গ্রামের লিপি বেগমের শণের ঘরে টিন লেগেছে। ঘরে টেলিভিশন ও ফ্রিজ আছে। সেলাই মেশিন থেকে আয়ের টাকায় পাঁচটি গরু কিনেছেন। ৪০ শতক আবাদি জমিরও মালিক হয়েছেন।
লিপি বেগমের ছেলে এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা ভ্যান চালান। দুই মেয়ে এসএসসি পাসের পর এখন ঢাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি করছেন।
গত এক যুগে জীবনে একটু একটু করে সচ্ছলতা আসার জন্য মোরশেদুলের অবদান সবচেয়ে বেশি বলে মনে করেন লিপি বেগম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৪ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর সেলাই মেশিন দিয়ে মোরশেদুল সহায়তা না করলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াতেন, কে জানে!
মোরশেদুলের জন্ম ১৯৮৪ সালে। তাঁর বাড়ি বদরগঞ্জ উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের আফিসপাড়া গ্রামে। তিনি গ্রামের আবদুল আজিজ ও মোসলেমা বেগম দম্পতির একমাত্র ছেলে। তাঁর বাবা আবদুল আজিজ বলেন, ‘ছেলেটা কম বয়স থেকেই প্রতিবেশীদের অভাব-অনটন সহ্য করতে পারত না। বাড়ির ধান-চাল দিয়ে তখন সহায়তা করত।’
মোরশেদুল ২০০৯ সালে বগুড়ার শেরপুরের মহিপুর কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইন অ্যাগ্রিকালচার সম্পন্ন করেছেন। তিনি বর্তমানে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা হেল্প ফর ডিপ্রাইভড ফাউন্ডেশনের অ্যাগ্রিকালচার বেজড ট্রেনিং প্রোগ্রামের কো–অর্ডিনেটর।
কারও বিপদের খবর পেলেই ছুটে যান
কারও চিকিৎসার টাকা নেই, কেউ কাজ হারিয়ে সংসার চালাতে পারছেন না, কারও ঘর নেই, আবার কারও সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম, কারও রক্তের দরকার—এ রকম নানা সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ান মোরশেদুল।
বদরগঞ্জের রাধানগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবুবক্কর সিদ্দিক বলেন, মোরশেদুল পারিবারিকভাবে সচ্ছল। তিনি নিজের টাকা খরচ করে অনেক গরিব মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। তাঁর সহযোগিতায় এলাকার অনেক অসহায় মানুষ ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।
ইউপি চেয়ারম্যানসহ রাধানগর ইউনিয়নের কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে মোরশেদুলের পরোপকারী মানসিকতার নানা ঘটনার কথা জানা যায়। তাঁরা যেসব তথ্য দিয়েছেন, তা সরেজমিনে যাচাই করেছে প্রথম আলো। উদাহরণ হিসেবে একটি ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। ২০১৯ সালের জুনে সড়ক দুর্ঘটনায় বদরগঞ্জের মাজাপাড়া গ্রামের আয়েশা খাতুনের স্বামী আবদুল মতিন মারা যান। অসহায় এই পরিবারের পাশে দাঁড়ান মোরশেদুল। স্বামীহারা আয়েশাকে সেলাই মেশিন কিনে দেন তিনি। টিনের ঘর তৈরিতেও সহায়তা করেন।
একইভাবে বদরগঞ্জের মানসিংহপুর গ্রামের মর্জিনা বেগমকে ২০টি হাঁস-মুরগি, চারটি ছাগল ও একটি গাভি কিনে দেন মোরশেদুল। মর্জিনার এখন মুরগির খামার আছে। সংসারের খরচ মিটিয়ে মাসে সাত-আট হাজার টাকা সঞ্চয় করেন।
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহমুদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, মানুষের সহায়তায় মোরশেদুল যেভাবে এগিয়ে যান, তা অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার। তিনি সব সময় মানবিক কাজে যুক্ত থাকবেন—এটা সবার প্রত্যাশা।
নানা ধরনের সহায়তা
মোরশেদুল জানান, অসহায় মানুষকে স্বাবলম্বী হতে ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত পাঁচজনকে ইজিবাইক কিনে দিয়েছেন। ৫২ জনকে দিয়েছেন রিকশা ভ্যান এবং ১১২ জনকে সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছেন। এ ছাড়া অসহায় ১২ জনকে ছোট মুদিদোকান তৈরিতে সহায়তা করেছেন। ১১৫টি পরিবারকে হাঁস-মুরগি কিনে দিয়ে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করেছেন। এর বাইরে ১০ জনকে গরু কিনে দিয়েছেন। ২৫ জন নারীকে ছাগল কিনে দিয়ে সহায়তা করেছেন।
মোরশেদুলের দেওয়া তালিকার পাঁচজন ইজিবাইকচালকের মধ্যে তিনজনের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের একজন বদরগঞ্জের পাঠানপাড়া গ্রামের ছাবের আলী। তিনি বলেন, একটি হোটেলে কাজ করে পাঁচ সদস্যের পরিবার চালাতে হতো তাঁকে। এক বছর আগে তিনি স্ট্রোক করেন। এরপর কাজ করতে পারছিলেন না। তাঁর অবস্থার কথা এক প্রতিবেশী মোরশেদুলকে জানান। এর পর তিনি একদিন বাড়িতে আসেন। পরে তাঁকে একটি ইজিবাইক কিনে দেন।
যে ৫২ জনকে রিকশা ভ্যান দিয়ে সহায়তা করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে নয়জনের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। এই নয়জনের একজন বদরগঞ্জের রাধানগর মণ্ডলপাড়া গ্রামের আমিনুল ইসলাম।
এ ছাড়া মোরশেদুলের কাছ থেকে সেলাই মেশিন সহায়তা পাওয়া ১১২ জনের মধ্যে ১১ জনের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা সেলাই মেশিন পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বদরগঞ্জের মানসিংহপুর গ্রামের লিপি বেগমও রয়েছেন।
স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য মোরশেদুলের কাছ থেকে মুদিদোকান করার ক্ষেত্রে সহায়তা পাওয়া ছয়জনের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
রংপুর সদর, বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার অসহায় মানুষকে নতুন জীবন পেতে সহায়তা করেছেন মোরশেদুল।
স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় ২০২৩ সাল থেকে গত তিন বছরে ১৩টি বাল্যবিবাহ বন্ধে ভূমিকা রেখেছেন মোরশেদুল। রাধানগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রোকসানা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, মোরশেদুল এলাকায় বিভিন্ন ধরনের মানবিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। এর পাশাপাশি তিনি বাল্যবিবাহ রোধেও কাজ করছেন। মোরেশেদুলের উদ্যোগে কয়েকটি বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়েছে।
২০২৪ সালের এক সকালে ট্রেনে ঢাকায় যাওয়ার সময় মোরশেদুলের পরিচয় হয় পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার নওরিন নামের পাঁচ বছরের এক শিশুর সঙ্গে। হাঁটুতে ঘায়ের কারণে শিশুটির একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছিল। অর্থের অভাবে কৃত্রিম পা লাগানো সম্ভব হচ্ছিল না। পরে বন্ধুবান্ধবের সহযোগিতায় নওরিনকে কৃত্রিম পা লাগানোর ব্যবস্থা করেন তিনি। পরে শিশুটির ক্যানসার ধরা পড়ে এবং মারা যায়।
মোরশেদুল বলেন, ‘নওরিনকে বাঁচাতে পারিনি। কৃত্রিম পা লাগানোর পরে শিশুটির হাসি আজও ভুলতে পারি না।’
বদলেছে একটি ব্যবস্থা
২০২২ সালের ২৩ অক্টোবর পঞ্চগড়গামী একটি ট্রেনের যাত্রী ছিলেন মোরশেদুল। ট্রেনের ভেতর এক নারীর হঠাৎ স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু ট্রেনে ন্যাপকিনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। পরে ট্রেন একটি স্টেশনে থামলে গার্ডকে (পরিচালক) বলে ন্যাপকিন কিনে তিনি ওই নারীর হাতে তুলে দেন। এর পর থেকে ট্রেনে ন্যাপকিন রাখার দাবি নিয়ে নিজ উদ্যোগে প্রচার শুরু করেন মোরশেদুল।
দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলস্টেশনের প্রধান বুকিং সহকারী নাজমুল বাসার মো. আহসানুল আশিষ গতকাল বৃহস্পতিবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, মোরশেদুলের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে ২০২৩ সাল থেকে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের কমার্শিয়াল ম্যানেজারের নির্দেশে এখন সব ট্রেনে (পশ্চিমাঞ্চল) ন্যাপকিন রাখা হচ্ছে।
একার নয়, অনেকের সহায়তা
মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য যে অর্থ ব্যয় হয়, সেটি কীভাবে জোগাড় করেন প্রথম আলোর এমন প্রশ্নের জবাবে মোরশেদুল বলেন, তাঁর বাবার ১০ একর জমি তিনি নিজে আবাদ করেন। এ ছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে মাসে গড়ে ৫০ হাজার টাকা আয় করেন। সংসারের খরচ মেটানোর পর বছরে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত থাকে। নিজের অর্থের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও পরিচিত ব্যক্তিদের সহযোগিতায় তিনি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।
দূরের কেউ সহযোগিতা করতে চাইলে ওই ব্যক্তিকে সরাসরি অসহায় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন বলে জানান মোরশেদুল। তিনি বলেন, ‘যত দিন বেঁচে থাকব, তত দিন মানুষের সেবা করে যাব।’