ডুবে যাওয়া খেত থেকে আলু তুলছেন শ্রমিকরা। সদর উপজেলার উত্তর ঠাকুরগাঁও এলাকায়
ডুবে যাওয়া খেত থেকে আলু তুলছেন শ্রমিকরা। সদর উপজেলার উত্তর ঠাকুরগাঁও এলাকায়

‘আলুর দাম নাই, ঈদ করিমো কেমন করে’

হঠাৎ বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে আলুখেত। পচে যাওয়ার আশঙ্কায় পরিবারের সবাই মিলে নেমে পড়েছেন আলু তোলায়। আর সেই কর্মযজ্ঞ দেখছেন শামসুল হক। কেমন আছেন জানতে চাইলে, মুচকি হাসলেন তিনি। বলেন, ‘দেখিবাই তো পারছেন, কেমন আছু।’ এরপর চুপ হয়ে গেলেন তিনি। খানিক পরে বলেন, ‘আলুর দাম নাই। বিকিবা গেলেই লস আর লস। তার ওপর বৃষ্টিখান আসিয়া হামাক ধ্বংস করে দিয়া গেইল।’

শামসুল জানান, ধারদেনা করে এবার দুই বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। ১ কেজি আলু উৎপাদনে তাঁর ১৫ টাকা খরচ হলেও বাজারে ৯ থেকে ১০ টাকা দরে সেই আলু কেনাবেচা হচ্ছে। বৃষ্টিতে খেত ডুবে যাওয়ার পর সব কৃষক একসঙ্গে আলু তুলে ফেলছেন। এতে আলুর দাম আরও কমে গেছে। আলু কেনার লোকও নেই।

গত শনিবার সকালে ঠাকুরগাঁও–বালিয়াডাঙ্গী সড়কের পাশে দাসপাড়া এলাকায় কথা হয় শামসুল হকের সঙ্গে। তিনি জানান, প্রতিবছর জমির ফসল বিক্রি করে লাভের টাকায় কৃষকেরা পরিবারে জন্য ঈদের কেনাকাটা করেন। কিন্তু এবার লাভ তো দূরের কথা, আলু বিক্রি করতে গেলেই লোকসান গুনতে হচ্ছে। এবারের ঈদের প্রসঙ্গ তুলতেই শামসুল বলেন, ‘হামার ফের ঈদ।’

বছর দুই হলো ফেরদৌসী আকতারের স্বামী মারা গেছেন। সেই থেকে তাঁকেই স্বামীর জমিজমা দেখভাল করতে হয়। ফেরদৌসী এবার এক একর জমিতে আলু চাষ করেছেন। সেই জমির আলু তুলছিলেন তিনি। দাম ও ক্রেতা না থাকায় জমির আলু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন এই নারী। এরই মধ্যে ঈদের চিন্তা পেয়ে বসেছে তাঁকে। ফেরদৌসী আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার দুই ছেলে। ভাবছিলাম, আলু বিক্রি করে ওদের জন্য ঈদের কেনাকাটা করব। কিন্তু আলুর তো দাম নাই। বিক্রিও হচ্ছে না। এবার ঈদ করব ক্যামন করে?’

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার মধ্য বালিয়াডাঙ্গী গ্রামের কৃষক মহিদুল ইসলাম দুই বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। এক বিঘা জমিতে আলু আবাদ করতে রোপণ, নিরানি, সার, কীটনাশক, সেচ ও উত্তোলন খরচ—সব মিলিয়ে গড়ে তাঁর ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বৃষ্টির জমা পানিতে পচে যাওয়ার আশঙ্কায় খেত থেকে সব আলু তুলে ফেলছেন তিনি। মহিদুল বলেন, ‘বাজারে আলুর যে দাম, তাতে উৎপাদন খরচ উঠছে না। আগে কথায় কথায় বলতাম, পানির দামে ফসল বিক্রি করে দিলাম। এবার আলু পানির দামের চেয়েও কম যাচ্ছে। দোকানে আধা লিটার পানি কিনতে গেলে দুই থেকে আড়াই কেজি আলু বিক্রি করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় ঈদের খরচের কথা ভাবতে পারছি না। আলুর দাম নাই, ঈদের কেনাকাটাও নাই।’

দলবেঁধে খেত থেকে আলু তুলছেন শ্রমিকেরা। এবার আলুর দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা

শুধু শামসুল ইসলাম, ফেরদৌসী আকতার ও মহিদুল ইসলাম নন; ঠাকুরগাঁওয়ের প্রান্তিক কৃষকের সবারই এবার একই অবস্থা। আলুর দাম না থাকায় ঈদের আমেজ নেই তাঁদের মধ্যে।

শনিবার ছিল সদর উপজেলার খোঁচাবাড়ি হাটের দিন। হাটে আশপাশের মানুষজন কেনাকাটা করতে আসেন। হাটে দেখা যায়, তেমন কর্মব্যস্ততা নেই। দু–একটি দোকানে কয়েকজন ক্রেতার দেখা মিললেও প্রায় দোকানে অলস সময় পার করছেন দোকানিরা।

শহরের নর্থ সার্কুলার সড়কে দুই মেয়েকে নিয়ে ঈদের কেনাকাটা করতে আসেন সিংপাড়া এলাকার বাসিন্দা জাহের আলি। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েদের কিছু একটা বোঝাচ্ছিলেন তিনি। ঈদের কেনাকাটা করছেন? জিজ্ঞাসা করতেই জাহের আলী বলেন, ‘মেয়ে দুইটা নতুন জামা কিনার বায়না ধরিছে। দোকানদার একটা জামার দাম ছয় হাজার টাকা চাচ্ছে। ওই জামা কিনতে গেলে কম করে হলেও ১৫ মণ আলু বিক্রি করতে হবে। তাই মেয়েদের বোঝাচ্ছি, ওরা যেন কম দামের জামা নেয়।’

পাকিজা ফ্রেবিকসের মালিক সোহরাব হোসেন বলেন, ‘এবার ঈদের বাজার খুব একটা ভালো নয়। গত বছর ১৫ রমজানের পর থেকে প্রতিদিন কম করে হলেও দেড় লাখ বিক্রি করেছি। এখন বিক্রি হয় ৫০-৬০ হাজার। গ্রামের মানুষেরা খুব একটা মার্কেটে আসছে না।’

সদরের কহরপাড়া গ্রামের শহিদুল ইসলাম শহরের চৌধুরী মার্কেট থেকে ছেলের জন্য জুতা কিনে বাড়িতে ফিরছিলেন। কথা হলে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘চার মণ আলুর দামে এক জোড়া জুতা কিনিবা হইল। জুতা–কাপড়ের এত দাম, হামার আলুলারই দাম নাই।’

আকচা গ্রামের বর্গা চাষি বেলাল হোসেন পাঁচ বস্তা আলু শহরের পাইকারি সবজি বাজারে বিক্রি করতে এসে ফেরত নিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। বেলাল হোসেন বলেন, ‘ঈদের খরচ করিবা নাগে। বিক্রিরতানে বাজারত আলু নিয়া গেছিনু। পাইকার অর্ধেক দাম কহে। তাই বাড়িত ধরিয়া যাছু। আলুর দাম না পাইলে ঈদের খরচ করিমো ক্যামন করে?’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের মৌসুমে জেলায় ২৮ হাজার হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। তবে আবাদ হয়েছে ২৮ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে। আর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাত লাখ টন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, এই এলাকায় চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত আলু উৎপাদিত হয়। অতিরিক্ত আলু ব্যবহারের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। আলুর ব্যবহার বাড়লেই কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম পাবেন।