মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নাফ সীমান্তে গোলাগুলি, আগুনের ধোঁয়ার দৃশ্য। আজ রোববার সকালে কক্সবাজারের টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তে
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নাফ সীমান্তে গোলাগুলি, আগুনের ধোঁয়ার দৃশ্য। আজ রোববার সকালে কক্সবাজারের টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তে

রাখাইনে ত্রিমুখী সংঘর্ষ ও বিমান হামলা, ওপারের গুলিতে টেকনাফে শিশু আহত

মিয়ানমার থেকে আজ রোববার সকাল ৯টার দিকে আসা গুলিতে বাংলাদেশি এক শিশু আহত হয়েছে। টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ সীমান্ত এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। শিশুটির নাম আফনান (১১)। সে ওই গ্রামের জসিম উদ্দিনের মেয়ে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) অলক বিশ্বাস আজ দুপুর আড়াইটার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, শিশুটি গুলিবিদ্ধ হয়েছে। প্রথমে মারা যাওয়ার কথা শোনা গেলেও তা সঠিক নয়। শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

এর আগে হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) খোকন চন্দ্র রুদ্র প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ওপার থেকে আসা গুলিতে শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গুলিতে আহত হয়েছেন আরও একজন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে সড়ক অবরোধ করেন।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বিমান হামলা, ড্রোন হামলা, মর্টারশেল ও বোমা বিস্ফোরণ থামছে না। তিন দিন ধরে রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের আশপাশের এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) অবস্থানে বিমান হামলা জোরদার করেছে সরকারি জান্তা বাহিনী।

অন্যদিকে আরাকান আর্মির সঙ্গে স্থলভাগে সংঘর্ষে জড়িয়েছে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র তিনটি গোষ্ঠী। এ কারণে সীমান্ত পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। ওপারের বিকট শব্দের বিস্ফোরণে টেকনাফের বাংলাদেশ সীমান্তের গ্রামগুলোয় ভূকম্পন দেখা দিচ্ছে। কেঁপে উঠছে লোকজনের ঘরবাড়ি। ওপার থেকে ছোড়া গুলি এসে পড়ছে এপারে লোকজনের ঘরবাড়ি-চিংড়িঘের ও নাফ নদীতে।

বাংলাদেশ–মিয়ানমারের সীমান্তকে ভাগ করেছে নাফ নদী

সর্বশেষ গতকাল শনিবার সন্ধ্যা থেকে আজ সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তের বিপরীতে রাখাইন রাজ্যের বলিবাজার এলাকায় থেমে থেমে ব্যাপক গোলাগুলি, মর্টারশেলের বিস্ফোরণ ঘটেছে। বিকট শব্দের বিস্ফোরণে টেকনাফের হোয়াইক্যং ও উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১১টি গ্রাম কেঁপে উঠছে। লোকজন রাত জেগে সময় পার করেন। অনেকে ঘরবাড়ি ফেলে নিরাপদ স্থানে ছোটেন। নাফ নদী ও স্থলসীমান্তে নজরদারি ও টহল বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ড।

সীমান্তের একাধিক সূত্র জানায়, হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সঙ্গে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা), আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং নবী হোসেন বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি ও থেমে থেমে গুলিবর্ষণ চলছে। অন্যদিকে মিয়ানমার জান্তা বাহিনীও আরাকান আর্মির অবস্থানে বিমান হামলা ও বোমা হামলা চালাচ্ছে।

কক্সবাজারের টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকায় মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে বাংলাদেশি শিশুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী সড়ক অবরোধ করেন। আজ রোববার সকালে

উখিয়া-৬৪ বিজিবির ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল জহিরুল ইসলাম বলেন, সীমান্তের ওপারে পরিস্থিতি এবং গোলাগুলির বিষয়টি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদী ও সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউ) সদস্য সিরাজুল মোস্তফা বলেন, তিন দিন ধরে হোয়াইক্যংয়ের ওপারে রাখাইন রাজ্যে ও দেশটির সীমান্তে দিনরাত গোলাগুলি ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটছে। ওপারের গুলি এসে পড়ছে হোয়াইক্যং সীমান্তের লোকজনের ঘরবাড়ি ও চাষের জমিতে। ওপারের গুলি আতঙ্কে লোকজন স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারছেন না।

স্থানীয় জেলে মো. রফিক বলেন, আজ সকালে হোয়াইক্যং তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় বেড়িবাঁধে গেলে তিনি বেশ কিছু গুলি দেখতে পান। তখন ওপারে গোলাগুলি হচ্ছিল। এ সময় একটি গুলি এসে পড়ে তাঁর পায়ের কাছে মাটিতে। অল্পের জন্য গুলিটি তাঁর শরীরে বিদ্ধ হয়নি।  

সম্প্রতি রাখাইন রাজ্য থেকে টেকনাফের আশ্রয়শিবিরে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মো. আরমান বলেন, রাখাইন রাজ্যের সীমান্তে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আরাকান আর্মির মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ চলছে। মাঝেমধ্যে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলাও চলছে। রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি থমথমে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির ঘটনার বিষয়ে বিজিবিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করতে সতর্ক করা হচ্ছে।

সংশোধনী: প্রথমে হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির এসআই জানিয়েছিলেন, গুলিতে শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পরে দুপুরে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) জানান, শিশুটি গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তাই আগের সংবাদের তথ্য সংশোধন করা হলো।