গাজীপুরের শ্রীপুর

কারখানার বর্জ্য থেকে মুক্তি চান গ্রামবাসী

পচা পানির কারণে অনেকেই ফসল উৎপাদন করতে পারছেন না। মরে গেছে পার্শ্ববর্তী বিলের মাছ।

কারখানার ভেতর থেকে পাইপ দিয়ে অনবরত বর্জ্যমিশ্রিত বিষাক্ত পানি পাশের কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। গত রোববার গাজীপুরের শ্রীপুরের ধলাদিয়া গ্রামে
  ছবি: প্রথম আলো

একটি বড় পাইপ বেয়ে খালে এসে পড়ছে কারখানার কালো ও গাঢ় নীল পানি। চারপাশে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। ছোট খালটি ছাপিয়ে পানি ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের জমিতে। দূষণের কারণে বেশির ভাগ অনাবাদি পড়ে আছে। এই দৃশ্য গাজীপুরের শ্রীপুরের রাজাবাড়ী ইউনিয়নের সাটিয়াবাড়ী ও পার্শ্ববর্তী গ্রাম ধলাদিয়ায়। গ্রাম দুটির বাসিন্দাদের ভোগাচ্ছে একটি কারখানার তরল বর্জ্য।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, ডার্ড কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড নামে ওই কারখানার বর্জ্যে শুধু কৃষির ক্ষতিই না, মারা যাচ্ছে আশপাশের জলাশয়ের মাছ। তীব্র দুর্গন্ধে আশপাশের মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে বিভিন্ন রোগে। ওই এলাকার কৃষক কামাল হোসেন বলেন, পচা পানির কারণে অনেকেই ফসল উৎপাদন করতে পারছেন না। আগে বিঘাপ্রতি ৩০-৩৫ মণ ধান পাওয়া যেত। এখন ১৫ মণের বেশি ধান ওঠানো সম্ভব হয় না। এ ছাড়া পচা পানিতে পার্শ্ববর্তী বিলের মাছ মরে গেছে।

কারখানার দক্ষিণ পাশের ওই এলাকায় প্রবেশ করতেই তীব্র দুর্গন্ধে বোঝা গেল দূষণের ভয়াবহতা। অনবরত ময়লা-আবর্জনা মিশ্রিত দূষিত পানি পড়ার কারণে পার্শ্ববর্তী খালটি প্রায় অস্তিত্বশূন্য হয়ে পড়েছে। ছবি তোলার সময় গ্রামের কয়েকজন এগিয়ে আসেন। তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দূষণের কারণে তাঁরা অসহায় অবস্থায় আছেন। তবুও তাঁদের পক্ষে কেউ কথা বলে না।

অভিযোগের সত্যতা আছে বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজনও। পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুর কার্যালয়ের উপপরিচালক নয়ন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ডার্ড কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড কারখানাটি পরিবেশ দূষণ করছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আইন অনুযায়ী কারখানাটির বাইরের অংশের পানিতে বিভিন্ন অসংগতি পাওয়ায় ১১ অক্টোবর তাঁদেরকে ২৭ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

৩১ আগস্ট ডার্ড কম্পোজিটের আশপাশের জলাশয়ের পানি পরীক্ষা করে শ্রীপুর উপজেলা মৎস্য কার্যালয়। শ্রীপুর উপজেলা সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদিউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ওই পানিতে বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অ্যামোনিয়ার পরিমাণ বেড়ে গেলে মিথেন গ্যাস বেড়ে যায়। এতে অক্সিজেনের স্বল্পতা দেখা দেয়। ফলে মাছ ও জলজ প্রাণীগুলো সংকটে পড়ে। এ ছাড়া ওই পানিতে পিএইচ মাত্রা পাওয়া গেছে কোনো কোনো জায়গায় ১১, কোথাও ১২। অথচ স্বাভাবিক পানিতে এর মাত্রা থাকে ৭ থেকে সাড়ে ৭। এর ফলে পানিতে ক্ষারের পরিমাণ বেড়ে যায়। ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, এই পানিতে মাছ তো দূরের কথা, কোনো জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার কথা নয়।

দূষণের বিষয়টি নিয়ে ডার্ড কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেডের প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা আকাশ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে, ‘এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। কাইন্ডলি এ বিষয়ে জানতে হলে আমাদের হেড অফিসে যোগাযোগ করুন।’

পরে ডার্ড কম্পোজিট লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ের টেলিফোন নম্বরে কল দিলে কেউ ধরেননি। কারখানাটির প্রধান ফটকে গেলে সেখানে নিরাপত্তাকর্মীদের একজন জানান, ভেতরে প্রবেশ করতে হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে।

কিছুদিন আগে পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ওই এলাকার ভুক্তভোগী কৃষকেরা। তাঁদের ভাষ্য, কারখানাটি স্থাপনের পর থেকেই পরিবেশ আইনের তোয়াক্কা না করে বিষাক্ত রং মিশ্রিত পানি আশপাশে ফেলছে। এতে হাজারো একর জমিতে ফসল ফলানো যাচ্ছে না। কিছু জমিতে ধান চাষ করতে পারলেও সেখান থেকে স্বাভাবিকের তুলনায় অর্ধেক ধান উৎপাদন হচ্ছে। কারখানার দূষণে হাজারখানেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত।