হামের লক্ষণে ৭ মাস বয়সী মেয়ে সুমাইয়া আক্তারকে হারিয়ে তার জামাকাপড় হাতে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা-মা। গত বুধবার সকালে
হামের লক্ষণে ৭ মাস বয়সী মেয়ে সুমাইয়া আক্তারকে হারিয়ে তার জামাকাপড় হাতে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা-মা। গত বুধবার সকালে

ময়মনসিংহে হাম

চলতি মাসে ১৩ শিশুর মৃত্যু, সবারই ছিল নিউমোনিয়া, অধিকাংশই সময়মতো টিকা পায়নি

হামের উপসর্গ নিয়ে ৮ মে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাত মাস বয়সী মেয়ে সুমাইয়াকে ভর্তি করেন উজ্জ্বল মিয়া। দুই দিন পর ১১ মে ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা যায়। মৃত্যুসনদে লেখা হয়েছে, হামের উপসর্গের পাশাপাশি নিউমোনিয়া ও হৃদ্‌যন্ত্র অকার্যকর হয়ে শিশুটি মারা গেছে।

চলতি মাসের প্রথম ১৬ দিনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গে ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুসনদ অনুযায়ী, প্রতিটি শিশু হামের লক্ষণের পাশাপাশি কমন রোগ হিসেবে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল। এসব শিশুর বেশির ভাগই নিউমোনিয়ার টিকা নেয়নি। কেউ কেউ নিলেও সময়মতো নেয়নি।

শিশু সুমাইয়াও নিউমোনিয়ার টিকা সময়মতো নেয়নি। টিকার কার্ডের সরবরাহ না থাকায় মুক্তাগাছার কুমারগাতা ইউনিয়নের লিচুতলা গ্রামের এই শিশুকে টিকার কার্ড দেননি স্বাস্থ্যকর্মী। টিকাদানের রেজিস্টারের তথ্যমতে, শিশুটিকে যক্ষ্মা প্রতিরোধে বিসিজি টিকা সঠিক সময়ে দেওয়া হয়। নিউমোনিয়া প্রতিরোধে পিসিভি টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ নির্ধারিত সময়ে দিলেও তৃতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছে চার মাস পর। অথচ দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার ২৮ দিন পর তৃতীয় ডোজ দেওয়ার কথা। ওপিভি ও আইপিভি টিকার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।

গতকাল বুধবার সকালে শিশুটির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মুঠোফোনে মেয়ের ছবি দেখে কাঁদছেন বাবা। মেয়ের জামাকাপড় ও চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র দেখিয়ে কাঁদছেন মা তানজিলা আক্তার। তিনি বলেন, ‘টিকা দিতে গেলে জানাইছে, টিকা নাই। এভাবে দুই মাস ঘুরছি। সময়মতো টিকাটা দিলে আমার বাচ্চা নিউমোনিয়ায় মরত না। এটা জীবনেও কল্পনা করতে পারিনি, নিউমোনিয়ায় আমার বাচ্চা মারা যাবে।’

মুক্তাগাছা উপজেলার স্বাস্থ্য সহকারী নওরীদ শারমিন বলেন, ‘প্রথম সমস্যাটা হচ্ছে, আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণে ভ্যাকসিন সাপ্লাই পাই না। বাচ্চাটা টিকাগুলো পেয়েছে ঠিকই; কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে পায়নি। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে আমরা টিকার সমস্যা মোকাবিলা করছি। পর্যাপ্ত টিকা কার্ডও নেই।’ তিনি বলেন, সময়মতো টিকা না পাওয়ায় ইমিউনিটি কমে যাচ্ছে। দুই মাস ধরে বিসিজি ও হাম-রুবেলা ছাড়া কোনো টিকা তাঁদের কাছে নেই।

হামের লক্ষণে মৃত্যু বেড়ে ৩২

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ৯ মাস বয়সী আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে চলতি মাসে ১৩ জন এবং হামের প্রকোপ শুরুর পর ১৭ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ৩৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩২ জন। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৩৭২ জন। তাদের মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ হাজার ২১৭ জন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১২২ জন।

জামালপুরের ১০ মাস বয়সী শিশু সাদকে নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় মা সুমী আক্তার। যমজ সন্তানের প্রথমজনের হাম ভালো হওয়ার পর এখন দ্বিতীয় সন্তানকে নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ঠিকমতো টিকা দিতে পারিনি। কিছুটা দিলেও সঠিক সময়ে দিতে পারিনি। সঠিক সময়ে যদি টিকা দিতে পারতাম, তাহলেও এমন হতো না। হাসপাতালে আনার পর ডাক্তার বলছেন, আইসিইউ লাগবে। কিন্তু এখানে আইসিইউ না থাকায় অন্যভাবে চিকিৎসা দিচ্ছেন।’

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি বছর ময়মনসিংহ মেডিকেল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো থেকে ৪৭৬টি নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। এর মধ্যে ময়মনসিংহের বাসিন্দা ১২৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।

সবার কমন রোগ নিউমোনিয়া

চলতি মাসে মারা যাওয়া ১৩ শিশুর মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করেছে প্রথম আলো। এদের মধ্যে ৩ মাস বয়সী ১টি, সাড়ে ৪ মাস বয়সী ১টি, ৫ মাস বয়সী ১টি, ৭ মাস বয়সী ৪টি, ৯ মাস বয়সী ৩টি, ১০ মাস বয়সী ২টি ও ১৫ মাস বয়সী শিশু আছে ২টি। তাদের মধ্যে হামের লক্ষণ ও নিউমোনিয়া নিয়ে ৫ এবং হামের লক্ষণের পাশাপাশি নিউমোনিয়া ও হৃদ্‌যন্ত্র অকার্যকর হয়ে ৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে; অর্থাৎ সবার কমন রোগ ছিল নিউমোনিয়া। শিশুগুলো হাসপাতালে ভর্তির দু-এক দিনের মধ্যে মারা যাওয়ায় তাঁদের হাম পরীক্ষার ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায়নি।

১৩টি শিশুর মধ্যে ৯টি শিশুর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। এদের মধ্যে ৭টি শিশুর পরিবার জন্মের ৪২ দিন পর সময়মতো নিউমোনিয়ার টিকা না পাওয়ার কথা জানিয়েছে। অবশ্য নেত্রকোনা ও টাঙ্গাইলের দুটি শিশু সময়মতো টিকা পেয়েছে। অন্যান্য টিকার ক্ষেত্রেও প্রায়ই একই অবস্থা।

ময়মনসিংহের ফুলপুরের বালিয়া গ্রামের হৃদয় মিয়ার ৯ মাসের সন্তান রাফসানের মৃত্যু হয় ৩ মে। হৃদয় মিয়া বলেন, ‘আমার প্রথম সন্তান ছিল রাফসান। টিকা দেওয়ার জন্য বারবার ঘুরেও সময়মতো টিকা পাইনি। এক মাসের টিকা আরেক মাসে পেয়েছে।’

নিউমোনিয়ার টিকার মজুত শূন্য

ময়মনসিংহের ১৩টি উপজেলার মোট ৫১০টি টিকাদানকেন্দ্রে শিশুদের বিভিন্ন ধরনের টিকা দেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। জেলা ইপিআই স্টোরে ১১ মে সন্ধ্যায় নতুন কিছু টিকা এসে পৌঁছায়। তার আগে ২৯ জানুয়ারি দেড় মাসের টিকা পাওয়ার পর আশপাশের জেলা থেকে সংগ্রহ করে জরুরি প্রয়োজন মেটানো হচ্ছিল। ইপিআই স্টোরে ১২ মে বিকেল পর্যন্ত নিউমোনিয়া প্রতিরোধক পিসিভি টিকার কোনো মজুত ছিল না। জেলায় এক মাসে পিসিভি টিকার চাহিদা ৩৮ হাজার ৯০০ ডোজ। চলতি বছরের জানুয়ারির পর ৪ এপ্রিল ৩৬ হাজার ডোজ পিসিবি টিকা পাওয়া গিয়েছিল।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, শিশুর বয়স ৪২ দিন হলে নিউমোনিয়া প্রতিরোধে পিসিবি টিকার প্রথম ডোজ, তারপর ২৮ দিন পরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় ডোজ দেওয়া হয়। একইভাবে যক্ষ্মা প্রতিরোধে বিসিজি টিকা, ডিফথেরিয়া, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি প্রতিরোধে পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা, পোলিও প্রতিরোধে ওপিভি টিকা দেওয়া হয়। অন্যদিকে হাম ও রুবেলা ভাইরাস প্রতিরোধে এমআর টিকা ৯ মাস বয়সে প্রথম এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়।

ময়মনসিংহ নগরের বাসিন্দা নাজমুস সাকিব তাঁর চার মাস বয়সী মেয়েকে ওপিভি ও পিসিভি টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ১৮ ফেব্রুয়ারি। দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার কথা ছিল ৮ মার্চ। কিন্তু দুই মাস পেরিয়ে গেলে আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত টিকা মেলেনি। নাজমুস সাকিব বলেন, ‘সপ্তাহে তিন দিন করে টিকাকেন্দ্রে ঘুরেও কোনো সঠিক তথ্য পাচ্ছি না। একদিকে টিকার সংকট, অন্যদিকে দেশে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর আমাদের গভীর আতঙ্কে ফেলছে।’

জেলা ইপিআই স্টোরের ইনচার্জ মো. ফারুকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এক মাস ধরে পিসিভি টিকার কোনো মজুত নেই। ঢাকাতেও এই টিকা নেই। তারা আগে তিন মাসের টিকা একসঙ্গে পেলেও ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে সমস্যা শুরু হয়। ২০২৫ সালের শুরুতে তা প্রকট আকার ধারণ করে। চাহিদার তুলনায় তিন ভাগের এক ভাগ করে টিকা পাঠানো হতো। ঘন ঘন টিকা এলেও পরিমাণ ছিল কম।

কী বলছেন চিকিৎসকেরা

ময়মনসিংহ মেডিকেলের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন মোহা. গোলাম মাওলা প্রথম আলোকে বলেন, ‘হামে আক্রান্ত রোগীদের ইমিউনিটি কমে যায়। এতে যেকোনো রোগ হতে পারে। শিশুদের ইমিউনিটি লসের কারণে নিউমোনিয়া বেশি হচ্ছে। ইপিআই শিডিউলে পিসিবি ভ্যাকসিন ড্রপআউটের কারণে এমন হতে পারে। হামের টিকার চেয়ে নিউমোনিয়া টিকা বেশি ড্রপআউট হয়েছে, আমরা এমন তথ্য পাচ্ছি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রতিটা কেস ধরে ধরে স্টাডি করলে আমরা সঠিক কারণ খুঁজে পাব যে এটা আসলে শুধু টিকার কারণেই কি না। তবে আনুষঙ্গিক কারণও আছে।’

ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ফয়সল আহ্‌মেদ প্রথম আলোকে বলেন, হাম হলে নিউমোনিয়া খুব ঝুঁকিপূর্ণ। এ জন্য মৃত্যু হয়তো বাড়ছে। আগে ছয় মাস পরপর ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন হতো, দেড় বছর ধরে তা বন্ধ আছে। এটাও প্রভাব ফেলতে পারে। টিকার বিষয়ে বলেন,কিছু টিকা অনিয়মিত হয়েছে, সেটি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। টিকা পেতে দেরি হলেও পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের টিকা দেওয়া হয়। বর্তমান পরিস্থিতি বিগত সময়ে সৃষ্ট। সঠিক পরিকল্পনার অভাব ও অদূরদর্শিতার কারণে এমনটি হয়েছে।