
সাত মাস বয়সী ছেলে তালহা আহমদের জন্ম হয়েছিল বাবার বিদেশে থাকা অবস্থায়। কাতারে বসে প্রায় প্রতিদিন ভিডিও কলে ছেলেকে দেখতেন জিবাল আহমদ (৩৬)। ফোনের পর্দায় ছেলেকে ডাকতেন, আদর করতে চাইতেন। স্বজনদের বলতেন, দেশে ফিরে ছেলেকে কোলে নেবেন। কিন্তু সেই ইচ্ছা আর পূরণ হলো না। ছেলেকে কোলে নিয়ে আদর করার আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।
গতকাল রোববার সন্ধ্যায় সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার আমরপুর গ্রামে জিবাল আহমদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ পরিবার। টিনের লম্বা ঘরের দুটি কক্ষে থাকেন তাঁর মা, স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান। অন্য কক্ষে থাকে জিবালের দুই ভাইয়ের পরিবার। তাঁদের মধ্যে ছোট এক ভাই সৌদি আরবপ্রবাসী। অন্য ভাই দুই বছর আগে মারা গেছেন। পরিবারের সবার আলাদা সংসার। জিবালের বাড়ির চারপাশে কাদাপানি। বাঁশঝাড়ের নিচ দিয়ে কাদা মাড়িয়ে যেতে হয় বাড়িটিতে। ঘরের বারান্দায় স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। ঘরের ভেতরে ছিলেন নারী স্বজন ও প্রতিবেশীরা, আর পুরুষেরা ছিলেন বারান্দায়। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল স্ত্রী ও মায়ের আহাজারি। স্বজনেরাও সান্ত্বনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন।
রোববার সকালে কাতারের শাহানিয়া এলাকায় কর্মস্থলে যাওয়ার পথে একটি পিকআপ ভ্যান দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে ছয়জন নিহত হন। এর মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি সিলেটের কানাইঘাট উপজেলায়। নিহত ব্যক্তিদের একজন জিবাল আহমদ।
দীর্ঘদিন কাতারপ্রবাসী ছিলেন জিবাল। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয়নি। যা আয় করতেন, তা দিয়ে মা, স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ করতেন। প্রবাসের আয়ে বোনদের বিয়ে দিয়েছেন। পাকা ঘর নির্মাণের স্বপ্ন ছিল। কিছু টাকা জমিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই থেমে গেল জীবনের পথচলা।
ঘরের বারান্দায় স্বজন ও প্রতিবেশীদের পাশে প্রায় নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল জিবালের ১৪ বছর বয়সী ছেলে পারভেজ আহমদ। বাবার কথা জানতে চাইলে সে বলে, ‘শনিবার রাইতে আব্বার লগে মাত অইছিল। তাইন জিগাইছলা, কিতা করো?’ এরপর আর কথা বলতে পারেনি সে। একপর্যায়ে ঘরে গিয়ে সাত মাস বয়সী ছোট ভাই তালহাকে কোলে নিয়ে বাইরে আসে পারভেজ। পরিবারে তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয় পারভেজ। ছেলেদের মধ্যে বড় হিসেবে এখন সংসারের দায়িত্ব যেন তার কাঁধেই এসে পড়েছে।
স্বজনেরা বলেন, অভাবের কারণে কয়েক মাস আগে কানাইঘাটের গাছবাড়ি বাজারের একটি কাপড়ের দোকানে কাজ নিয়েছিল পারভেজ। মাসখানেক আগে সে কাজ ছেড়ে দেয়।
ঘরের ভেতরে বসে বিলাপ করছিলেন জিবালের স্ত্রী বুশরা বেগম। স্বজনদের উদ্দেশে তিনি বলছিলেন, ‘ছোট বাইচ্চাইন ঘরো, তারারে লইয়া কিলা-খিতা করতাম...আল্লাহ।’
জিবালের মা সিরাজুন্নেছা বলেন, ছেলে প্রায় দেড় বছর আগে ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। ছোট নাতিকে জন্মের পর ছেলে কোলে নিতে পারেননি, সে কথা বলে বিলাপ করছিলেন।
জিবালের ভগ্নিপতি আবদুল খালিক বলেন, রোববার দুপুরে কাতারপ্রবাসী এক স্বজন ফোন করে মৃত্যুর খবর দেন। পরিবারে উপার্জনক্ষম আর কেউ নেই। শিশু ও কিশোর সন্তানদের নিয়ে পরিবারটি এখন অসহায় অবস্থায় পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা প্রয়োজন।
ঋণের কিস্তি টাকা কীভাবে দেবে, চিন্তায় জসিমের পরিবার
একই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন কানাইঘাট উপজেলার আগতালুক গ্রামের জসিম উদ্দিন (৩০)। প্রায় সাত বছর ধরে কাতারে ছিলেন তিনি। তিন বছর আগে দেশে এসে নিজের সঞ্চয় ও ঋণের টাকায় আধা পাকা একটি ঘর করেন। ছুটি শেষে কাতারে ফিরে গিয়ে মাসে মাসে সেই ঋণের কিস্তি শোধ করছিলেন। কিন্তু ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই তাঁর মৃত্যু হলো।
রোববার রাতে জসিম উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পাশাপাশি দুটি বাড়ির একটিতে তাঁর পরিবার বসবাস করে। ঘরে আছেন বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান। স্বজনেরা এসে পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
ঘরের ভেতরে দেয়ালে ঝুলছিল জসিম উদ্দিনের বিয়ের ছবি। বিছানায় বসে সেই ছবির দিকে তাকিয়ে ছিলেন তাঁর শ্বশুর আলাউদ্দিন। সান্ত্বনা দিতে বাড়িতে ছিলেন ভগ্নিপতি মো. ফয়েজ, শ্যালক জসিম উদ্দিনসহ অন্য স্বজনেরা।
বারান্দায় বসে ছিল ১০ বছর বয়সী ছেলে তানিম আহমদ ও ৬ বছর বয়সী মেয়ে মেহেরিন বেগম। বাবার সঙ্গে তাদের স্মৃতি বলতে দেশে আসার সময়গুলো আর প্রতিদিনের মুঠোফোনে কথা বলা। বাবা যে আর কখনো ফিরবেন না, সেটি তারা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। স্বামীর মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে শোকে স্তব্ধ হয়ে আছেন জসিমের স্ত্রী শাহিন বেগম। স্বজনদের দেখলে শুধু ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছেন।
জসিমের বোন উমামা বেগম বলেন, ‘ভাই ঋণ নিয়ে ঘর করছিল। এখনো প্রায় দুই লাখ টাকার ঋণ বাকি। এখন সেই ঋণ কে শোধ করবে আর দুইটা ছোট বাচ্চা নিয়ে সংসার কেমনে চলবে, সেটাই চিন্তা। আমাদের চাওয়া, সরকার যেন দ্রুত মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করে এবং অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ায়।’
কাতারের ওই দুর্ঘটনায় নিহত অন্য তিনজন হলেন কানাইঘাট উপজেলার ঝিঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের মাঝতালুক গ্রামের মোস্তাক আহমদ (৩০), জুবায়ের আহমদ (৩০) এবং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের গাছবাড়ি নয়াগ্রামের কাদির আহমদ (২৪)।