
বিভাজনের ফলে ১১–দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. তাজুল ইসলাম নিজের অবস্থা ভালো হবে বলে দাবি করেন।
ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনে ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ছয়বার আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। এবার ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকলেও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ এমরান সালেহের ‘ঘাম ছুটাচ্ছেন’ দলটির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী সালমান ওমর। ভোটের মাঠ দখলে নিতে প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। গতকাল শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হালুয়াঘাটের কয়েকটি এলাকা ঘুরে অন্তত ২০ জন নারী-পুরুষ ভোটারের সঙ্গে কথা বলে এমন পরিস্থিতির কথা জানা যায়।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ, জামায়াতের জোট থেকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. তাজুল ইসলাম, বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন সালমান ওমর। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি থেকে আজহারুল ইসলাম, বাংলাদেশ লেবার পার্টি থেকে মুহাম্মদ রাশেদুল হক, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী) থেকে মো. আ. রাজ্জাক ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মো. জিল্লুর রহমান প্রার্থী হয়েছেন। ভোটের মাঠে সাত প্রার্থী থাকলেও বেশি আলোচনায় বিএনপির প্রার্থী এমরান সালেহ ও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী সালমান ওমরকে ঘিরে।
স্থানীর মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভোটের মাঠে ৭ প্রার্থী থাকলেও প্রচারণায় এগিয়ে বিএনপি ও বিদ্রোহী প্রার্থী। এই দুজন প্রার্থীকে ঘিরেই ভোটারদের আগ্রহও বেশ। গত ১৬ জানুয়ারি ধোবাউড়া উপজেলার এরশাদ বাজার এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনী অফিস উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে মো. নজরুল ইসলাম নামের এক কর্মীকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ ওঠে ধানের শীষের প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার পর অনেকটা চাপে পড়েন ধানের শীষের প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহ। এরপর নির্বাচনী মাঠ নিজের দখলে নিতে দিনরাত এলাকায় ঘাম ছুটাচ্ছেন বিএনপির এ প্রার্থী। উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে বহিষ্কার করলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর পুরো ভোটের মাঠ নিজের দখলে নেওয়ার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে কাজ করছেন। গণসংযোগ করে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে চাইছেন ভোট।
গোবরাকূড়া স্থলবন্দর দিয়ে শুধু কয়লা আমদানি হয়, তা–ও বছরের বেশির ভাগ সময় বন্দরে কোনো কাজ থাকে না। এই বন্দরে কাজ করা কয়লাশ্রমিক ইদ্রিস আলী বলেন, ‘আমরা এমন প্রার্থীকে ভোট দিতে চাই, যাতে এই বন্দর সব সময় চালু থাকে।’
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা এমপি ছিলেন, এখন আওয়ামী লীগ নির্বাচনের মাঠে না থাকলেও ভোটার ও সমর্থকদের নিজেদের কাছে ভেড়ানোর চেষ্টা করছেন বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী দুজনেই। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও আওয়ামী লীগের ভোট যেদিকে বেশি যাবে, সেই প্রার্থীই বিজয়ী হবেন।
হালুয়াঘাট উপজেলা পরিষদ এলাকায় কথা হয় ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘যিনি এলাকার উন্নয়ন করবেন, ব্যবসায়ীদের দিকে তাকাবেন, দল-মতনির্বিশেষ যেন ব্যবসা করা যায়, এমন প্রার্থীকে ভোট দেব।’
কড়ইতলী স্থলবন্দর এলাকায় কথা হয় আবদুল জব্বারের (৭৭) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এলাকায় শান্তি থাকুক, উন্নয়ন হোক, এমনটা আমরা চাই। যাঁর দ্বারা মানুষের ও এলাকার উন্নয়ন হবে, এমন প্রার্থীকে ভোট দেব।’
আসনটির দুটি উপজেলাতেই আওয়ামী লীগের অনেক কর্মী-সমর্থকদের বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে ভেড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন স্থানীয় নেতা–কর্মীরা। তবে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে আছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগও।
বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী থাকায় ধানের শীষে প্রভাব পড়বে না জানিয়ে দলটির প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহ বলেন, তাঁরা (স্বতন্ত্র প্রার্থী) অবাধে গ্রামে গ্রামে প্রচুর টাকা ছড়াচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘দলর সঙ্গে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছেন নির্বাচনী মাঠে। কারও চরিত্র হনন করা ও মিথ্যাচারে জর্জরিত করা উচিত নয়। গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবহেলিত জনপদের উন্নয়নের কথা বলছি আমি, আলোকিত জনপদ গড়তে চাই।’
স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর বলেন, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকেরা প্রপাগান্ডা ছড়িয়েছেন, ভোটের দিন কেন্দ্র দখল করে নেবেন। প্রশাসন পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকবে বলে জানিয়েছে। ভোটারদের মধ্যে একধরনের শঙ্কা কাজ করছে ভোটকেন্দ্রে যাওয়াতে কোনো ধরনের সহিংসতা হতে পারে কি না। মানুষের নিরাপত্তা যেন প্রশাসন নিশ্চিত করে, ভোটের দিন যেন কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়। আমরা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই। জনগণ যাঁকে ভোট দেবেন, তিনিই নির্বাচিত হবেন। আমরা চাচ্ছি, এলাকার জনগণ যেন নিরাপদে থাকেন। একসময় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও হিন্দু ভোটাররা আওয়ামী লীগকে ভোট দিলেও এবার ব্যক্তি দেখে ভোট দেবেন। প্রার্থীর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে মানুষ ভোট দেবেন।’
ভোটের মাঠে সাতজন প্রার্থীই এলাকার উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিএনপি ও বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় ধানের শীষের ভোট দুই ভাগ হবে উল্লেখ করে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. তাজুল ইসলাম নিজের অবস্থা ভালো হবে বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘মানুষে কাছ থেকে ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছি। মানুষকে বলছি, আমরা যদি নির্বাচিত হতে পারি, সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত করব। বাংলাদেশের দারিদ্র্যসীমায় দ্বিতীয় অবস্থানে আছে হালুয়াঘাট উপজেলা। আমরা সে জায়গা থেকে কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করব।’
মো. তাজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘গত শুক্রবার হিন্দু কমিউনিটির সঙ্গে আমরা বসেছিলাম, তারা আমাদের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে আজ দেখা করব। কওমিপন্থীদের অনেকে যাঁরা বিএনপিতে ছিলেন, তাঁরা বিএনপিতেও ভোট দেবেন না, আমাকে দেবেন।’