ফুলে ফুলে ছেয়েছে গাছ। আর এর ডালেই মৌচাক বেঁধেছে মৌমাছির দল। গতকাল বৃহস্পতিবার সুন্দরবনের শাকবাড়িয়া নদীতীরবর্তী বনাঞ্চল থেকে তোলা
ফুলে ফুলে ছেয়েছে গাছ। আর এর ডালেই মৌচাক বেঁধেছে মৌমাছির দল। গতকাল বৃহস্পতিবার সুন্দরবনের শাকবাড়িয়া নদীতীরবর্তী বনাঞ্চল থেকে তোলা

ফুলে ফুলে সেজেছে সুন্দরবন, মধু আহরণের অপেক্ষায় মৌয়ালেরা

বসন্তের এই সময়ে সুন্দরবনে ফুটেছে খলিশা, গরান, পশুর আর হারগোজাসহ রংবেরঙের ফুল। এগুলো ঘিরে মৌমাছির গুঞ্জনে মুখর বনাঞ্চল। এমন প্রাকৃতিক আয়োজনের মধ্যে মধু আহরণের মৌসুম শুরুর অপেক্ষায় আছেন মৌয়ালেরা।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হবে, যা চলবে টানা দুই মাস। এ বছর সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় এক হাজার ৮০০ কুইন্টাল মধু এবং ৯০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর দুই হাজার ৮৫৩ জন মৌয়াল বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে এক হাজার ৪২৯ কুইন্টাল মধু ও ৪২৯ কুইন্টাল মোম সংগ্রহ করেছিলেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার খুলনার কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীপথ ধরে সুন্দরবনে ঢুকলেই চোখে পড়ে খলিশা, গরান, পশুরগাছের ফুলে। এগুলোর রং-রূপে বনভূমি যেন সেজে উঠেছে। কেওড়ার ডালে কুঁড়ির মেলা, কাঁটায় ঘেরা হারগোজাও ফুলে ভরে উঠেছে। কচি পাতার সবুজ আর শ্বাসমূলের বিস্তারে বনে যেন নতুন প্রাণ। সেই রূপমুগ্ধ পরিবেশে মৌমাছিরা উড়ে বেড়াচ্ছে ফুলে ফুলে, সংগ্রহ করছে মধু।

সুন্দরবনের আন্ধারমানিক টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আল–আমিন বললেন, এখানে মূলত এপিস ডরসাটা, এপিস সেরানা ও এপিস ফ্লোরিয়া প্রজাতির মৌমাছি দেখা যায়। এর মধ্যে এপিস ডরসাটা অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মৌসুমের শুরুতে এসব মৌমাছি অনেক সময় নিচু ডালেও চাক বাঁধে। আগাম মধু চুরি ঠেকাতে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং নদীপথে নৌযান তল্লাশি করা হচ্ছে।

এ সময়ে মৌমাছিরা উড়ে বেড়াচ্ছে ফুলে ফুলে, সংগ্রহ করছে মধু

মৌয়ালদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মৌসুমের শুরুতে খলিশা ফুলে মধু আসে। এই মধু স্বচ্ছ, অনেকটা নারকেল তেলের মতো, স্বাদে ঘন ও মিষ্টি, ঝাঁজবিহীন। তবে খলিশাগাছ তুলনামূলক কম থাকায় এ মধুর পরিমাণও তুলনামূলক কম। এরপর ধাপে ধাপে গরান, কাঁকড়া, হারগোজা এবং শেষদিকে কেওড়া ও গেওয়া ফুলের মধু পাওয়া যায়। সময়মতো বৃষ্টি না হলে ফুল দ্রুত ঝরে পড়ে, ফলে মধুর উৎপাদনও কমে যায়।

সুন্দরবন–সংলগ্ন শাকবাড়িয়া ও কপোতাক্ষ নদ পারের গ্রামগুলো ঘুরে দেখা যায়, মৌয়ালদের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে। নদীর তীরে সারি করে বাঁধা নৌকা, কোথাও চলছে মেরামতের কাজ, কোথাও বা প্রয়োজনীয় রসদ জোগাড়ের তৎপরতা।

শাকবাড়িয়া পারে কথা হয় মৌয়াল জাহিদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বনের গাছে ফুল ফুটি গেছে। এক তারিখি আমরা দল বান্দি মধু কাটতি যাব। এক নৌকায় পাঁচজন থাকি, খরচও কম না—একেকজনের প্রায় ২০ হাজার টাকার বেশি লাগে। প্রথম দিকি মধু ইট্টু কম হয়। গত বছর ৩০ হাজার টাকা মণ দরে মধু বিক্রি কুরিলাম। এখন সুন্দরবনে ডাকাতির উপদ্রব বাইড়ে গেছে, কী হবে বুঝতি পারতিছিনে।’

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হাছানুর রহমান বলেন, এ বছর উদ্বোধনী আয়োজনকে আরও বড় পরিসরে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একজন মৌয়াল ১৪ দিনের জন্য সর্বোচ্চ ৫০ কেজি মধু ও ১৫ কেজি মোম সংগ্রহ করতে পারবেন এবং নির্ধারিত সময়ের বেশি বনে অবস্থানের অনুমতি নেই।