
খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবনঘেঁষা টেপাখালী গ্রাম। এই গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে সুন্দরবনের যেন আত্মার সম্পর্ক। কারও জীবিকা মাছ ধরা, কেউ কাঁকড়া শিকার করেন। আবার মৌসুম এলে কেউ কেউ মধু সংগ্রহে যান। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে শাকবাড়িয়া নদী। নদীর ওপারেই গহিন অরণ্য।
আজ রোববার সকালে শাকবাড়িয়া নদীর বেড়িবাঁধ ধরে হাঁটতে হাঁটতে নজরে আসে নদীর চরে সারিবদ্ধভাবে লাগানো ছোট ছোট চারাগাছ। লোনাপানির এ চরে সাধারণত সুন্দরবনের গাছ ছাড়া অন্য কোনো গাছ জন্মায় না। তবে এভাবে পরিকল্পিতভাবে সুন্দরবনে চারা লাগানোর দৃশ্য আগে কখনো দেখা যায়নি।
কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখা গেল, চরের একটি অংশ বাঁশ ও জাল দিয়ে ঘেরা। ভেতরে পলিব্যাগে সারি সারি সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছের চারা। দেখতে যেন ছোট্ট একটি নার্সারি। নদীতে জোয়ার ওঠা শুরু করেছে। চারাগুলো পানিতে ডুবে যাওয়ার আগে ছবি তুলতে গিয়ে নজর কাড়েন এক নারী, যিনি জালের ঘেরের ভেতরে ঢুকে চারাগাছের পরিচর্যা করছেন। চারা কি আপনি লাগিয়েছেন—জিজ্ঞাসা করতেই হেসে বলেন, ‘হয়, আমরা কয়জন মহিলা মিলে লাগাইছি।’
এই নারীর নাম বাসন্তী মুন্ডা। তিনি জানান, চরের এখানে কেওড়া, খলিশা, কাঁকড়া ও বাইন—চার ধরনের সুন্দরবনের গাছের চারা তৈরি হয়। গোলপাতার চারা তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল, তবে বীজ না পাওয়ায় সম্ভব হয়নি। তবে কয়েক দিনের মধ্যে গোল ফল সংগ্রহ করে সেই চেষ্টাও করা হবে।
বাসন্তীর সঙ্গে আরও কয়েকজন নারী যুক্ত আছেন। তাঁদের মধ্যে স্থানীয় মনিকা, রিতা ও কমলা মণ্ডল অন্যতম। প্রথম দিকে অনেকেই সন্দেহ করেছিলেন, এভাবে চারা হবে কি না? তবে বাসন্তীর বিশ্বাস ছিল, হবে। তাঁর ভাষায়, ‘বাড়ির পাশে নদীর চরে পইড়ে থাকা বীজ থেইকে তো চারা গজায় দেখি। সেই ভরসাতেই চেষ্টা করিছি।’
চারা তৈরির প্রক্রিয়া জানালেন বাসন্তী। প্রথমে বাঁশ দিয়ে চারপাশ ঘিরে জাল লাগানো হয়, যাতে ছাগল বা অন্য পশু ঢুকতে না পারে। এরপর ছোট ছোট জায়গা ভাগ করে প্রতিটি লাইনে ২০ থেকে ২৫টি পলিব্যাগ সাজিয়ে তাতে চরের মাটি ভরা হয়। তারপর নদীতে ভেসে আসা সুন্দরবনের ফল সংগ্রহ করে পলিব্যাগে বসানো হয়। সেখান থেকে বের হয়েছে নতুন চারা।
বাসন্তী জানান, একদিন সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরতে যাওয়ার সময় একটি এনজিওর কর্মীরা তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা প্রস্তাব দেন, গ্রামের কয়েকজন নারী মিলে যদি নদীর চরে সুন্দরবনের গাছের চারা উৎপাদন করেন, তাহলে সংস্থাটি প্রয়োজনীয় উপকরণ দেবে এবং চারা বড় হলে প্রতিটি চারা ১০ টাকা দাম দিয়ে কিনে নেবে।
বাসন্তীর কাছ থেকে নাম জেনে কথা হয় বেসরকারি সংস্থা সিএনআরএস-এর কয়রা উপজেলা কর্মকর্তা মো. নুরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি জানান, নদীর চরে বনায়নের একটি প্রকল্পের জন্য বিপুলসংখ্যক চারা প্রয়োজন। কিন্তু বাণিজ্যিক নার্সারিগুলো এসব ম্যানগ্রোভ গাছের চারা উৎপাদন করে না। তাই স্থানীয় নারীদের সম্পৃক্ত করে সুন্দরবনের ভেসে আসা ফল থেকে চারা উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নুরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা ফল স্থানীয় লোকজন শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন। আবার অনেক সময় চারা গবাদিপশু খেয়ে ফেলে। তাই নদীর চর ও বেড়িবাঁধের পাশে ম্যানগ্রোভ বনায়ন সংরক্ষণ জরুরি। এ লক্ষ্যে কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীতীরবর্তী প্রায় ৭৪ হেক্টর জমিতে বনায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বাসন্তীর সংসার সচ্ছল নয়। স্বামী দীপঙ্কর মুন্ডা কাজের খোঁজে ইটভাটায় গেছেন এলাকার বাইরে। তিন বছরের মেয়ে তনুশ্রীকে নিয়ে নদীর চরের পাশে একটি ছোট্ট ঝুপড়িতে থাকেন। নদীর চরের নার্সারি পরিচর্যার পাশাপাশি কখনো সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরেন, কখনো দিনমজুরি করেন।
তবে নারী হওয়ার কারণে মজুরিতেও বৈষম্য আছে। বাসন্তী প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুরুষেরা এক বেলা কাজ করলি ৪০০ টাকা পায়। আমরা একই কাজ করে পাই ৩০০ টাকা। যেদিন কাজ না পাই, সেদিন সুন্দরবনে যাই কাঁকড়া ধরতি। আগে বাঘের ভয় লাগত, এখন ভয় করে ডাকাইতের। বনে ডাকাইত না থাকলি শান্তিতে থাকতি পারতাম।’
মায়ের সঙ্গে কথা বলতে দেখে বাসন্তীর ছোট্ট মেয়ে তনুশ্রী এগিয়ে আসে। ছবি তোলার জন্য বায়না ধরে। মুঠোফোনে কয়েকটি ছবি তুলে দেখাতেই আনন্দে ভরে ওঠে মা-মেয়ের মুখ।
শাকবাড়িয়া নদীর জোয়ারের পানি ধীরে ধীরে চারাগুলোর গোড়ায় এসে লাগছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেগুলো পানির নিচে ডুবে যাবে। তবে বাসন্তী মুন্ডা ও তাঁর সঙ্গীদের আশা ডুবে যাবে না। তাঁদের হাতে গড়ে ওঠা ছোট্ট চারাগুলো একদিন বড় হয়ে উঠবে।