
সকাল তখন ঠিক ১০টা। চট্টগ্রাম নগরের সাগরিকা গরুর হাটে ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। কোথাও গরুর ডাক। কোথাও দাম হাঁকার শব্দ। কেউ গরুর দাঁত দেখছেন, কেউ পিঠে হাত বুলিয়ে ওজন আন্দাজ করছেন। এর মধ্যেই সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ষাটোর্ধ্ব মোহাম্মদ খলিল। পাশে দুটি গরু। দুটিই তাঁর নিজের হাতে পালন করা।
খলিলের বাড়ি সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নে। আজ মঙ্গলবার ভোরে ছেলে মো. তাসিবুল ইসলামকে নিয়ে গরু দুটি হাটে এনেছেন। সাগরিকা হাটের মূল ফটকের বিপরীত পাশে রাস্তার ওপরই জায়গা নিয়েছেন তাঁরা।
দুটি গরুর মধ্যে কালো আর বাদামি রঙের একটি গরু ছিল বেশ নজরকাড়া। মাঝারি আকার। শরীরে বাড়তি চর্বি নেই। পরিচ্ছন্ন। চকচকে লোম। খলিল বলছিলেন, গরুকে কখনো কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করার চেষ্টা করেননি। নিয়ম করে ঘাস, খড় আর প্রাকৃতিক খাবারই খাইয়েছেন।
গত বছর সাতক্ষীরা থেকে এক ট্রাক গরু আনতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ভাড়া লাগত। এবার সেই ভাড়া ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। গরুর খাবারের দামও অনেক বেড়েছে।আবদুল আজিজ, বিক্রেতা।
সকাল থেকে অনেকেই এসে গরু দেখে গেছেন। কেউ দাম শুনে চলে গেছেন। কেউ আবার ঘুরে এসে দ্বিতীয়বারও দেখেছেন। তবে দরদামে হচ্ছিল না। এরপর এলেন তিনজন ক্রেতা। কামাল হোসেন, মো. আবুল কাসেম ও আমির হামজা। তিনজনই প্রতিবেশী। থাকেন নগরের টাইগারপাস এলাকায়। এবার একসঙ্গে কোরবানির জন্য গরু কিনছেন তাঁরা।
খলিলের গরুটি প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে যায় কামাল হোসেনের। কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ দেখলেন। তারপর সরাসরি প্রশ্ন, ‘কত দাম?’ খলিল স্থানীয় ভাষায় জবাব দিলেন, ‘আমি ৮০ হাজার চাচ্ছি।’ সেখান থেকেই শুরু দরাদরি। কামাল হোসেন প্রথমে বললেন, ‘৮০ হাজার বেশি হয়ে যাচ্ছে। ৬৫ রাখেন, মামা।’ খলিল এককথায় ‘না’ করে দিলেন। ক্রেতা আবার বললেন, ‘আচ্ছা, ৭০ রাখেন।’ এবারও তেমন আগ্রহ দেখালেন না বিক্রেতা। শান্ত গলায় বললেন, ‘৭৬ হাজারের নিচে হবে না।’ এরপর একের পর এক দাম উঠতে থাকে। ৭২ হাজার। ৭৩ হাজার। তারপর ৭৪ হাজার।
কিন্তু খলিল অনড়। ততক্ষণে আশপাশে ভিড় জমে গেছে। কেউ ক্রেতার পক্ষে কথা বলছেন। কেউ বিক্রেতার। পাশের এক গরু ব্যবসায়ীও এগিয়ে এলেন। তিনি দুই পক্ষকে বুঝিয়ে বললেন, ‘সব বাদ দেন। ৭৫ হাজার টাকা দেন। গরু নিয়ে যান।’
রাজি হলেন কামাল হোসেন। পকেট থেকে টাকা বের করে গুনতে শুরু করলেন। চারপাশে তখন কৌতূহলী মানুষের ভিড়। টাকা গোনা শেষ। খলিলের হাতেও তুলে দেওয়া হলো। কিন্তু ঠিক তখনই বেঁকে বসলেন এই কৃষক। তিনি বললেন, ‘না, আর এক হাজার টাকা দিতে হবে। এর কমে গরু ছাড়ব না।’ আবার শুরু হলো বোঝাপড়া। কেউ বলছেন, ‘এতক্ষণ তো কথা হলো।’ কেউ বলছেন, ‘মামা, ছাড়েন।’ শেষ পর্যন্ত আশপাশের মানুষের অনুরোধে আরও ৫০০ টাকা বাড়িয়ে দেন কামাল হোসেন। তখনই গরুর রশি তুলে দেন মোহাম্মদ খলিল। দুই ঘণ্টা দরাদরির পর গরুটি বিক্রি হয় ৭৫ হাজার ৫০০ টাকায়।
গরু বিক্রির পর খানিকটা চুপ হয়ে যান খলিল। এক ফাঁকে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক যত্নে গরু দুইটা বড় করেছি। আমি কোনো ব্যাপারী না। কৃষিকাজ করি, গরু পালি। তাই মায়া লাগে।’
সকালে একপশলা বৃষ্টি হয়েছে। এর পর থেকেই সাগরিকা গরুর হাট কাদা আর পানিতে একাকার। তবু থেমে নেই হাটের ছন্দ। ছাতা মাথায়, প্যান্ট গুটিয়ে, কাদা মাড়িয়ে ক্রেতারা ঘুরছেন এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কেউ গরুর দাঁত দেখছেন। কেউ দাম শুনে ফিরে যাচ্ছেন।
হাটের ভেতরে একটি চেয়ারে বসে ছিলেন বিক্রেতা আবদুল আজিজ। সামনে সারি করে বাঁধা গরু। কোনোটি লাল, কোনোটি কালো, আবার কোনোটি বাদামি। মাঝেমধ্যে ক্রেতারা এসে গরু দেখছেন, দাম জিজ্ঞাসা করছেন, আবার চলে যাচ্ছেন।
আবদুল আজিজ বহু বছর ধরে কোরবানির পশুর ব্যবসা করেন। রাজশাহী, সাতক্ষীরা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে গরু সংগ্রহ করেন তিনি। গ্রামের কৃষক আর ছোট ছোট হাট থেকে পশু কিনে এনে সাগরিকায় বিক্রি করেন। এবার হাটে তুলেছেন প্রায় ৫০০ গরু। তবে বিক্রি এখনো খুব জমেনি। দুপুর পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে প্রায় ৯০টি।
চেয়ারেই বসে হিসাব কষছিলেন আবদুল আজিজ। কথা বলতে বলতেই জানালেন, এবার গরুর দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। কারণও ব্যাখ্যা করলেন তিনি। বললেন, ‘গত বছর সাতক্ষীরা থেকে এক ট্রাক গরু আনতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ভাড়া লাগত। এবার সেই ভাড়া ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। গরুর খাবারের দামও অনেক বেড়েছে।’ কথা বলতে বলতে পাশের একটি লাল রঙের দেশি গরুর দিকে ইশারা করলেন তিনি। বললেন, ‘এই রঙের গরুর চাহিদা সব সময় বেশি। মানুষ দেশি গরুই বেশি খুঁজছে।’
আবদুল আজিজের কাছে ছোট-বড় নানা আকারের গরু রয়েছে। কোনোটি ৮০ হাজার টাকা। আবার কোনোটির দাম তিন লাখ টাকাও ছাড়িয়েছে। তবে দাম বেশি হলেও ক্রেতাদের আগ্রহ কম নয়। বিশেষ করে মাঝারি আকারের দেশি গরুর সামনে ভিড় বেশি দেখা গেছে।
কাপড়ের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আজম চৌধুরী একটি গরু কিনে ফিরছিলেন। তিনি বলেন, ‘অনেক হাট ঘুরে শেষ পর্যন্ত গরুটি পছন্দ হয়েছে। সাদা রঙের গরু আমার পরিবারের পছন্দ। গরুটা শান্ত। দাম একটু বেশি গেছে। তারপরও পছন্দ হওয়ায় কিনে ফেলেছি। এবার হাটে ভালো মানের গরুর দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি মনে হয়েছে।’
হাটের প্রবেশমুখেই কালচে রঙের মাঝারি আকারের একটি গরু নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন জলিল ব্যাপারী। গরুটির গলায় বাঁধা লাল রশি। মাঝেমধ্যে মাথা ঝাঁকাচ্ছিল। আর সেটিকে ঘিরে ভিড় করছিলেন ক্রেতারা।
সকাল থেকে অনেকেই এসে গরুটি দেখে গেছেন। কেউ দাঁত দেখেছেন। কেউ শরীরে হাত বুলিয়ে ওজন আন্দাজ করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারও সঙ্গেই দামে বনিবনা হয়নি। এর মধ্যেই পরিবার নিয়ে হাটে আসেন হালিশহরের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইমুম। সঙ্গে স্ত্রী ও ছোট সন্তান। কিছুক্ষণ গরুটি ঘুরেফিরে দেখলেন তাঁরা। এরপর শুরু হলো দরাদরি।
জলিল ব্যাপারী প্রথমে দাম হাঁকালেন ৮০ হাজার টাকা। ক্রেতাপক্ষ অনেক দর-কষাকষির পর ৬৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠে। কিন্তু তাতেও রাজি হননি জলিল ব্যাপারী। একপর্যায়ে তিনি গরুর রশি শক্ত করে ধরে বললেন, ‘এই দামে গরু ছাড়লে আমারই লোকসান হবে।’ শেষ পর্যন্ত গরুটি না নিয়েই চলে যান মোহাম্মদ সাইমুম। আর জলিল ব্যাপারী তখনো হাটের মুখে দাঁড়িয়ে নতুন ক্রেতার অপেক্ষা করছিলেন।
চট্টগ্রামে গত দুই বছরে কোরবানির পশুর সংখ্যায় ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২৪ সালে জেলায় কোরবানি হয়েছিল ৮ লাখ ১৮ হাজার ৪৬৮টি পশু। তবে ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৮১ হাজার ৮৩১টিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কোরবানি কমে যায় ৩৬ হাজার ৬৩৭টি পশু।
তবে এবার আবার চাহিদা বাড়ার আশা করছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। দপ্তরের হিসাবে চলতি ঈদে চট্টগ্রাম জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৭১টি। সে হিসাবে গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ৩৭ হাজার বেশি পশু কোরবানি হতে পারে। নগরে এবার তিনটি স্থায়ী ও সাতটি অস্থায়ী হাট বসেছে।