শাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তে ভোটারদের সমর্থন চাইতে প্রচারণায় ব্যস্ত প্রার্থীদের কর্মী ও সমর্থকেরা। রোববার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বর এলাকায়
শাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তে ভোটারদের সমর্থন চাইতে প্রচারণায় ব্যস্ত প্রার্থীদের কর্মী ও সমর্থকেরা। রোববার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বর এলাকায়

শাকসু নির্বাচন

ব্যবধান গড়ে দেবেন ৩৬ শতাংশ নারী ভোটার

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচনে এবার ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন ৯ হাজার ৪৭ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ৩ হাজার ২১০ নারী ভোটার। অর্থাৎ মোট ভোটারের ৩৬ শতাংশই নারী। এই বিপুলসংখ্যক ভোটার ঘিরে নানা সমীকরণ চলছে। শাকসুর নেতৃত্বে ভবিষ্যতে কারা আসছেন, নারীদের ভোটই তা গড়ে দেবে।

গত ১১ ডিসেম্বর থেকে শাকসু নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হয়। তবে শীতের ছুটির পর ৪ জানুয়ারি থেকে প্রচারণায় উৎসবের আমেজ পায়। ক্যাম্পাসে সব টংদোকান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক, শিক্ষা ভবন, শ্রেণিকক্ষ, আবাসিক হল ও বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন আশপাশের এলাকার মেসে ও স্থানীয় শিক্ষার্থীদের বাসায় প্রার্থীরা প্রচারণা চালান। প্রচারপত্র ও ইশতেহার নিয়ে তাঁরা ঘুরে বেড়িয়েছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। ভোট ও দোয়া চেয়েছেন।

ভোটের প্রচারের নির্ধারিত সময় শেষ হলেও আজ রোববার রাত ৯টা পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করে নির্বাচন কমিশন। শেষ সময়ে আরও ১২ ঘণ্টা প্রচারের সময় পান প্রার্থীরা। দীর্ঘ ২৮ বছর পর আগামীকাল মঙ্গলবার শাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ভোট গ্রহণ শুরু হবে সকাল ৯টায়। শেষ হবে বিকেল ৪টায়।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হল আছে তিনটি। আসন আছে ১ হাজার ৫৬৫ জনের। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে দুটি সাব-হল (বাসা ভাড়া) করে ২৭৫ নারী শিক্ষার্থী থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট নারী শিক্ষার্থীর তুলনায় প্রায় ৫১ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী আবাসিক হলের বাইরে থাকেন। ফলে ছাত্রীদের অর্ধেকের মতো ভোটারই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে ভোট দিতে আসবেন।

ছাত্রীদের জন্য প্রার্থীদের যত প্রতিশ্রুতি

শাকসু নির্বাচনে এবার তিনটি প্যানেল গঠিত হয়েছে। এসব প্যানেলের ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ছাত্রীদের উদ্দেশে দিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন প্রতিশ্রুতি। নিরাপদ ক্যাম্পাস এবং যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ, পোশাক ও চলাফেরার স্বাধীনতা, বিশেষায়িত আইনজীবীর সহায়তা ও হেল্প ডেস্ক স্থাপন, স্যানিটারি প্যাড ভেন্ডিং মেশিনের যথাযথ ব্যবস্থাসহ নানা প্রতিশ্রুতি ছিল প্রচারণার মূল বিষয়।

ছাত্রশিবির ও স্বতন্ত্র প্যানেলের প্রার্থীরা নারী ভোটারদের গুরুত্ব বুঝে ইশতেহারে বিশেষ দফা যুক্ত করেছেন। তবে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে কোনো ইশতেহারের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তাঁদের প্যানেলে প্রার্থীরা ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্যানেল ‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ প্যানেল থেকে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ রাখার নিশ্চয়তা দিচ্ছেন। অন্যদিকে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’ প্যানেল নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কমনরুম ও স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিনের ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ছাত্রীদের প্রত্যাশা: নিরাপত্তা ও আবাসনসংকট নিরসন

বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত পাঁচজন ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা জানান, প্রার্থীরা অনেকে যথোপযুক্ত প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁরা বাস্তবায়ন করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ ও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফাতেমা ইসলাম হুমায়রা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটি হোস্টেলে আমি থাকি। নিয়মিত যাতায়াতে পরিবহনসংকট আছে। পাশাপাশি আবাসনসংকটের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থাকতে হয়। প্রার্থীদের ভালো ভালো প্রতিশ্রুতি দেখছি, আশাবাদী হচ্ছি।’

সমাজকর্ম বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের জেরিন তাসনিম বলেন, ‘চলাফেরায় নিরাপত্তাসংকটের বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রার্থীরা ইশতেহার দিয়েছেন। ক্যাম্পাসে প্রায়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে ছাত্রী হলের দিকে। এ বিষয়ে মনোযোগ দিয়ে অনেকের প্রচারণা দেখছি। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসনসংকটের দিকে প্রার্থীরা জোর দেবেন বলে আমরা আশাবাদী।’

প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৬৬৬ শিক্ষার্থী ভর্তি হন। এর মধ্যে গড়ে ৩৫ শতাংশ ছাত্রী। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৮টি বিভাগে ৯ হাজারের মতো শিক্ষার্থী আছেন। এর মধ্যে ৩ হাজার ২১০ জন ছাত্রী। শিক্ষার্থীরা বলছেন, ৩৬ শতাংশ নারী ভোটার হওয়ায় প্রার্থী নির্বাচনে তাঁদের বড় ভূমিকা থাকবে। কারণ, তাঁদের ভোটে যেকোনো সময় সমীকরণ পাল্টে যেতে পারে। তাই অধিকার নিয়ে সচেতন ও বাস্তবায়ন করতে অগ্রগামী ভূমিকা রাখতে পারবে, এমন প্রার্থীকেই তাঁরা ভোট দেবেন।

পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী মহসিনা আক্তার বলেন, শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর একমাত্র উন্মুক্তভাবে তুলে ধরা যাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে। সত্যিকার অর্থেই বাছাই করা যাবে প্রতিনিধি। তাই ভোট নিয়ে আগ্রহ আছে।

নারী প্রার্থী মাত্র ৭

এবারের শাকসু নির্বাচনে নারী প্রার্থী খুবই কম। কারণ হিসেবে প্রার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ট্যাগিং ও বুলিংকে কারণ হিসেবে দেখছেন। শাকসুতে তিনটি প্যানেল নির্বাচনে লড়ছে। সব মিলিয়ে মোট প্রার্থী ৯৭ জন। শীর্ষ পদে কোনো নারী প্রার্থী নেই।

প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নারী শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহ, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব ও সাংগঠনিক দুর্বলতা নারী প্রার্থী না থাকার মূল কারণ। ছাত্রীরা মনে করেন, শীর্ষ পদে প্রার্থিতায় আগ্রহ থাকলেও নানা বাধায় সেটা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে প্রার্থী বাছাইয়ে নারীদের উৎসাহ দিতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে হবে।

প্যানেলগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ছাত্রদল-সমর্থিত ‘সম্মিলিত সাস্টিয়ান ঐক্য’ প্যানেলে একজন নারী প্রার্থী আছেন। ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’ প্যানেলে তিনজন নারী প্রার্থী লড়ছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ প্যানেল থেকে দুজন নারী প্রার্থী আছেন। এর বাইরে প্যানেল ছাড়া ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক পদে একজন নারী প্রার্থী নির্বাচন করছেন।

‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ প্যানেল থেকে আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী তাছমিমা মাহফুজ বলেন, ‘ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর জন্য চেষ্টা করছি। তবে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ট্যাগিং, বুলিং। নারীদের ভোটের ব্যাপারে আমি আত্মবিশ্বাসী।’