হাজারো রোজাদার একসঙ্গে ইফতার করেন চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে। গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটায়
হাজারো রোজাদার একসঙ্গে ইফতার করেন চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে। গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটায়

২৫ বছর ধরে গণ–ইফতার হয় এই মসজিদে, এসেছিলেন সাড়ে তিন হাজার রোজাদার

আসরের ওয়াক্ত শেষ হয়েছে। মসজিদে পা রাখতেই একজন সহাস্যে এগিয়ে এলেন। ছোটখাটো গড়নের প্রাণচঞ্চল মানুষ। আবুল কালামকে চিনতে অসুবিধা হলো না। ১৭ বছর ধরে আবুল কালাম এই মসজিদে ইফতার আয়োজনে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করেন। সারা বছর তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, পবিত্র রমজানের সময় মসজিদে হাজির হবেন। গত কয়েকবার এসে কালামকে পেয়েছি। পরিবর্তন কিছুই নেই। কেবল এবার গায়ে স্বেচ্ছাসেবকদের ইউনিফরম চড়েছে।

আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ চট্টগ্রাম নগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন। বড় খোলা চত্বর আর নকশা করা খিলানের মসজিদটি ১৬৬৭ খ্রিষ্টাব্দে মোগলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের স্মারক হিসেবে শায়েস্তা খাঁর ছেলে বুজুর্গ উমেদ খাঁর হাতে তৈরি। দিল্লি জামে মসজিদের আদলে অনন্য স্থাপত্যে গড়া এই মসজিদ আরও একটি কারণে বিখ্যাত। আর তা হলো এখানকার গণ–ইফতার। ২৫ বছর ধরে এখানে গণ–ইফতারের আয়োজন করা হচ্ছে।

শামসুল আলম যখন কথা বলছিলেন, তখন তাঁর সামনের বড় থালায় মুড়ি–ছোলা আর জিলাপি মাখাচ্ছিলেন এক তরুণ। তিনি হেসে ইশারায় সামনে আসতে অনুরোধ করলেন। বললেন, ‘শরিক হয়ে যান ভাই।’

গতকাল সোমবার বিকেলে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে গিয়ে দেখা গেল, ইফতার আয়োজনে ব্যস্ত আবুল কালামসহ অন্তত আটজন স্বেচ্ছাসেবক। বড় চত্বরের ওপরে শামিয়ানার ছাউনি। সেখানে দস্তরখানা বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে রোজাদারদের জন্য।

মসজিদের এক পাশে বড় একটা প্লাস্টিকের গামলায় এবারও দুই হাজার মানুষের জন্য শরবত তৈরি হচ্ছে। একটি বেসরকারি কোম্পানির প্রতিনিধি মো. শহীদুল আলম প্রতিবছর রোজায় শরবত বানান এই মসজিদে। দূর থেকে দেখেই তিনি ডাক দিলেন। শরবত তৈরি তখন শেষ।

জানতে চাইলাম এবার কতটুকু চিনি, রুহআফজা লাগল শরবত বানাতে? শহীদ আলম বললেন, ‘আজ ২০ কেজি চিনি, ১৮ বোতল রুহআফজা, ১ কেজি লবণ, ৪০ কেজি বরফ দিয়ে শরবত তৈরি করেছি।’

ইফতার আয়োজনের সব উপকরণই মানুষের দান থেকে আসে। সরকারের কোনো সাহায্যই নেয় না এখানকার কর্তৃপক্ষ। ইফতার আয়োজনে দৈনিক কত খরচ হয় জানতে চাইলে মসজিদের খতিবের সহকারী হাসান মুরাদ বলেন, ‘এই আয়োজনে মসজিদ কর্তৃপক্ষের এক টাকাও খরচ হয় না। প্রচুর মানুষ আমাদের সাহায্য করেন। কেউ ছোলা, কেউ তেল, বেসন বা ডাল পাঠান। সেদিনও এক ব্যক্তি দুই কেজি লবণ দিয়ে গেলেন। তবে কেউই নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চান না।’

গতকাল ইফতারিতে ছিল ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপি, চপ আর মুড়ি। বিকেল ঘনিয়ে আসতেই থালায় ইফতারি বণ্টন শুরু হয়। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে মসজিদ প্রায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সিকিউরিটি গার্ড, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রিকশাচালক—কে নেই এই গণ-ইফতার আয়োজনে।

মসজিদের মুসল্লি ও খাদেমরা জানান, রোজায় ইফতারের আয়োজন এখানকার ঐতিহ্য। তবে বড় পরিসরে গণ-ইফতারের আয়োজন করা হচ্ছে ২০০১ সাল থেকে। মসজিদের খতিব সৈয়দ মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন তাহের জাবেরী আল-মাদানীর উদ্যোগেই এ আয়োজন শুরু হয়। তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী মো. হাসান মুরাদ এমনটাই জানালেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এবার পয়লা রোজা থেকে মুসল্লিদের ভিড় দেখা গেছে। এর মধ্যে প্রথম দিন থেকেই তিন হাজারের বেশি মানুষ ইফতার আয়োজনে শামিল হয়েছেন। গত রোববারও সাড়ে তিন হাজারের মতো রোজাদার এসেছিলেন ইফতার করতে।

মসজিদের ইফতার আয়োজনে সব শ্রেণির মানুষ অংশ নেন। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শ্রমিক, রিকশাচালক, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অসহায় দুস্থ লোকজন এখানে আসেন। ইফতারির থালা ঘিরে তৈরি হয় এক অন্যরকম সমতা।

গতকাল ইফতারিতে ছিল ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপি, চপ আর মুড়ি। বিকেল ঘনিয়ে আসতেই থালায় ইফতারি বণ্টন শুরু হয়। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে মসজিদ প্রায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সিকিউরিটি গার্ড, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রিকশাচালক—কে নেই এই গণ-ইফতার আয়োজনে।

কয়েক বছর ধরে রোজার মাসের পুরোটা সময় মসজিদে সময় দেন জয়নাল আবেদিন। প্লেটে ইফতারি দিচ্ছিলেন তিনি। এর ফাঁকেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে। জয়নাল পেশায় দিনমজুর। রোজার সময় মসজিদে রোজাদারদের ‘খিদমতে’ লেগে যান। রোজায় মসজিদে সময় দেন তিনি বিনা পারিশ্রমিকে।

জানতে চাইলাম, রোজগার কম হওয়ায় সংসারে টান পড়ছে কি না। তিনি দুপাশে মাথা নাড়লেন। বললেন, ‘এখানে তো কামাই করতে আসি না। রোজাদারেরা তৃপ্তি করে খান—এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।’

চট্টগ্রামের আছদগঞ্জের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব শামসুল আলম বসেছিলেন মসজিদের ভেতরের অংশে। ইফতার করতে এখানে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতি রোজায় একবার এখানে আসি। সবার সঙ্গে ইফতার করার আনন্দই আলাদা। শত শত রোজাদার আল্লাহর দরবারে হাত তুলেছেন। কারও উসিলায় হয়তো আমার রোজাও কবুল হবে।’

শামসুল আলম যখন কথা বলছিলেন, তখন তাঁর সামনের বড় থালায় মুড়ি–ছোলা আর জিলাপি মাখাচ্ছিলেন এক তরুণ। তিনি হেসে ইশারায় সামনে আসতে অনুরোধ করলেন। বললেন, ‘শরিক হয়ে যান ভাই।’