স্বেচ্ছায় রাস্তা নির্মাণকাজে এগিয়ে আসেন গ্রামের শিশু–কিশোর থেকে সব বয়সী মানুষ। গতকাল শনিবার বিকেলে নওগাঁ সদর উপজেলার মুরাদপুর এলাকায়
স্বেচ্ছায় রাস্তা নির্মাণকাজে এগিয়ে আসেন গ্রামের শিশু–কিশোর থেকে সব বয়সী মানুষ। গতকাল শনিবার বিকেলে নওগাঁ সদর উপজেলার মুরাদপুর এলাকায়

বারবার ধরনা দিয়েও হয়নি, গ্রামের পাঁচ শতাধিক মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে বানালেন সড়ক

নওগাঁ সদর উপজেলার বক্তারপুর ইউনিয়নের মুরাদপুর গ্রাম থেকে পশ্চিম দিকে আধা কিলোমিটার দূরে একটি পাকা সড়ক। কিন্তু গ্রাম থেকে সেই পাকা সড়কে যাওয়ার মতো এত দিন কোনো রাস্তা ছিল না। এতে বছরের পর বছর ধরে দুর্ভোগ পোহাতে হয় মুরাদপুরসহ অন্তত তিনটি গ্রামের হাজারো মানুষকে। রাস্তা না থাকায় আধা কিলোমিটার পথ জমির আল দিয়ে যাতায়াত করতে হতো। এতে সারা বছর তাঁদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো।

অবশেষে এবার ওই তিন গ্রামের পাঁচ শতাধিক মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে মাটি কেটে একটি রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেন। গতকাল শনিবার দিনভর কাজ করে আধা কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও আট ফুট প্রস্থবিশিষ্ট এই রাস্তা নির্মাণ করেন গ্রামবাসী।

নিজেদের দুর্ভোগ লাঘবে সব ভেদাভেদ ভুলে এ উদ্যোগে যোগ দেন দলমত-নির্বিশেষে এলাকার সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। আর পুরো উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছেন এলাকার জনপ্রতিনিধিরা। মাটি কাটা শেষে স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত রাস্তাটি পাকাকরণের প্রতিশ্রুতি দেন বক্তারপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা সারওয়ার কামাল।

মাটি কাটার কাজ শেষে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করা পাঁচ শতাধিক মানুষের খাওয়ার জন্য গরু উপহার দেন ইউপি চেয়ারম্যান। এ ছাড়া গ্রামের কেউ চাল দিয়েছেন, কেউ দিয়েছেন ডাল, কেউ পুকুরের মাছ। গ্রামের যেসব মানুষের কিছুই দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাঁরা রান্নার কাজে সহযোগিতা করেছেন।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাস্তাটি নির্মাণের ফলে মুরাদপুর গ্রাম ছাড়াও পাঁচবাড়িয়া ও মোক্তারপাড়া গ্রামের লোকদের যাতায়াতেও উপকার হবে। রাস্তাটি হওয়ার ফলে মুরাদপুর, মুক্তারপাড়া ও পাঁচবাড়িয়া গ্রামবাসীকে নওগাঁ শহরে যেতে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ কমে যাবে। এ জন্য এই রাস্তা নির্মাণকাজে মুক্তারপাড়া ও মুরাদপুর গ্রামের অনেক মানুষ এগিয়ে আসেন।

গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, মুরাদপুর, পাঁচবাড়িয়া ও মোক্তারপাড়ার লোকজনের চলাচলের জন্য কোনো রাস্তা ছিল না। গ্রামের লোকজনকে নানা প্রয়োজনে নওগাঁ শহর, স্থানীয় হাটবাজার, স্কুল-কলেজে, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে, জমিতে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করতে প্রতিদিনই যাতায়াত করতে হতো। গ্রামের শিশুরা প্রতিদিন গ্রামের পশ্চিম দিকে হালঘোষপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। প্রতিদিন তিন গ্রামের হাজারো মানুষের চলাচলে ভরসা জমির সরু আল। মুরাদপুর, পাঁচবাড়িয়া ও মোক্তারপাড়া গ্রামের লোকজনকে প্রতিদিন জমির আল দিয়ে হেঁটে হালঘোষপাড়া পাকা রাস্তার মোড়ে গিয়ে ভ্যান, ইজিবাইক, অটোরিকশা ধরে জেলা শহর ও হাটবাজারে যাতায়াত করতে হতো। রাস্তা না থাকায় হাটবাজারে কৃষিপণ্য বিক্রি করতে খুব দুর্ভোগ পোহাতে হতো।

গ্রামের কয়েকজন বলেন, শুষ্ক মৌসুমে আল একটু প্রশস্ত করে সেই পথ দিয়ে সাইকেল কিংবা ভ্যানে করে যাতায়াত করা যেত। কিন্তু বর্ষাকাল এলে অনেকটা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন তিন গ্রামের মানুষ। কাদাজল মাড়িয়ে আল দিয়ে গ্রাম থেকে বের হওয়া দায় হয়ে পড়ে। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে বারবার ধরনা দিলেও এত দিন কোনো কাজ হয়নি।

মুরাদপুর গ্রামের বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম বলেন, বর্ষাকাল এলেই কাদাজলে চলাচল করতে না পেরে গ্রামের শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। কৃষকেরা সারা বছর জমিতে উৎপাদিত ধান, আলুসহ কৃষিপণ্য ভাঁড়ে করে, সাইকেলে ঠেলে বিক্রির জন্য হাটে নেন। বর্ষাকালে সাইকেলও চলে না। অসুস্থ ব্যক্তি ও গর্ভবতী নারীদের হেঁটে কিংবা কাঁধে করে হালঘোষপাড়া পাকা রাস্তার মোড়ে নেওয়ার পর মিলত যানবাহন। এখন সেই দুর্ভোগ অনেকটাই লাঘব হবে। রাস্তাটা পাকা হলে আরও বেশি উপকার হবে।

বক্তারপুর ইউপির চেয়ারম্যান সারওয়ার কামাল বলেন, গতকাল কুয়াশামোড়া সকাল থেকেই মোক্তারপাড়া, পাঁচবাড়িয়া ও মোক্তারপাড়া গ্রামের পাঁচ শতাধিক কিশোর-তরুণ, যুবক দলমত-নির্বিশেষে সবাই ডালি-কোদাল হাতে মাটি কেটে রাস্তা নির্মাণে লেগে পড়েন। তিনি নিজেও গ্রামবাসীর সঙ্গে মাটি কাটার কাজে যোগ দেন। সরকারি রাস্তা হিসেবে নকশা না থাকায় ওইটুকু রাস্তা করতে এত দিন সরকারি কোনো সহায়তা পাওয়া যায়নি। তবে এখন রাস্তা হওয়ার পর এটা সংস্কার কিংবা পাকা করার জন্য সরকারি সহযোগিতা পাওয়া যাবে।