ফুলের পরাগায়ন ঘটানোর কাজে ব্যস্ত মিলন ইসলাম। গতকাল মঙ্গলবার দিনাজপুরের বিরল উপজেলার গোবিন্দপুর এলাকায়
ফুলের পরাগায়ন ঘটানোর কাজে ব্যস্ত মিলন ইসলাম। গতকাল মঙ্গলবার দিনাজপুরের বিরল উপজেলার গোবিন্দপুর এলাকায়

ইউটিউব দেখে পেঁয়াজবীজ চাষ, এবার অর্ধকোটি টাকা বিক্রির লক্ষ্য দিনাজপুরের মিলনের

ইউটিউবে একটি ভিডিও দেখে পেঁয়াজবীজ চাষে উদ্বুদ্ধ হন দিনাজপুরের বিরল উপজেলার মিলন ইসলাম (২৫)। ২০২২ সালের পর কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি এ চাষে সফলতা পেয়েছেন। এবার সাড়ে সাত একর জমিতে পেঁয়াজবীজ উৎপাদন করছেন। সবকিছু অনুকূলে থাকলে প্রায় তিন টন বীজ পাওয়ার আশা করছেন।

মিলনের বাড়ি দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ধামইর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে। তাঁর বাবা মঞ্জুরুল ইসলাম একজন বর্গাচাষি। তিন ভাইয়ের মধ্যে মিলন ছোট। ইতিমধ্যে তাঁর উৎপাদিত পেঁয়াজবীজ সরকারি মানঘোষিত বীজ হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। বীজ বিক্রির টাকায় কিছু জমিও কিনেছেন তিনি।

গতকাল মঙ্গলবার দিগন্তজোড়া পেঁয়াজের খেত ঘুরে দেখা যায়, তিন ফুট অন্তর বেডপদ্ধতিতে লাগানো হয়েছে পেঁয়াজের কন্দ। দুই থেকে আড়াই ফুট লম্বা গাছের সবুজ কাণ্ডের মাথায় গোলাকৃতির সাদা ফুলগুলো দোল খাচ্ছে বাতাসে। দেখে মনে হবে, শিল্পী যেন পরম যত্নে সবুজ চাদরে সাদা রঙের ফুলের ছবি এঁকেছেন। বেডের চার কোনায় খুঁটি দিয়ে গাছগুলোর হেলে পরা রোধে দড়ি টানা হয়েছে। মিলনসহ ১০-১২ জন শ্রমিক হাতের তালুতে ফুলের পরাগায়ন ঘটাচ্ছেন।

মিলন জানান, ২০২২ সালে প্রথম পাঁচ বিঘা জমিতে পেঁয়াজবীজের আবাদ করেন। পরের বছর লোকসান হলেও হাল ছাড়েননি। তৃতীয় বছরে আড়াই একর জমিতে চাষ করে প্রায় আট লাখ টাকা লাভ করেন। এবার তিনি সাড়ে ১৪ বিঘা জমিতে ‘সুখসাগর’ ও ‘কিং’ জাতের পেঁয়াজ লাগিয়েছেন। পাশাপাশি সাথি ফসল হিসেবে মিষ্টিকুমড়া ও তরমুজও চাষ করছেন।

মিলনের খেতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিক কাজ করেন

পেঁয়াজবীজের চাষ বেশ স্পর্শকাতর বলে জানান মিলন। তাঁর মতে, সামান্য অবহেলাতেই ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। লিচুর মৌসুমে মৌমাছির উপস্থিতি কম থাকায় অনেক ক্ষেত্রে হাতে পরাগায়ন করতে হচ্ছে। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে প্রায় ৩ টন বীজ ও ১৫ মণ পেঁয়াজ পাওয়া যেতে পারে। প্রতি কেজি বীজ ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হলে অর্ধকোটি টাকার বেশি বিক্রির আশা করছেন তিনি।

মিলনের খেতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে স্থানীয় শিক্ষার্থীরাও আছেন। কলেজশিক্ষার্থী সৌরভ কুমার বলেন, পেঁয়াজবীজের চাষ এলাকায় নতুন। কাজটিও খুব কষ্টের নয়। প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা মজুরি পাওয়া যায়।

এবার মিলনের কাছ থেকে বীজ নিয়ে অন্তত ২৪ জন কৃষক পেঁয়াজবীজ চাষ শুরু করেছেন। তাঁদের একজন বিরল উপজেলার বটহাট এলাকার কৃষক এমদাদুল হক। তিনি বলেন, আগে বাজার থেকে বীজ কিনে পেঁয়াজের চারা করতেন। এবার প্রথমবারের মতো মিলনের কাছ থেকে কন্দ নিয়ে পাঁচ কাঠা জমিতে বীজের পেঁয়াজ লাগিয়েছেন।

মিলনের ভাষ্য, ২০২১ সালে উপজেলা কৃষি অফিসের একটি প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার পর পেঁয়াজবীজ চাষে আগ্রহী হন। পরে ইউটিউব ও অভিজ্ঞ কৃষকদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে চাষ শুরু করেন। এখন কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে নিয়মিত খেতের পরিচর্যা করছেন।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, জেলায় মসলাজাতীয় ফসলের পাশাপাশি পেঁয়াজবীজ চাষেও কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। এবার জেলায় প্রায় ৫৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজবীজের আবাদ হয়েছে। কৃষকদের প্রণোদনা ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।