নিজের খেতে তরমুজ হাতে চাষি মোহাম্মদ ফোরকান। আজ বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রামের আনোয়ারার রায়পুর ইউনিয়নের ফুলতলী গ্রামে
নিজের খেতে তরমুজ হাতে চাষি মোহাম্মদ ফোরকান। আজ বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রামের আনোয়ারার রায়পুর ইউনিয়নের ফুলতলী গ্রামে

চট্টগ্রামের যে গ্রামে চাষ হয় কোটি টাকার তরমুজ

খেতজুড়ে সারি সারি তরমুজ। কোথাও বড়, কোথাও মাঝারি আকারের। কোনো খেতে তরমুজ তোলার কাজ চলছে, আবার কোথাও বিক্রির জন্য জমির এক পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। আজ শনিবার সকালে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার উপকূলীয় রায়পুর ইউনিয়নের উত্তর পরুয়াপাড়ার ফুলতলী গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এই চিত্র।

উপজেলার পারকি বাজারের সেতু পার হয়ে বাঁ পাশে এগোলেই ফুলতলী গ্রাম। গ্রামটিতে বছরের পর বছর ধরে তরমুজ চাষ করে আসছেন কৃষকেরা। ভালো স্বাদের কারণে এই গ্রামে উৎপাদিত তরমুজ বিক্রি হয় ভালো দামে।

কৃষকেরা জানান, বালু ও এঁটেল মাটির মিশ্রণের কারণে এলাকার জমিতে তরমুজের ফলন ভালো হয়। তবে কয়েক বছর ধরে গ্রামটিতে সাগরের লোনাপানি ঢুকে পড়ছে। এ কারণে মাটির উর্বরতা শক্তিও কিছুটা কমেছে। এর প্রভাবে তরমুজের আকার ছোট হচ্ছে।

বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রামটিতে প্রায় ২০ জন কৃষক তরমুজ চাষ করেন। সব মিলিয়ে চাষের জমির পরিমাণ প্রায় ৪০ একর। স্থানীয় হিসাবে তা প্রায় ১০০ কানি (এক কানি সমান ৪০ শতাংশ)। এসব জমিতে তরমুজ চাষ করতে খরচ হয় প্রায় ৫০ লাখ টাকা। মৌসুম শেষে তরমুজ বিক্রি করে পাওয়া যায় এক কোটি টাকার বেশি।

‘লাভ-ক্ষতি বড় করে দেখি না। বংশপরম্পরায় আমরা তরমুজ চাষ করে আসছি। আমি চার কানি জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। এতে প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আশা করছি, চার লাখ টাকার বেশি বিক্রি করতে পারব।’
—মোহাম্মদ ফোরকান, চাষি, ফুলতলী গ্রাম, আনোয়ারা, চট্টগ্রাম

এলাকাটিতে চাষিরা মূলত ৬০ দিনে ফলন হয় এমন ‘বিগ প্লাস’, ‘এশিয়ান প্লাস’ ও ‘গ্লোরিয়া জাম্বু’ জাতের তরমুজ চাষ বেশি করেন। এ ছাড়া ৯০ দিনে ফলন হয় এমন জাতের তরমুজও চাষ হচ্ছে।

কৃষকেরা জানান, তরমুজ চাষে নানা রোগের ঝুঁকিও রয়েছে। কখনো লতার ডগা থেকে শুরু করে পুরো গাছ শুকিয়ে যায়। আবার মাঝেমধ্যে ছত্রাকজনিত রোগ দেখা দেয়। অনেক সময় হঠাৎ লতা মরে যায়। এ ধরনের রোগকে চাষিরা ‘স্ট্রোক’ বলে থাকেন। সব মিলিয়ে এক কানি জমিতে তরমুজ চাষে খরচ পড়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। বর্তমানে এসব তরমুজ ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চলতি মৌসুমে আরও প্রায় ২০ দিন বেচাকেনা চলবে।

শনিবার দুপুরে ফুলতলী এলাকায় গিয়ে কথা হয় তরমুজ চাষি মোহাম্মদ ফোরকানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘লাভ-ক্ষতি বড় করে দেখি না। বংশপরম্পরায় আমরা তরমুজ চাষ করে আসছি। আমি চার কানি জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। এতে প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আশা করছি, চার লাখ টাকার বেশি বিক্রি করতে পারব।’

গ্রামটিতে প্রায় ২০ জন কৃষক তরমুজ চাষ করেন। সব মিলিয়ে চাষের জমির পরিমাণ প্রায় ৪০ একর। স্থানীয় হিসাবে তা প্রায় ১০০ কানি (১ কানি সমান ৪০ শতাংশ)। এসব জমিতে তরমুজ চাষ করতে খরচ হয় প্রায় ৫০ লাখ টাকা। মৌসুম শেষে তরমুজ বিক্রি করে পাওয়া যায় এক কোটি টাকার বেশি।

আরেক চাষি মো. মিয়া বলেন, ‘দেড় কানি জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। এতে খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। প্রথম দফায় তরমুজ বিক্রি করেছি ৯০ হাজার টাকার। খেতে এখনো কিছু তরমুজ রয়েছে। সব বিক্রি করলে আরও প্রায় ২০ হাজার টাকা পাওয়া যাবে।’

উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আনোয়ারা উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে মোট ১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে প্রায় ৫০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ করেন প্রায় ১৫০ জন কৃষক। এসব তরমুজের মধ্যে ‘গ্লোরি জাম্বু’, ‘গ্লোরি’, ‘সুইট ড্রাগন’, ‘বিগ ফ্যামিলি’, ‘চ্যাম্পিয়ন’, ‘সুপার এমপেরর’, ‘বাংলালিংক’ ও ‘পাকিজা’ জাত রয়েছে। চলতি বছর ‘বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের আওতায় আনোয়ারা উপজেলায় ১২ জন চাষিকে প্রদর্শনী উপকরণ দিয়েছে কৃষি কার্যালয়।

আনোয়ারা উপজেলা উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা সরোয়ার আলম বলেন, ‘আনোয়ারায় প্রতিবছরই তরমুজ চাষ হয়। আমরা নিয়মিত চাষিদের তদারকি করি এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকি। চলতি বছর ফুলতলী থেকেই প্রায় এক কোটি টাকার তরমুজ বিক্রি হবে।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামীম আহমদ সরকার বলেন, ‘আনোয়ারা উপকূলের তরমুজ স্বাদে ভালো হওয়ায় এর চাহিদাও বেশি। ভবিষ্যতে এখানে তরমুজের চাষ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।’