মাতৃভাষা চর্চার উদ্যোগ

মাতৃভাষার ফেরিওয়ালা কনথৌজম

মণিপুরি ভাষার চর্চা হচ্ছে দেখে অনেকেই (মণিপুরের) অভিভূত। দেশের অনেক মণিপুরি অভিভাবক তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে মণিপুরি অক্ষর আয়ত্ত করছেন। 

অনলাইনে ‘মণিপুরি মপী ময়েক’ ক্লাস নিচ্ছেন কনথৌজম শিল্পী। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ভানুবিল মাঝের গাঁওয়ে
 ছবি: প্রথম আলো

একজন কনথৌজম শিল্পী। পেশায় তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তিনি মণিপুরি ভাষী মানুষ। তাঁর মাতৃভাষায় সবাই কথা বলতে পারলেও লিখতে-পড়তে সাবলীল না। তাঁর বহুদিনের ইচ্ছা, মাতৃভাষাটা সবাই যেন ভালো করে পড়তে-লিখতে পারে, সে রকম একটি উদ্যোগ গ্রহণের। সেই ভাষা চর্চার সুযোগ তৈরি করা। 

তাঁর মনের ভেতর মণিপুরি ভাষা নিয়ে কিছু করার এই ইচ্ছা অনেক দিন নিভৃতেই ছিল। সুযোগ আসতেই তা ডানা পেয়েছে। অনলাইন-অফলাইন দুভাবেই ভাষার লিপিচর্চাটাকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে উদ্যোগী হয়েছেন এই মাতৃভাষার ফেরিওয়ালা। তাঁর বাড়ি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের মণিপুরি-অধ্যুষিত আদমপুর ইউনিয়নে। 

কনথৌজম শিল্পী বলেন, করোনায় তখন বিদ্যালয় বন্ধ। ঘরে বসে সময় কাটে না, একঘেয়ে লাগে। তখনই মাতৃভাষা চর্চার গোপন ইচ্ছাটি ভাবনায় আসে। সংগ্রহ করেন মণিপুরি লেখক-গবেষক এ কে শেরামের মণিপুরি মপী ময়েক (মণিপুরি বর্ণপরিচয়), মণিপুরি ভাষা এ দুটি বই। তাঁর (কনথৌজম শিল্পীর) বাবা কনথৌজম সুবোধের ব্যক্তিগত পাঠাগার থেকেও কিছু বই সংগ্রহ করেন। মণিপুর থেকে নিয়ে আসা কিছু বই এবং বেসরকারি সংস্থা এথনিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (একডো) পরিচালিত স্কুল থেকেও কিছু বই সংগ্রহ করেন। এই বইগুলোর সহযোগিতায় নিজেকে তৈরি করেন। তাঁর কথায়, করোনার আতঙ্কে যখন অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চাপ নেই, শিশু, যুবক, বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষ ঘরবন্দী, প্রায় সবাই মুঠোফোনে আসক্ত, এমন সময় তিনি ভাবলেন, এ রকম দীর্ঘ সুযোগ ভবিষ্যতে হয়তো আর আসবে না। এ ছাড়া ছোট শিশুরা ঘরে আটকে আছে, তাদেরও কিছুটা যদি আনন্দ জোগানো যায়। ভাবনাটাকে কাজে লাগাতে ২০২১ সালের আগস্ট থেকে ভানুবিল মাঝেরগাঁওয়ের বাড়ি থেকেই অনলাইন ক্লাস শুরু করলেন। তাঁর শাশুড়িমা, স্বামী অমরেন্দ্র কুমার সিংহ, নিকটজন শচীন সিংহ ইডেন, অশোক কুমার সিংহ, কবি খোইরম ইন্দ্রজিৎ, সানালৈমা প্রমুখ সহযোগিতার হাত বাড়ান। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘তাঁদের সহযোগিতায় আমি এতটা দূর আসতে পেরেছি।’

কনথৌজম শিল্পী জানিয়েছেন, মণিপুরি বর্ণপরিচয় নিয়েই তাঁর ক্লাস। তবে বাংলাদেশের মণিপুরিরা যেহেতু বাংলা ভাষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাই মণিপুরি বর্ণের সঙ্গে পরিচয় করানোর সঙ্গে সঙ্গে মণিপুরি কোন বর্ণের সঙ্গে বাংলা কোন বর্ণ হবে, সেটা বুঝিয়ে বলার একটা বিষয় আছে। যেমন মণিপুরি বর্ণ ‘কোক’ হলে বাংলা ব্যঞ্জন বর্ণ ‘ক’ হবে। এ রকম স্পষ্ট করার আরও একটা কারণ হচ্ছে মণিপুরিরা অনেক সময় বাংলা বর্ণমালা দিয়ে মণিপুরি ভাষা লেখেন। তাই মণিপুরি ও বাংলা দুই বর্ণমালাতেই ক্লাস করেন তিনি। আগে ক্লাসের ভিডিও রেকর্ড করেন। তারপর তাঁর নিজের ‘হৈরোল পেজ’ বা ইউটিউব চ্যানেল ‘হৈরোল বিডি’তে তা প্রচার করেন। এ পর্যন্ত ২০টি পর্ব আপলোড করেছেন। প্রতিটি পর্ব ৫০০ থেকে দেড় হাজার দর্শক-শ্রোতা দেখেন। মণিপুরি সমাজের সব বয়সের মানুষ তাঁর অনলাইন ক্লাস উপভোগ করেন। আর এই ‘মণিপুরি মপী ময়েক’ অনলাইন ক্লাস শুধু বাংলাদেশের মণিপুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, ভারতের মণিপুর থেকেও অনেকে তাঁর ক্লাস দেখছেন, তাঁকে অনেক পরামর্শ দিচ্ছেন। বাংলাদেশে এভাবে মণিপুরি ভাষার চর্চা হচ্ছে দেখে অনেকেই (মণিপুরের) অভিভূত। বাংলাদেশের অনেক মণিপুরি অভিভাবক তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে মণিপুরি অক্ষর আয়ত্ত করছেন। 

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওগ্রাফি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী অশোক কুমার সিংহ বলেন, ‘যেকোনো জাতির অস্তিত্ব রক্ষায় ভাষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভাষার অস্তিত্ব রক্ষায় তাঁর এমন সুন্দর উদ্যোগ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিয়মিত অফলাইন এবং অনলাইনে আমাদের মণিপুরি ভাষাচর্চার ব্যবস্থা করে যাচ্ছেন। তাঁর হৈরোল পেজে নিয়মিত যেসব ভিডিও আপলোড করেন, সেগুলো দেখে আমরা, বিশেষ করে আমি উপকৃত হচ্ছি।’

কনথৌজম শিল্পীর মাতৃভাষা চর্চার এই উদ্যোগ শুধু অনলাইনে থেমে নেই। তিনি সরাসরিও নানাভাবে কাজ করছেন। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ নারীদের নিয়ে মাসে এক দিন ক্লাস করছেন। ওই নারীরা এখন মণিপুরি ভাষায় পড়তে ও লিখতে পারছেন। তাঁর নিজের স্কুল ছনগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং বাংলাদেশ মণিপুরি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি কুঞ্জ রানী সিনহার উদ্যোগে প্রতি বৃহস্পতিবার স্কুল ছুটির পর শিশুশিক্ষার্থীদের নিয়ে এক ঘণ্টা মণিপুরি অক্ষর শেখানোর ক্লাস করেন। এ ছাড়া একডো পরিচালিত ভানুবিল মাঝেরগাঁও এবং মঙ্গলপুর মণিপুরি ভাষা কেন্দ্রের শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। হকতিয়ার খোলা গ্রামে বৃন্দা রানী সিনহার প্রতিষ্ঠিত ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পরীক্ষকের দায়িত্বও পালন করেন। 

ভানুবিল মাঝেরগাঁও গ্রামের নারী আশা রানী চনু বলেন, ‘আমি আগে মণিপুরি লিপি লিখতে ও পড়তে পারতাম না। শিল্পীর কাছে ক্লাস করার পর কিছু কিছু লিখতে ও পড়তে পারছি।’

মণিপুরি কবি খোইরম ইন্দ্রজিৎ বলেন, ‘শিল্পীর অনলাইন কার্যক্রমের মাধ্যমে মণিপুরি লিপি শিক্ষার্থীরা উপকৃত হচ্ছে। তাঁর সহজভাবে মণিপুরি হরফ লেখার কৌশল উপস্থাপনও চমৎকার।’

একডোর নির্বাহী পরিচালক লক্ষ্মীকান্ত সিংহ প্রথম আলোকে বলেন, শিল্পীর মণিপুরি ভাষা ও বর্ণমালা প্রশিক্ষণের এই কার্যক্রম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর এই ক্ষুদ্র প্রয়াসের ফলে সব বয়সের আগ্রহী মণিপুরি নারী-পুরুষ মণিপুরি ভাষা শেখার সুযোগ পাচ্ছেন। এই উদ্যোগ বাংলাদেশে মণিপুরি ভাষা ও বর্ণমালাকে টিকিয়ে রাখতে এবং এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এটি নিয়মিত হলে সাধারণ মানুষ আরও উপকৃত হবে।

তবে কনথৌজম শিল্পী শুধু মণিপুরি ভাষা শেখানোতেই আবদ্ধ নেই, সমাজের মানুষের জন্য কিছু করতে চলতি বছর (২০২২) হৈরোল ফাউন্ডেশন নামের একটি সংগঠন করেছেন। এই সংগঠন থেকে গত ১৮ মার্চ প্রায় শতবর্ষী নাট্যদল ‘দি ভানুবিল ড্রামা পার্টি’র প্রবীণ অভিনেতা-অভিনেত্রী সম্ভু রতন সিংহ, নীলধ্বজ সিংহ, খম্বাতন সিংহ, হরিদাস সিংহ, থাম্বাল দেবী, খোইরোম ইন্দ্রজিৎ, রাজকুমার সিংহ এবং রঞ্জিৎ কুমার সিংহকে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। 

কনথৌজম শিল্পী প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছু মানুষও যদি মণিপুরি ভাষা শিখতে পারে, উপকৃত হয়, এ জন্যই আমার এ চেষ্টা। এ ছাড়া আমি মণিপুরি-অধ্যুষিত গ্রামে গিয়ে মণিপুরি বর্ণমালা ও ভাষা শিখার জন্য সবাইকে উদ্বুদ্ধ করি।’