জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন এম এ এইচ সেলিম
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন এম এ এইচ সেলিম

বাগেরহাটের ৪ আসন

বিএনপির ‘মনোনয়নবঞ্চিত’ সেলিম একাই তিন আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী

বিএনপির প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে চারটি আসনেই কমবেশি আন্দোলন হয়। শেষ পর্যন্ত তিনটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির নেতারা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে বাগেরহাটের একটি সংসদীয় আসন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম চলে। পরে আদালতের রায়ে তফসিল ঘোষণার দিনে চারটি আসন পুনর্বহাল করে গেজেট প্রকাশ করে ইসি। এরপর বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা করলে একাংশের নেতা-কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে জেলার চারটি আসনেই কমবেশি আন্দোলন হয়।

শেষ পর্যন্ত চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতেই বিএনপির প্রার্থীর পাশাপাশি দলের নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এর মধ্যে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ এইচ সেলিম একাই তিনটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি বেশ আলোচিত হচ্ছে। বাগেরহাট-২ (সদর-কচুয়া) আসনের সাবেক এই সংসদ সদস্য এবারও বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তিনি সিলভার লাইন গ্রুপের চেয়ারম্যান। মনোনয়ন না পাওয়ায় তিনি বাগেরহাট-১, ২ ও ৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি কোনো আসন থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবেন কি না তা নিয়ে আলোচনা আছে। তফসিল অনুযায়ী, ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন।

একাধিক আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে এম এ এইচ সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপির প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচন করতেছি বলে আমি মনে করি। কারণ, আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটি যে বিবেচনায় প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে, এরা কেউই জামায়াতের সামনে পাস করতে পারবে না। কাজেই আমি বিএনপির সিট রক্ষার জন্য, বিএনপির স্বার্থেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছি; যাতে আমাদের বিএনপির সিটগুলো না কমে। জিততে পারলে তা–ও তো দলকে আমি বলতে পারব, এই তিনটা সিট রক্ষা করছি দলের জন্য।’

মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে জেলার চারটি আসনে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬। নির্বাচন করতে এসব আসনে মোট ৩২ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। প্রতিটি আসনেই আছেন বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন দলের নেতারা আসনগুলোতে প্রার্থী হয়েছেন।

বাগেরহাট-১ (চিতলমারী-ফকিরহাট-মোল্লাহাট)

আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ১১ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে চারজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এখানে বিএনপির প্রার্থী কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল। হিন্দু সম্প্রদায়ের এই নেতা কিছুদিন আগে বিএনপিতে যোগ দেন।

জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ এইচ সেলিমের পাশাপাশি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শেখ মাসুদ রানাও এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত দুজনই নির্বাচনের মাঠে থাকলে তা ভোটের সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা।

জানতে চাইলে মাসুদ রানা বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর বাগেরহাটে আন্দোলন–সংগ্রামে বিএনপিকে আমি বাঁচিয়ে রেখেছি। আমি বিএনপির আদর্শে বিশ্বাসী একজন সৈনিক। যেহেতু জনগণের রাজনীতি করছি, জনগণের সঙ্গে আছি; সেহেতু আমি শতভাগ আশাবাদী, তারা আমাকে সংসদে নেবে ইনশা আল্লাহ।’

অবশ্য বিএনপির প্রার্থী কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, ‘সাধারণ মানুষ আমাকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছে, বুকে টেনে নিচ্ছে। দলীয় নেতা-কর্মীরাও খুব আন্তরিকভাবে আমাকে সাহায্য করছেন। জনগণের যে অভূতপূর্ব সাড়া, তাতে আমি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।’ বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে দল সিদ্ধান্ত নেবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আসনটিতে জামায়াত প্রার্থী মো. মশিউর রহমান খান। তিনি দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও খুলনা অঞ্চল টিম সদস্য। আসনটিতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মো. মামুনুল হকও প্রার্থী হয়েছেন। তিনি ঢাকা-১৩ আসনেও প্রার্থী হয়েছেন। জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা হলে শেষ পর্যন্ত বাগেরহাট-১–এ মামুনুল হক প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে পারেন বলে আলোচনা আছে।

‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ থাকলে নির্বাচনে জয় নিয়ে আশাবাদী জামায়াতের প্রার্থী মো. মশিউর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী জোটের হয়ে নির্বাচন করতে পারলে আমরা এখানে বিজয়ের ব্যাপারে খুবই আশাবাদী। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে কাজ করে আসছি।’

এর বাইরে এখানে প্রার্থী হয়েছেন বাংলাদেশ মুসলিম লীগের আবু সবুর শেখ ও এবি পার্টির মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম।

বাগেরহাট-২ (সদর-কচুয়া)

আসনটিতে আটজন মনোনয়নপত্র জমা দিলেও একজনেরটি বাতিল হয়েছে। বিএনপির প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন। তিনি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তবে দুই সহোদর এম এ সালাম এবং এম এ এইচ সেলিম স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তাঁরা দুজনই জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি।

২০০১ সালে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন সেলিম। ২০০৮ ও ২০১৮ সালে দলীয় প্রার্থী ছিলেন এম এ সালাম। তবে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও ‘দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাবেন না’ বলে জানিয়েছেন এম এ সালাম।

 বিএনপির প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘বিএনপি সুসংগঠিত দল। নেতা-কর্মীরা সবাই আমার সঙ্গে আছেন। এম এ সালামসহ দলীয় সব নেতা-কর্মীই আমার সঙ্গে কাজ করবেন।’

এখানে জামায়াতের প্রার্থী শেখ মনজুরুল হক (রাহাদ)। তিনি জেলা জামায়াতের যুব বিভাগের প্রধান। ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে এসে দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিকভাবে নির্বাচনকেন্দ্রিক তৎপরতা চালিয়ে আসছে তিনি। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের শেখ আতিয়ার রহমান, খেলাফত মজলিসের বালী নাছের ইকবাল ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রমিজ উদ্দিন প্রার্থী হয়েছেন।

বাগেরহাট-৩ (মোংলা ও রামপাল)

সুন্দরবন ও মোংলা বন্দরের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই সংসদীয় আসনে বৈধ প্রার্থী সাতজন। এখানে বিএনপির প্রার্থী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক।

দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের রাজনীতি ও জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পৃক্ততা ভোটের মাঠে এগিয়ে রাখবে বলে দাবি ফরিদুল ইসলামের। তিনি বলেন, ‘রামপাল-মোংলার মানুষ হিসেবে দেড় যুগ ধরে অসহায়দের পাশে থেকেছি। হামলা-মামলা ও অত্যাচারে সেই দীর্ঘ সময় ধরে নেতা-কর্মীদের আগলে রেখেছি। দল আমার ওপরে আস্থা রেখেছে। আশা করি সবাই মিলে আমরা ধানের শীষের বিজয়কে নিশ্চিত করব।’

জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল ওয়াদুদ শেখ। তিনি জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির। তিনি বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত যখন জোটবদ্ধ নির্বাচন করেছে, তখনো এই আসনে জামায়াতের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন–সংগ্রামের পাশাপাশি মানুষের পাশে থেকেছি। জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবার জামায়াত নির্বাচিত হোক।’

এই আসনে ইসলামী আন্দোলনের শেখ জিল্লুর রহমান, এনসিপির মো. রহমাতুল্লাহ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. জুলফিকার হোসেন, জেএসডির মো. হাবিবুর রহমান মাস্টার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এ এইচ সেলিম প্রার্থী হয়েছেন।

বাগেরহাট-৪ (মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা)

আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী সোম নাথ দে। তিনি কিছুদিন আগে দলে যোগ দেন। জামায়াতের প্রার্থী মো. আবদুল আলীম। তিনি জেলা জামায়াতের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক। এ ছাড়া এখানে প্রার্থী হয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের মো. ওমর ফারুক, জাতীয় পার্টির সাজন কুমার মিস্ত্রি ও জেএসডির মো. আ. লতিফ খান।

সোম নাথ দে বলেন, ‘দলের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মী আমার সঙ্গে আছেন। একসঙ্গে কাজ করছেন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যে বিশ্বাস ও ভরসা আমার ওপর রেখেছেন, মোরেলগঞ্জ-শরণখোলার সব মানুষকে নিয়ে আমি তা রক্ষার চেষ্টা করব।’

আবদুল আলীম বলেন, এখনো পরিবেশ ভালো। তবে সামনের দিনে শঙ্কা আছে। তাই নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর হয়, এ ব্যাপারে কমিশনকে দৃঢ় হতে হবে।