স্কুল চলার সময় খেলায় মেতে আছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের শিশুরা। ৮ আগস্ট তোলা
স্কুল চলার সময় খেলায় মেতে আছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের শিশুরা। ৮ আগস্ট তোলা

সাদা বালুর সেন্ট মার্টিন দ্বীপের কত শিশু স্কুলে যায়, লেখাপড়ার ভবিষ্যৎই–বা কী

সেন্ট মার্টিনে শিক্ষার উপযোগী প্রায় ৪ হাজার শিশু-কিশোরের মধ্যে বিদ্যালয়ে যায় মাত্র ৭২৯ জন। শিক্ষকসংকট, দারিদ্র্য, অভিভাবকদের অসচেতনতা ও পর্যটননির্ভর শ্রমের কারণে তিন হাজারের বেশি শিশুর শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত। একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাতটি পদের মধ্যে শিক্ষক আছেন মাত্র দুজন; অন্য বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোও অর্থ ও শিক্ষকসংকটে ধুঁকছে।

বঙ্গোপসাগরের বুকে আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিন। সৌন্দর্যের রানি হিসেবে পরিচিত এই দ্বীপ নিয়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহের শেষ নেই। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে অন্য গল্পও আছে। সাদা বালু আর নীল জলরাশির এই দ্বীপের লেখাপড়ার বয়স হওয়া ৪ হাজার শিশুর মধ্যে মাত্র ৭২৯ জন বিদ্যালয়ে যায়। বাকি ৩ হাজারের বেশি শিশুর শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত। মাছ ধরা ও পর্যটন–সংশ্লিষ্ট নানা শ্রমের কাজে যুক্ত তারা।

কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পা রাখলেই দেখা যায়, শিশু-কিশোরেরা শ্রেণিকক্ষে নেই, তাদের সময় কাটছে বালুচরে, দোকান কিংবা পথের আড্ডায়। ৮ আগস্ট বিকেলে সেন্ট মার্টিনের একমাত্র জেটিতে পা রাখতেই এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। এখানকার শিশুদের অবস্থা সরেজমিনে দেখতে পর্যটন বন্ধের মৌসুমে বিশেষ অনুমতি নিয়ে সেন্ট মার্টিনে আসা। জেটির পূর্ব ও উত্তর পাশের বিশাল বালুচরে তখন কয়েক শ শিশু-কিশোর ফুটবল, মার্বেল খেলায় মেতে ছিল। তাদের কোলাহলে মুখর সৈকত। বড়রা বালুচরে রাখা নৌকায় বসে শিশু-কিশোরদের খেলা উপভোগ করছেন। জেটির শেষ প্রান্তে সেন্ট মার্টিন বাজার। সেখানেও দেখা গেল শিশু-কিশোরদের জটলা।

জেটির পূর্ব পাশের সৈকতে কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে খেলছিল ৩৫ শিশু। তাদের মধ্যে দুজন ছাড়া বাকি ৩৩ শিশুর কেউ স্কুলেই যায় না। কারণ জানতে চাইলে ১৪ বছর বয়সী মো. আলম বলে, ‘স্কুলে স্যার (শিক্ষক) নাই, ক্লাস হয় না, গিয়া কী করব?’ ১৩ জনের আরেকটি দলে ভাগ হয়ে মার্বেল খেলছিল শিশুরা। কথা বলে জানা গেল, তাদের মধ্যে ৯ জনই স্কুলে যায় না। সাজেদা নামের এক শিশু জানায়, সে মক্তবে যায়, স্কুলে পড়ে না।

৮ ও ৯ আগস্ট দ্বীপের কোনাপাড়া, দক্ষিণপাড়া, গলাচিপা, মাঝেরপাড়া, পশ্চিমপাড়া, উত্তরপাড়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, শিক্ষার উপযোগী শত শত শিশু-কিশোর দোকানপাট, বালুচর ও বাজারে সময় পার করছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১১ হাজার বাসিন্দার এই দ্বীপে ৪ হাজার শিশু-কিশোর আছে শিক্ষার উপযোগী বয়সের। কিন্তু দ্বীপের চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছে ৭২৯ জন। বাকি ৩ হাজারের বেশি শিশু-কিশোর শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত।

জেটির পূর্ব পাশের সৈকতে কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে খেলছিল ৩৫ শিশু। তাদের মধ্যে দুজন ছাড়া বাকি ৩৩ শিশুর কেউ স্কুলেই যায় না। কারণ, জানতে চাইলে ১৪ বছর বয়সী মো. আলম বলে, ‘স্কুলে স্যার (শিক্ষক) নাই, ক্লাস হয় না, গিয়া কী করব?’ ১৩ জনের আরেকটি দলে মার্বেল খেলছিল শিশুরা। কথা বলে জানা গেল, তাদের মধ্যে ৯ জনই স্কুলে যায় না। সাজেদা নামের এক শিশু জানায়, সে মক্তবে যায়, স্কুলে পড়ে না।

দ্বীপে পর্যটন মৌসুম (নভেম্বর থেকে জানুয়ারি—তিন মাস) শুরু হলে এই শিশুদের বেশির ভাগই কাজে লেগে যায়। পর্যটকদের ব্যাগ বহন, গাইড হিসেবে কাজ করা, ডাব বিক্রি কিংবা মাছ ধরার কাজে জড়িয়ে পড়ে শিশু-কিশোরেরা। শিক্ষকসংকট, সরকারি তদারকির অভাব, অভিভাবকদের অসচেতনতা, দারিদ্র্য ও পর্যটনের কারণে মূলত এই শিশু-কিশোরেরা স্কুলমুখী হতে পারছে না।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহীন মিয়া বলেন, বছরের ৯ মাস নৌপথের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় দ্বীপের শিক্ষায় তদারকি করা প্রায় অসম্ভব। শিক্ষার্থীরা মাসে ২০০-২৫০ টাকা উপবৃত্তি পায়, কিন্তু একদিন পর্যটকদের ব্যাগ টানলে তারা পায় ৫০০ টাকা। এই বৈষম্য প্রাথমিক শিক্ষাকে অকার্যকর করে তুলেছে।

সরকারি তথ্যমতে, কক্সবাজার জেলায় সাক্ষরতার হার ৫৫ শতাংশ, ভর্তির হার ৯৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং ঝরে পড়ার হার ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। অথচ সেন্ট মার্টিনে সাক্ষরতার হার মাত্র ১৫ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং ঝরে পড়ার হার ৩০ শতাংশ।

দুই শিক্ষক দিয়ে চলছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

দ্বীপের উত্তরপাড়ায় রয়েছে দ্বীপের একমাত্র ‘জিনজিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। ৩৭ শতাংশ জমির ওপর ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে সাতটি পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন দুজন শিক্ষক। প্রায় ১৪ বছর ধরে প্রধান শিক্ষকসহ পাঁচটি পদ শূন্য রয়েছে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ তাহের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। দাপ্তরিক কাজে তাঁকে মাঝেমধ্যে টেকনাফ যেতে হলে পুরো স্কুলের পাঠদান সামলাতে হয় অপর সহকারী শিক্ষক মুহাম্মদ নুরুল হুদাকে।

বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ২০০ জন। পর্যটন মৌসুমে উপস্থিতি কমে যায়। অথচ পাঁচ-ছয় বছর আগেও বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল পাঁচ শতাধিক। এখন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ৩০ শতাংশই ঝরে পড়ে। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ তাহের বলেন, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় মানসম্মত পাঠদান সম্ভব হচ্ছে না।

টেকনাফ উপজেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আবু নোমান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, দুর্গম দ্বীপ হওয়ায় শিক্ষকদের সেখানে যেতে অনীহা কাজ করে। বদলি হয়ে চলে যাওয়ায় সংকট কাটছে না। তবে আগামী অক্টোবরের মধ্যে নতুন শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে।

বন্ধের পথে বেসরকারি ‘ক্রিড স্কুল’

দ্বীপের কোনাপাড়ায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বেসরকারি ‘ক্রিড প্রাথমিক বিদ্যালয়’। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিআরইইডি (পুনর্বাসন, শিক্ষা ও জীবিকায়ন উন্নয়ন কেন্দ্র) এটি প্রতিষ্ঠা করে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সংস্থাটি শিক্ষকদের বেতন দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এরপর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া মাসিক বেতনের টাকায় কোনোমতে পাঠদান চালু রাখা হয়। বর্তমানে মো. এরফান নামের একজন শিক্ষক দিয়ে দুই শিফটে ৬৬ শিশুর পাঠদান চলছে।

শিক্ষক মো. এরফান বলেন, প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী থেকে মাসে ১০০ টাকা এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী থেকে ১৫০ টাকা বেতন নেওয়া হয়। সংকটের কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী এই বেতন দিতে পারে না। তহবিলসংকটের কারণে শিক্ষকও নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। তাতে দিন দিন শিক্ষার্থী কমছে। এভাবে চলতে থাকলে বিদ্যালয়টি যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রীকে দিয়ে পাঠদান

দ্বীপের দক্ষিণ পাড়ায় রয়েছে বেসরকারি ‘দক্ষিণ পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়’। ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি শুরুতে ইউনিয়ন পরিষদের অর্থায়নে শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হতো। পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়দের সহযোগিতায় কয়েক বছর চলার পর ২০২১ সাল থেকে সেই সহযোগিতাও বন্ধ হয়ে যায়।

বিদ্যালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে ১৫৫ জন। আবদুল মালেক নামের একজন শিক্ষক রয়েছেন এখানে। স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে প্রায় তিন মাস ধরে অনুপস্থিত রয়েছেন, তাতে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

শিক্ষক আবদুল মালেক বলেন, ২০২১ সাল থেকে বিনা বেতনে পড়াচ্ছেন তিনি। আগে দুই শিফটে পাঠদান চলত। এখন তিনি দ্বীপের বাইরে (চট্টগ্রামে) থাকায় পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী শওকত আরাকে দিয়ে অন্য শিক্ষার্থীদের পড়ানো হচ্ছে। শিক্ষকসংকটের কারণে দিন দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে স্থানীয় ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নজির আহমদ বলেন, বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ ঘরটি সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে পাঠদানের উপযোগী করা হয়েছে। তবে তহবিলসংকটে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না।

শিক্ষক সংকটের কারণে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের ‘দক্ষিণ পাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এ শিশুদের পড়াচ্ছে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী শওকত আরা। সম্প্রতি তোলা

যেভাবে চলছে একমাত্র উচ্চমাধ্যমিক স্কুল

সেন্ট মার্টিনের প্রাণকেন্দ্রে বাজারের কাছে দ্বীপের একমাত্র উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেন্ট মার্টিন বিএন ইসলামিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯৬ সালে স্বীকৃতি পায়। প্রতিষ্ঠানটিতে ১৩ জন শিক্ষক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন প্রাতিষ্ঠানিক বেতনে নিয়োগপ্রাপ্ত। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রয়েছেন চারজন। তিন মাস ধরে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন কৃষিবিজ্ঞানের শিক্ষক তানজিলা খাতুন। আর চিকিৎসা ছুটিতে রয়েছেন ধর্মীয় শিক্ষক মো. ফেরদৌস।

বিদ্যালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে শিক্ষার্থী রয়েছে ৩০৮ জন। এর মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা ১৭২। চলতি বছরের দশম শ্রেণির প্রাক্‌-নির্বাচনী পরীক্ষায় ৪৮ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে ১ জন, ব্যবসায় শিক্ষায় ৭ জন এবং মানবিক বিভাগে ৪০ জন। এবারের এসএসসির ফলাফলও হতাশাজনক। ৪৭ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে ১৩ জন। তাদের মধ্যে ২১ জন ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে মাত্র ২ জন। গত বছরও ৪৭ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছিল ১৮ জন।

শিক্ষকদের ভাষ্য, পাস করা শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই পরবর্তী সময়ে পড়াশোনা আর এগিয়ে নিতে পারে না। প্রতিষ্ঠান থেকে এখন পর্যন্ত দুজন শিক্ষার্থী এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ২০১৭ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মো. আয়াছ ও ইসলামুল হক বাপ্পী এই কৃতিত্ব অর্জন করে।

প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মদন কান্তি রুদ্র বলেন, বর্ষা ও পর্যটন মৌসুমে ছাত্রদের উপস্থিতি খুবই কমে যায়। অধিকাংশ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক পড়াশোনার বিষয়ে সচেতন নন। এ কারণে ফলাফলও ভালো হচ্ছে না। ফলাফল বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে অভিভাবকদের সচেতন করার পাশাপাশি বাড়ি গিয়ে পড়াশোনার অবস্থাও দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

টেকনাফ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, যাতায়াত সমস্যার কারণে অনেক সময় সেন্ট মার্টিনে সশরীর গিয়ে তদারকির সুযোগ হয় না। এরপরও পাসের হারে বিপর্যয় ও শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।