খুলনার রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহ হত্যাকাণ্ডে তিনটি ‘কিলার গ্রুপ’ অংশ নেয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে একটি দলের সদস্যরা গুলি চালান, আরেকটি দল ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপায়। তৃতীয় দলটি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া সন্ত্রাসীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে ছিল।
পূর্বশত্রুতা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে মনে করছে পুলিশ ও মাসুম বিল্লাহর পরিবার। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে জাভেদ পাটোয়ারী নামের আরও একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর আগে গতকাল বুধবার রাতে হত্যাকাণ্ডের পর একজনকে অস্ত্রসহ আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন স্থানীয় জনতা। আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়নি। তবে পুলিশ বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে একটি মামলা করেছে।
পারিবারিক সূত্র জানায়, গতকাল দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে স্ত্রী ও ভাতিজার মেয়েকে নিয়ে রূপসা উপজেলার বাগমারা গ্রামের বাড়ি থেকে খুলনায় আসেন মাসুম বিল্লাহ। প্রথমে তাঁরা খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতালে একজন রোগীকে দেখতে যান। সেখান থেকে বিকেলে নিউমার্কেটে কেনাকাটা শেষে নগরের শিববাড়ী মোড়ে ইফতার করেন। ইফতার শেষে তাঁরা নগরের প্রাণকেন্দ্র ডাকবাংলো মোড়ে কেনাকাটার জন্য গেলে দুর্বৃত্তরা মাসুম বিল্লাহকে ঘিরে ধরে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সিসি ক্যামেরার ভিডিও থেকে দেখা যায়, এ সময় প্রাণ বাঁচাতে সেখানকার বাটার শোরুমের দিকে দৌড় দেন মাসুম। পেছন থেকে হামলাকারীরা প্রথমে তাঁর ডান পায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি বাটার শোরুমে ঢুকে পড়েন। পরে দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দোকানের ভেতরে ঢুকে তাঁর গলা ও পিঠে গুলি করলে তিনি মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।
এ সময় উপস্থিত লোকজন ও পুলিশ বিদেশি রিভলবারসহ অশোক ঘোষ নামের এক দুর্বৃত্তকে আটক করে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় মাসুম বিল্লাহকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত মাসুম বিল্লাহর চাচা মহিউদ্দীন শেখ বলেন, মাসুম বিল্লাহ রূপসা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি। শ্রমিকদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল। তিনি আবারও সভাপতি পদে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এ কারণেই প্রতিপক্ষ পরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে খুনি দিয়ে তাঁকে হত্যা করিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
খুলনা মহানগর পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পূর্বশত্রুতার জের ধরে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা মাসুম বিল্লাহকে হত্যা করেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে তিনটি কিলার গ্রুপ অংশ নেয়। গুলি চালানো গ্রুপে আটজন সদস্য ছিল, যার মধ্যে দুজনকে মূল কিলার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ড শেষে পালানোর সময় উপস্থিত জনতা ও পুলিশ অশোক ঘোষ নামের এক সন্ত্রাসীকে বিদেশি অস্ত্রসহ আটক করে।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে পারিবারিক কবরস্থানে মাসুম বিল্লাহর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। জানাজায় খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলালসহ জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া অস্ত্রধারীসহ সাত থেকে আটজনের নাম–পরিচয় পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন খুলনা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) মো. তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় অস্ত্র আইনে খুলনা সদর থানায় একটি মামলা হয়েছে। ভুক্তভোগীর স্ত্রী আজ রাতের মধ্যে হত্যা মামলা করবেন বলেও তিনি জানান।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল আটক হওয়া অশোক ঘোষকে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তিনি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
মাসুম বিল্লাহ রূপসা উপজেলার বাগমারা গ্রামের মৃত মিনহাজ উদ্দীন মুন্সীর ছেলে। তিনি দুটি মামলার আসামি ছিলেন এবং আগে র্যাবের হাতে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাঁর বড় ভাই নৈহাটি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল ওরফে মিনা কামাল ২০২০ সালে র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।