
লক্ষ্মীপুরে ভোটের অবৈধ ৬টি সিল উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর এক নেতাসহ দুজনের নামে মামলা করা হয়েছে। লক্ষ্মীপুর সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হুমায়ুন কবির বাদী হয়ে গতকাল মঙ্গলবার রাতে এ মামলা করেন।
মামলায় প্রধান আসামি করা ব্যবসায়ী সোহেল রানাকে (৪০)। তিনি সদর উপজেলার টুমচর ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং মারইয়াম প্রেসের স্বত্বাধিকারী। গতকাল বিকেলে শহরের পুরোনো আদালত রোডের মারইয়াম প্রেস থেকে ভোটে ব্যবহারের অবৈধ ছয়টি সিল, একটি কম্পিউটার, একটি মুঠোফোনসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
মামলার অপর আসামি হলেন সৌরভ হোসেন ওরফে শরীফ (৩৪)। তিনি পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মো. শাহজাহানের ছেলে ও ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি।
পুলিশ জানিয়েছে, সৌরভ হোসেন ছয়টি ভোটের সিল তৈরির জন্য ব্যবসায়ী সোহেল রানার দোকানে অর্ডার দেন। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, সৌরভ হোসেনের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনের প্রার্থীর একাধিক ছবি রয়েছে। এসব ছবি ও জব্দ আলামতের সূত্র ধরে সিল তৈরির পেছনের উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ তাঁকে এখনো গ্রেপ্তার করেনি।
ঘটনার পর থেকে সৌরভ হোসেন শরীফ মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তবে লক্ষ্মীপুর পৌর জামায়াতের সেক্রেটারি হারুন অর রশীদ বলেন, ৪ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সেক্রেটারি সৌরভ হোসেনকে ষড়যন্ত্রমূলক আসামি করা হয়েছে।
এদিকে, ভোটের অবৈধ সিল উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটার দিকে লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সংবাদ সম্মেলন করেন। নিজের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ্যানি বলেন, ‘সিলসহ সোহেল রানা নামে যাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তিনি জামায়াতের কর্মী বলে জানতে পেরেছি। হয়তো তাঁর পদ-পদবিও রয়েছে। একটি কম্পিউটারসহ ছয়টা সিল জব্দ করা হয়েছে। সিলগুলো যিনি বা যাঁরা বানিয়েছেন, নিশ্চয়ই এর পেছনে অনেক কলকবজা রয়েছে, একটা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের হিসাব-নিকাশ রয়েছে।’
এ্যানি বলেন, সিল বানানোর পেছনে কোনো প্রার্থীর বা কোনো রাজনৈতিক দলের নেতার ইন্ধন রয়েছে কি না, খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি কেন্দ্রে জাল ভোট ও জালিয়াতি বন্ধের ব্যবস্থা নিতে হবে। একইভাবে আরও অনেক সিল বানানো হয়েছে কি না, খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়ে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি আরও বলেন, সিলের পাশাপাশি ব্যালট ছাপানোর ঘটনাও ঘটতে পারে। প্রশাসনকে অবশ্যই সতর্ক এবং সজাগ থেকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিএনপির সংবাদ সম্মেলনের পর একই দিন রাত ১০টার দিকে লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামী। এতে লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী রেজাউল করিম বলেন, ভোটের সিলসহ গ্রেপ্তার ব্যক্তির সঙ্গে জামায়াতকে জড়িয়ে বিএনপি মিথ্যাচার করছে।’
রেজাউল করিম বলেন, ‘যেকোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, অতীতের মতোই আরেকটি দলের মুদ্রাদোষে পরিণত হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া সোহেল জামায়াতের কেউ নন। এ ঘটনার সঙ্গে যে বা যারা জড়িত রয়েছে, প্রশাসন তদন্ত করে বের করবে। এ রকম একটি ঘৃণিত ঘটনার আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।’
পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, উদ্ধার হওয়া সিলের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনায় দুটি দিককে প্রাথমিকভাবে সামনে রেখে তদন্ত চলছে। প্রথমত, এসব সিল ভোটারদের প্রশিক্ষণ বা মহড়া দেওয়ার কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল কি না—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের দিন ব্যালট পেপারে সিল মারার মাধ্যমে ভোট কারচুপি বা কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল কি না—সেই বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওয়াহেদ পারভেজ বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল রানা পুলিশকে জানিয়েছেন, অর্ডার পাওয়ার পরই তিনি এসব সিল তৈরি করছিলেন। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, সৌরভ হোসেন নামের এক ব্যক্তি সিলগুলো তৈরির অর্ডার দিয়েছেন।’
ওসি আরও বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। সিল তৈরির পেছনের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং সৌরভের সঙ্গে এ ঘটনায় আর কেউ জড়িত আছে কি না—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।