পদ্মা নদী লাগোয়া প্রথম আলো ট্রাস্ট পরিচালিত রাজশাহী আলোর পাঠশালা। গত কয়েক দিন ধরে পানি বাড়ছে। প্রতিদিন সকাল বিকেল পানি মাপে স্কুলের শিক্ষার্থীরা। রাজশাহী নগরের তালাইমারী শহীদ মিনার এলাকায়
পদ্মা নদী লাগোয়া প্রথম আলো ট্রাস্ট পরিচালিত রাজশাহী আলোর পাঠশালা। গত কয়েক দিন ধরে পানি বাড়ছে। প্রতিদিন সকাল বিকেল পানি মাপে স্কুলের শিক্ষার্থীরা। রাজশাহী নগরের তালাইমারী শহীদ মিনার এলাকায়

রাজশাহীতে পদ্মার পানি বাড়ায় বাড়ি ছাড়লেন অনেকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি

রাজশাহীতে কয়েক দিন ধরে পদ্মার পানি বেড়ে চলেছে। এতে পদ্মার তীরবর্তী নতুন নতুন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। গত কয়েক দিনে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে কয়েক শ পরিবার। একই পরিস্থিতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের নিম্নাঞ্চলেও। জেলাটিতে পদ্মার পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও কোথাও কোথাও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) রাজশাহী কার্যালয় সূত্র জানায়, রাজশাহীতে পদ্মায় পানি গত মাসের শেষ দিকে বাড়তে শুরু করে। গত রোববার সকাল ৯টায় পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ১৩ মিটার। গত সোমবার সকাল ৯টায় ছিল ১৭ দশমিক ৩২ মিটার। গতকাল মঙ্গলবার বেড়ে হয় ১৭ দশমিক ৪৩ মিটার। আজ বুধবার তা বেড়ে হয়েছে ১৭ দশমিক ৪৯ মিটার। রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানির বিপৎসীমা ১৮ দশমিক শূন্য ৫ মিটার।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজশাহী শহরের তালাইমারী, কাজলা, পঞ্চবটি, পাঠানপাড়া লালনশাহ মঞ্চ, শ্রীরামপুরসহ বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার অনেকেই বাড়ি ছেড়েছেন। সবচেয়ে বেশি খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে নগরের তালাইমারী, শ্রীরামপুর ও পঞ্চবটি এলাকায়। শুধু তা–ই নয়, রাজশাহী শহর থেকে দক্ষিণে চরখিদিরপুর, খানপুর ও বাঘার চক রাজাপুরের বেশির ভাগ অংশ ডুবে গেছে।
নগরের শ্রীরামপুর এলাকায় অন্তত ৩০টি পরিবার নতুন করে পানিবন্দী হয়েছে। বুধবার সকাল থেকে অনেককে বাড়ি ছাড়তে দেখা যায়। এই এলাকার বাসিন্দা মো. শাহাবুল নৌকায় করে ডুবে যাওয়া বাড়ি থেকে জিনিসপত্র নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আজ থেকে আর থাকা যাচ্ছে না। সব ডুবে গেছে।’

অনেকে গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। শহর রক্ষা বাঁধে কথা হয় তাহাসীন আলীর সঙ্গে। তিনি ১৮টি গরু শহর রক্ষা বাঁধের নিচে বেঁধে রেখেছেন। তাহাসীন বলেন, তাঁদের বাড়ি এখানেই। বাড়িতে বুকসমান পানি।

শহর রক্ষার জন্য রাজশাহী শহর অংশে টি-বাঁধ ও আই-বাঁধ নামে কয়েকটি বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। এসব এলাকায় পদ্মার পানি বাধাপ্রাপ্ত হয়ে মাঝনদীর দিকে চলে যায়। এতে শহর অংশে পানির চাপ কম হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সতর্কতা হিসেবে পদ্মা নদীর আই বাঁধ ও টি-বাঁধ এলাকায় ভ্রমণের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুর রহমান বলেন, গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় অতিবৃষ্টি হওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে ফারাক্কা বাঁধের অধিকাংশ জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। আগামী তিন দিন ধীরে ধীরে পানি বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে পদ্মার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করবে না বলে আশা করছেন তিনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা নদীর পানি বেড়ে বইছে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করায় পাঠদান ব্যহত হচ্ছে। নারায়ণপুর দারুল হুদা আলিম মাদ্রাসা

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়েই বইছে। কিন্তু জেলার সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের চাঁপাইনবাবগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিব বুধবার প্রথম আলোকে জানান, পদ্মা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে বইছে। উজানের ঢলের চাপও কমেছে। আশা করা যায়, দুই দিন পর থেকে পানি কমতে শুরু করবে। এখন পর্যন্ত এটাকে পুরোপুরি বন্যা পরিস্থিতি না বলে সাময়িক বন্যা পরিস্থিতি বলা যায়। পানি বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও সতর্কসীমা অতিক্রম করেছে।

সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউপি চেয়ারম্যান নাজির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ১৫ বছর বা তারও আগে যাঁরা বসতভিটা উঁচু করে বাড়ি বানিয়েছেন, তাঁদের বাড়িঘরে কেবল পানি ঢোকেনি। কিন্তু নদীভাঙনের শিকার হয়ে যাঁরা বসতভিটা হারিয়ে নিচু এলাকায় বাধ্য হয়ে বাড়ি করেছেন, তাঁদের বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে। এমন পরিবারের সংখ্যা ৫০০ থেকে ৬০০।

এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেশি। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জেছের আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সদর উপজেলায় ১০ ও শিবগঞ্জ উপজেলার ৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জলমগ্ন হয়েছে। আমরা চেষ্টায় আছি বিকল্প স্থানে পাঠদানের।’

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল মতিন জানান, শিবগঞ্জে নয়টি মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জলমগ্ন হওয়ায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে। সদর উপজেলার তালিকা এখনো তৈরি হয়নি, কাজ চলছে।

জেলা ত্রাণ শাখার তথ্যানুসারে, ১ হাজার ১০০ পরিবারের ৫ হাজার ৫০০ মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছেন। শিবগঞ্জের ইউএনও আজাহার আলী জানান, উপজেলার পাকা, দুর্লভপুর ও মনাকষা ইউনিয়নের ৪৯৩ পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়। ওই সব এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

নারায়ণপুর ইউপিতে পানিবন্দী মানুষের মধ্যে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন সদরের ইউএনও মো. নুরুল ইসলাম। প্রথম আলোকে তিনি জানান, অনেকে মানুষের বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে। ফসলের জমি নিমজ্জিত হয়েছে, এটাকে বন্যা পরিস্থিতিই বলা যায়। আর পানি না বাড়লে বা কমতে শুরু করলে এটাকে স্বল্পমেয়াদি বা অস্থায়ী বন্যা বলে যেতে পারে।