
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা এলাকায় সম্প্রতি ‘বীরবাহাদুর’ নামে সাত বছর বয়সী একটি হস্তীশাবককে সনাতন পদ্ধতিতে বেঁধে ‘হাদানি’ (প্রশিক্ষণ) দেওয়া হচ্ছিল। অবশেষে বন বিভাগের হস্তক্ষেপে শাবকটিকে মুক্ত করে মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
৪২ বছর বয়সী পোষা হাতি সুন্দরমালার একমাত্র সন্তান বীরবাহাদুর। প্রশিক্ষণের জন্য মায়ের কাছ থেকে শাবকটিকে আলাদা করা হয়। তার পায়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে আটকে রাখা হয় প্রশিক্ষণস্থলে। প্রশিক্ষণে নিযুক্ত করা হয়েছিল পাঁচজন মাহুতকে। খবর পেয়ে বন বিভাগের লোকজন গিয়ে এ কাজে আপত্তি জানান। তাঁদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল শুক্রবার বিকেলে হস্তীশাবকটিকে শৃঙ্খলমুক্ত করে স্থানীয় কালাপাহাড় জঙ্গলে মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
এর আগে ১ জানুয়ারি কর্মধায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ফাঁকা একটি জমির মধ্যে দুই পাশে মাটিতে গভীর গর্ত করে গাছের কয়েকটি খণ্ড পুঁতে রাখা। হস্তীশাবক বীরবাহাদুরের সামনের দুটি ও পেছনের একটি পায়ে মোটা দড়ি পরানো, শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে গাছের খণ্ডগুলোর সঙ্গে। বীরবাহাদুর শৃঙ্খলমুক্ত হতে বারবার চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হচ্ছিল। মাঝেমধ্যে জোরে জোরে ডেকে উঠছিল।
হাতির মালিক কর্মধার বাসিন্দা সোনা মিয়া। তিনি বছরখানেক আগে মারা গেছেন। এখন তাঁর ছেলে মো. কামরুল ইসলাম হাতি লালন–পালন করছেন। তাঁদের চারটি হাতি। বন বিভাগ থেকে দুটির লাইসেন্স নিয়েছেন।
প্রশিক্ষণে নিয়োজিত প্রধান প্রশিক্ষক আশিক আলীর বাড়ি একই এলাকায়। প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এ কাজ করছেন বলে জানান। এ পর্যন্ত নয়টি হাতিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। আশিক বলেন, ‘হাতি হাদানিতে দেড়-দুই মাস সময় লেগে যায়। এ সময়ে মাহুতের কথা, ইশারা সে যাতে বুঝতে পারে, তা শেখানো হয়। বিভিন্ন শারীরিক কসরত শেখানো হয়। মা কাছে থাকলে সন্তানকে হাদানিতে বাধা দেবে। পুরোনো আমল থেকেই এভাবে হাদানি হচ্ছে। নতুন কোনো পদ্ধতি আমাদের জানা নেই।’
এলাকাবাসী জানান, মূলত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য হাতিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে থাকে। পাহাড়ি এলাকায় গাছ টানার কাজে ও বিভিন্ন সার্কাস অনুষ্ঠানে হাতি ভাড়া দেওয়া হয়।
বন বিভাগের কুলাউড়া রেঞ্জের স্থানীয় নলডরি বিটের কর্মকর্তা রতন চন্দ্র দাস জানান, সনাতন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণের সময় প্রায়ই হাতির ওপর নির্যাতনের তথ্য পাওয়া যায়। এ ছাড়া কর্মধার ওই হাতিটির প্রশিক্ষণ সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানতে পারে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আটক হাতিকে ছেড়ে দিতে মালিককে অনুরোধ জানান। এরপর ছাড়া হয়।
হাতি নিয়ে কয়েক বছর ধরে কাজ করছে ‘পিপল ফর এনিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’ নামে ঢাকার একটি প্রাণিসেবা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান রাকিবুল হক মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, হাদানি পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণের সময় হাতির ওপর নানাভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ‘পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট ট্রেনিং’ কার্যকর। হাতির বাচ্চাকে তার মায়ের সঙ্গে রেখে কোনো ধরনের নির্যাতন ছাড়াই প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। এ নিয়ে থাইল্যান্ডের ‘সেভ এলিফ্যান্ট ফাউন্ডেশন’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে তাঁরা কাজ করছেন। বন বিভাগও তাঁদের এ কাজে সহযোগিতা করছে।
রাকিবুল হক আরও বলেন, পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট ট্রেনিংয়ের আওতায় গাজীপুর সাফারি পার্কে জয়িতা নামের তিন বছর বয়সী একটি হস্তীশাবককে সাত মাস ধরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সঙ্গে তার মা বেলকলিও থাকে। এর আগে দুজন মাহুতকে এ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাঁরাই এ প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। ভালো সাড়াও মিলছে।
আধুনিক পদ্ধতিতে হাতি প্রশিক্ষণের বিষয়ে বন বিভাগের দুজন কর্মকর্তা থাইল্যান্ডে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন বলে জানান প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী। তিনি মুঠোফোনে বলেন, ‘যুগ যুগ ধরে সনাতন পদ্ধতিতে হাতিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এতে হাতি অনেক কষ্ট পায়। তাই আমরা এ পদ্ধতি থেকে মালিক, মাহুতদের ফেরাতে চাই। সময় লাগবে। গাজীপুর সাফারি পার্কের মাহুতদের পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণের পর সারা দেশে মাহুতদের এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’