গারো পাহাড়ের কোলে বেড়ে ওঠা ঘন সবুজের সমারোহে হঠাৎ দোলা দেয় হিমেল হাওয়া। শীতের এই মৌসুমে শাল-গজারির বনের ফাঁক গলিয়ে সূর্যের নরম আলোর ঝিলিক নামে আসে টিলায় টিলায়। দূরের সীমান্তপথে ভেসে আসে হরেক পাখির ডাক। জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার ‘লাউচাপড়া অবসর বিনোদন কেন্দ্র’ যেন এখন প্রকৃতির এক নিভৃত রাজ্য।
কিন্তু এই সৌন্দর্য দেখার সুযোগ মেলে কজনের? আবাসনসংকট আর নানামুখী সীমাবদ্ধতায় গারো পাহাড়-ঘেঁষা এ পর্যটনকেন্দ্রে মানুষের আনাগোনা খুব একটা নেই। যাঁরা আসেন, তাঁরাও সন্ধ্যার আগেই ফেরার তাড়ায় থাকেন। ফলে প্রকৃতির আসল রূপ দেখার আগেই ফিরে যেতে হয়, অপরূপ এই পাহাড় বহু ভ্রমণপিপাসুর কাছে থেকে যায় অদেখা।
অভিযোগ আছে, আবাসনসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা গড়ে না ওঠায় তিন দশকেও সমৃদ্ধ হয়নি জেলার একমাত্র পর্যটনকেন্দ্রটি। বিদ্যুৎ, মানসম্মত খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও রাতযাপনের ব্যবস্থা না থাকায় বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই পুরো এলাকায় নেমে আসে ভুতুড়ে নীরবতা। যোগাযোগ মোটামুটি ভালো হলেও জেলা শহরের বাইরে নিরাপদ আবাসনের অভাব আছে। নেই পর্যাপ্ত প্রচারও।
জামালপুর সদর উপজেলা থেকে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার উত্তরে বকশীগঞ্জ উপজেলায় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষে প্রায় ১০ হাজার একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত বাংলাদেশ অংশের গারো পাহাড়। লাউচাপড়া ও ডুমুরতলা মৌজায় বিভক্ত এই পাহাড় ও বনভূমির মাঝামাঝি জায়গাতেই ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের লাউচাপড়া অবসর বিনোদন কেন্দ্রের অবস্থান।
প্রকৃতির নিপুণ হাতে সাজানো লাউচাপড়ার নৈসর্গিক সৌন্দর্য যে কাউকে আকৃষ্ট করবে। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছবির মতো ছড়িয়ে ছোট-বড় টিলা। ফাঁকে ফাঁকে অজস্র ছোট-বড় ঝরনা, আদিবাসীদের পাহাড়ি গুচ্ছগ্রাম আর দিগন্তজোড়া ঘন সবুজ।
জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, ভ্রমণপিপাসুদের কথা চিন্তা করে ১৯৯৬ সালে ২৬ একর জায়গা নিয়ে লাউচাপড়া অবসর বিনোদন কেন্দ্রটি নির্মাণ করে জেলা পরিষদ। ১৫০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, বিশ্রামের জন্য রেস্টহাউস, দুটি কটেজ, গারো সম্প্রদায়ের আচিক মান্দি ভাস্কর্য ও পাহাড়ে আরোহণের জন্য সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রাকৃতিক একটি লেকও আছে। সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঘন সবুজের সমারোহ নিয়ে সারি সারি টিলা।
সম্প্রতি পর্যটকদের পথ চেয়ে পাহাড়ের চূড়ায় বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে থাকেন ব্যবসায়ী আবদুর রহিম। কিন্তু তেমন কোনো পর্যটক নেই। বিষয়টি নিয়ে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।
লাউচাপড়ায় ঘুরতে গিয়েছিলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বাসিন্দা আতাউর রহমান। পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে নেমে আসার সময় তিনি বলেন, যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই বিশাল বিশাল পাহাড়। একেবারে কোলাহমুক্ত জায়গাটি। তবে এখানে উন্নত মানের কোনো হোটেল নেই। পানি খাওয়ার মতো ব্যবস্থাও নেই। এখানে কয়েক ঘণ্টা ঘুরে সব জায়গা দেখা সম্ভব নয়।
জামালপুর শহর থেকে ঘুরতে এসেছিলেন মোহাম্মদ কালাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এখানে গারো পাহাড়ের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এত অল্প সময়ে দেখা সম্ভব নয়। এখানে রাতের বেলায় থাকার ব্যবস্থা অথবা রিসোর্ট হলে সারা বছর মানুষের ভিড় থাকত।
লাউচাপড়া পিকনিক স্পটের উন্নয়নে ইতিমধ্যে অংশীজনের মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সরকার আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। পর্যটন স্পটটিকে আরও পর্যটকবান্ধব করার লক্ষ্যে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ পদ্ধতিতে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ আহ্বানের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে উন্নয়নের কারণে এই নৈসর্গিক স্থানের পরিবেশ-প্রতিবেশ যাতে বিপন্ন না হয়, সেটিও লক্ষ রাখা হবে।