মেয়ের মাথায় আদুরে বিলি কাটছেন নীলা হাসদা। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার বীরগঞ্জে
মেয়ের মাথায় আদুরে বিলি কাটছেন নীলা হাসদা। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার বীরগঞ্জে

এক সাঁওতাল নারীর সোনার নাকফুলের গল্প কিংবা জেগে ওঠা স্মৃতির কথকতা

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার বরেন্দ্রভূমির গহিনে সাঁওতালপল্লি বীরগ্রাম। অনেকটা পাহাড়ি নদীর মতো এঁকেবেঁকে গ্রামটির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি খারি (খাল)। বৈশাখের তপ্ত রোদে এটি এখন শুকিয়ে খটখটে অবস্থায়। এর পাড়ের একটি বাঁশঝাড় থেকে শুকনা পাতা সংগ্রহ করছিলেন এক নারী। তাঁর পরনে নীল রঙের চেক শার্ট আর মাথায় প্যাঁচানো টুকটুকে লাল গামছা।

চোখ আটকে গেল ওই নারীর সোনার নাকফুলে; ছোট্ট কিন্তু সুন্দর। ছবি তোলার জন্য বললাম, ‘তোমার নাকফুলটা বেশ সুন্দর। বেশ মানিয়েছেও তোমাকে।’ এতক্ষণ মুখে হাসি থাকলে প্রশংসা শুনে মুহূর্তেই তা মিলিয়ে গেল। রোদে পোড়া মুখটা আরও কালো দেখাল যেন, চোখের ভেতর উঁকি দিল জল। কথায় কথায় জানা যায়, সাঁওতাল নারীটির নাম নীলা হাসদা। বীরগ্রামেরই গৃহবধূ ও দিনমজুর। স্বামী মোমিন টুডু মজুরের কাজ করেন।

একমুহূর্তে মনে হলো, নাকফুলের কথাটা বলে ভুল করলাম না তো! পরে সংশয় ভেঙে নীলার কাছে জানতে চাইলাম, ‘কী ব্যাপার, নাকফুলের কথা বলতেই তোমার মন খারাপ হয়ে গেল দেখছি। আমি কি তোমাকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি?’ মলিন মুখেই হ্যাঁ–সূচক মাথা নাড়েন নীলা হাসদা।

দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে নীলা হাসদা এবার বলতে শুরু করলেন, ‘সোনার নাকফুলটা হামার বোড়ো মা (বড় চাচি) ছুটুবেলায় বানায়ে দিছিল। তুমার কথায় হামার বোড়ো মায়ের কথা মনে পড়িয়ে গেল। বোড়ো মা জুমিতে খাঁটি খাইতো। বোড়ো বাবা (বড় চাচা) আগেই মরি গেছিলো। কাম করা টাকা থাকি হামাক সোনার নাকফুলটো বানায়ে দিছিলো। বোড়ো মার কুনু বেটা-বেটি ছিলো না। হামাক খুব সোহাগ করতো।’

শুকনো বাঁশপাতা নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন নীলা হাসদা

কথার এই পর্যায়ে কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন নীলা হাসদা। মনে হলো, বড় মাকে নিয়ে শৈশবের মধুর স্মৃতিগুলো হাতড়ে ফিরছেন তিনি। নাকফুলের কথা তুলে তাঁর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগিয়ে ফেললাম না তো? নীলা হাসদা বেশি সময় নিলেন না। আবার কথা শুরু করলেন, ‘হামার বোড়ো মা এখুন বিছানে পড়ি আছে। ব্যারামে পড়ি গিলছে। কাম করতে পারছেন নাই। তাঁর ভাতিজারা এখুন তাঁকে দেখছে। বহুতদিন হোইলো তাঁকে দেখি নাই। সোংসারের লাগি যাতি পারি নাইখো। তাঁর কথা মনে পড়লি চোখে জল আসি যায়।’

বড় চাচিকে নিয়ে ওঠা আবেগ চেপে রাখতে পারলেন না নীলা হাসদা। অচেনা-অজানা মানুষের কাছে বড় চাচিকে নিয়ে কত কথা কথা বলে যান। তাঁর কথায় জানা গেল, তাঁরা ছিলেন সাত ভাই–বোন। অভাব-অনটনের সংসার। সব দিন তিনবেলা খাবার জুটত না। কোনো দিন একবেলা খেয়েও থাকতে হয়েছে। ভাই–বোনের মধ্যে নীলাকেই বেশি ভালোবাসতেন তাঁর নিঃসন্তান বড় চাচি। কাছে ডেকে এটা-সেটা খেতে দিতেন।

ছোটবেলায় যেদিন নাকফুলটি পেয়েছিলেন, সেদিন নীলার বেশ আনন্দ হয়েছিল জানিয়ে বলেন, সেদিন তাঁকে দুনিয়ায় সবচেয়ে সুখী মেয়ে মনে হয়েছিল। চাচি জড়িয়ে ধরে চুমু এঁকেছিলেন। ধেই ধেই করে পাড়াময় ঘুরে সব্বাইকে নাকফুল দেখিয়ে বেড়িয়েছিলেন নীলা। বিয়ের পরও সেটি আর খোলেননি। স্বামী দিতে চাইলেও চাচির দেওয়া নাকফুলটি নিজের কাছছাড়া করতে চাননি।

নীলা হাসদার পাশে হাঁটতে হাঁটতে এসব কথা শুনছিলাম। একপর্যায়ে তিনি জানান, তাঁর একটি মেয়ে আছে। একমাত্র সন্তান দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। তাকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করতে চান নীলা। চান না, নিজের জীবনের মতো হোক মেয়ের। ফসলের খেতে কাজ করে নিজের রোজগারের টাকা দিয়ে তিনিও মেয়ের জন্য নাকফুল গড়েছেন। নাকফুল পেয়ে মেয়েও খুশিতে আত্মহারা হয়েছিল। এ দৃশ্য দেখেও তাঁর চাচির কথা মনে পড়েছিল।

বাড়ির পেছনে পৌঁছে বাঁশপাতার বোঝাটা নামাচ্ছিলেন নীলা। এর মধ্যেই দৌড়াতে দৌড়াতে এসে হাজির তাঁর মেয়ে সঞ্চিতা মুরমু। মনে হয়, অনেকক্ষণ পর মাকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে সে। মা–ও আদর করে বিলি কাটেন সঞ্চিতার চুলে। সঞ্চিতার সঙ্গে আলাপ জমানোর চেষ্টা মাঠে মারা গেল। মেয়েটি কোনো কথারই জবাব দেয় না, শুধু মুচকি হাসে। আরও কথা বলতেই দৌড়ে ছুটে পালাল মেয়ে। তখনো মুখে লেগেছিল হাসি।

নীলা হাসদা বললেন, ‘বেটিটা হামার বোড়ো লাজুক আছে। পোরথোম দিন তো, আলগা মানুষের সোথে কোথা বুলবে নাই। কোথা যুদিল বুলতে চাহতো কুনু এক পরবের (সামাজিক বা ধর্মীয় উৎসব) দিনে আবার আসিও হামাদের গিরামে; নিমনতোনছো থাকিল।’