
দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননকেন্দ্র হালদা নদীর তিন থেকে চার স্থানে কার্প–জাতীয় রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশ প্রজাতির মা মাছেরা প্রজনন মৌসুমের প্রথম দফায় নমুনা ডিম ছেড়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৭টার দিকে ভাটার সময় এবং দুপুরে জোয়ারের সময় নদীর হাটহাজারীর গড়দোয়ারা ইউনিয়নের নয়াহাট, রাউজানের পশ্চিম গুজরা আজিমের ঘাট ও নাপিতের ঘাট এলাকায় নমুনা ডিম ছাড়ে মা মাছ। ডিম সংগ্রহকারীদের কেউ কেউ ১০০ গ্রাম থেকে ২০০ গ্রাম করে ডিম পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। আবার দুপুরে এক থেকে দেড় কেজি ডিম পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন কয়েকজন জেলে।
আজ দুপুরে রাউজান ও হাটহাজারী মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নমুনা ডিম ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তর জানায়, প্রতিবছর এপ্রিল থেকে জুলাই—এই চার মাস হালদায় কার্প–জাতীয় মাছের প্রজনন মৌসুম। এই মৌসুমের যেদিন বজ্রসহ বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ি ঢলের পানি নামে, সেদিন ডিম ছাড়ে মা মাছ। প্রজনন মৌসুমে মা মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহের অপেক্ষায় থাকেন ৫০০ থেকে ৭০০ জন ডিম সংগ্রহকারী। তবে গত কয়েক বছর ডিমের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় ডিম সংগ্রহকারীর সংখ্যা কমে এসেছে।
হালদা গবেষকেরা বলছেন, আগামী জুন মাসের অমাবস্যা ও পূর্ণিমার জোয়ারে পূর্ণ জোয়ারে মা মাছ পুরোদমে ডিম ছাড়তে পারে। আজ পূর্ণ জোয়ারে এবং ভাটায়ও পুরোদমে ডিম ছাড়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে বলে ধারণা করছে মৎস্য অধিদপ্তর।
মৎস্য কর্মকর্তারা জানান, আজ দুপুরের পরে জোয়ারে যদি পাহাড়ি ঢল অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হয়, তাহলে ডিম ছেড়ে দিতে পারে মা মাছ। ডিম সংগ্রহকারীদের সহযোগিতা করতে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নদীতে কাজ করছেন দুই উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
রাউজান উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ তফজ্জল হোসাইন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘হালদার তিন থেকে চার স্থানে সংগ্রহকারীদের কেউ কেউ ১০০ থেকে ২০০ গ্রাম করে নমুনা ডিম পেয়েছেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। আমরাও সংগ্রহকারীদের সহযোগিতা করতে নদীতে আছি টিম নিয়ে। ধারণা করছি, জোয়ারে এবং ভাটায় মা মাছেরা পুরোদমে ডিম ছাড়তে পারে। তবে সবই প্রকৃতি ও সৃষ্টিকর্তার ওপর নির্ভর করছে।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাটহাজারী ও রাউজান—এই দুই উপজেলার চারটি সরকারি হ্যাচারি ও শতাধিক মাটির কুয়ায় রেণু ফোটানোর জন্য নানা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে প্রশাসন ও সংগ্রহকারীরা। রাউজানের পশ্চিম গুজরার ডিম সংগ্রহকারী রোশাঙ্গীর আলম আজ দুপুর সাড়ে ১২টায় প্রথম আলোকে বলেন, তিনি জোয়ারে নদীর আজিমের ঘাটে এক থেকে দেড় কেজির মতো কয়েক দফায় ডিম সংগ্রহ করেছেন। পূর্ণ জোয়ারে আরও ডিম হতে পারে, তাই তাঁর মতো শত শত ডিম সংগ্রহকারীর চোখ এখন হালদা নদীতে।
হাটহাজারীর গড়দোয়ারা গ্রামের প্রবীণ ডিম সংগ্রহকারী কামাল উদ্দিন সওদাগর বলেন, ‘নদীতে আছি। অল্প নমুনা পাওয়া যাচ্ছে। অপেক্ষায় আছি মাছেরা পূর্ণ ডিম কখন ছাড়ে সেটির।’
হালদা গবেষক ও বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মনজুরুল কিবরিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘মা মাছ পুরোদমে ডিম ছাড়ার আগে অল্প পরিমাণ ডিম ছাড়ে। এর কারণ ডিমভর্তি মা মাছেরা বজ্রপাতের কারণে বা জোয়ার–ভাটার পানির চাপে কিছু কিছু ডিম ছেড়ে দেয়। এগুলোকে নমুনা ডিম বলি আমরা। নমুনা ডিম পাওয়া গেলে বোঝা যায় পুরোদমে ডিম ছাড়ার সময় আসন্ন।’
মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, এই নদী থেকে গত বছর ১৪ হাজার কেজি মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করে আহরণকারীরা। এর আগে ২০২০ সালে রেকর্ডসংখ্যক ২৫ হাজার কেজি ডিম পাওয়া যায়।