চা-বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে দুর্লভ চিতাবিড়াল। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া চা-বাগানে
চা-বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে দুর্লভ চিতাবিড়াল। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া চা-বাগানে

চা-বাগানে দুর্লভ চিতাবিড়ালের দর্শন

এই রোদ, এই বৃষ্টি—এমনই এক দিনে গত ১৪ মে বিরল এক বন্য প্রাণীর খোঁজে বেরিয়েছিলাম ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার কাজল হাজরার সঙ্গে। দীর্ঘদিন ধরেই চা–বাগান ও বনাঞ্চলে ঘুরে দুর্লভ প্রাণীর ছবি ও তথ্য সংগ্রহের নেশা তাঁর। সেদিন আমাদের গন্তব্য ছিল মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। তবে সেখানে যাওয়ার আগে ঢুঁ মেরে যাই শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা–বাগানে।

বনজঙ্গল চষে বেড়ানো কাজল হাজরার চোখ খুব সহজেই খুঁজে নেয় বনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাণীদের। অভিজ্ঞতার কারণে গাছপালা আর ঝোপঝাড়ের ফাঁক দিয়েও তাঁর দৃষ্টি চলে যায় অনেক দূর। চোখ যখন কোনো প্রাণীকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করে, তখনই সক্রিয় হয়ে ওঠে তাঁর ক্যামেরা।

চা–বাগানের সরু পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে গল্প করছিলাম আমরা। হঠাৎ দুজনই থেমে গেলাম। কাছের ঝোপ থেকে ভেসে এল খসখস শব্দ। মুহূর্তের জন্য একটি প্রাণীকে দেখতে পেয়েই কাজল হাজরা বলে উঠলেন, ‘ওটা চিতাবিড়াল!’ কিন্তু চোখের পলকেই প্রাণীটি মিলিয়ে গেল ঘন ঝোপের আড়ালে।

প্রথম সুযোগ হাতছাড়া হলেও হাল ছাড়েননি কাজল হাজরা। মনে মনে ঠিক করলেন, প্রাণীটির ছবি তুলেই ফিরবেন। এরপর শুরু হলো অপেক্ষা। দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে থাকার পর হঠাৎ আবার চোখের সামনে হাজির হলো সেই চিতাবিড়াল। এবার আর এক সেকেন্ডও দেরি করেননি তিনি। ক্যামেরার লেন্স তাক করে একটানা শাটার চাপতে থাকলেন। কিছুক্ষণ পর প্রাণীটি আবার জঙ্গলের ভেতর হারিয়ে গেল। ক্যামেরার ডিসপ্লেতে চোখ রাখতেই দেখা গেল দুর্লভ চিতাবিড়ালের কয়েকটি চমৎকার ছবি ধরা পড়েছে।

প্রায় চার বছর আগে লাউয়াছড়া বনে একবার চিতাবিড়ালের ছবি তুলেছিলেন বলে জানালেন ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার কাজল হাজরা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আগে চা–বাগান ও বনাঞ্চলে এ প্রাণী তুলনামূলক বেশি দেখা যেত, এখন খুব কম দেখা যায়। এমন বিরল বন্য প্রাণী ক্যামেরাবন্দী করতে পারলে সত্যিই অনেক ভালো লাগে।

চিতাবিড়াল মূলত নিশাচর প্রাণী। তবে ভোর ও সন্ধ্যায়ও এদের সক্রিয় দেখা যায়। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া চা-বাগানে

কাজল হাজরা বলেন, বনভূমি ধ্বংস, আবাসস্থল সংকোচন এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাত বৃদ্ধির ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে চিতাবিড়ালের সংখ্যা। তাই এ প্রাণীসহ অন্যান্য বন্য প্রাণীর নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

চিতাবিড়াল দেশের একটি দুর্লভ বন্য প্রাণী। এর ইংরেজি নাম লেপার্ড ক্যাট এবং বৈজ্ঞানিক নাম প্রাইওনেইলারাস বেঙ্গালেনসিস। আকারে এটি গৃহপালিত বিড়ালের মতো হলেও দেখতে অনেকটা চিতাবাঘের ক্ষুদ্র সংস্করণের মতো বলে জানান বাংলাদেশ বন্য প্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক সজল দেব। তিনি বলেন, সম্প্রতি একটি দুর্ঘটনায় আহত অবস্থায় একটি চিতাবিড়াল উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বন ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় চিতাবিড়ালসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে। এতে তারা আহত হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রাণও হারাচ্ছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এই বিরল প্রাণীটি আজ নানা কারণে হুমকির মুখে।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী চিতাবিড়াল নানা কারণে হুমকির মুখে। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া চা-বাগানে

সজল দেব জানান, প্রাণীটির দেহের দৈর্ঘ্য সাধারণত ৩৯ থেকে ৬৬ সেন্টিমিটার এবং লেজের দৈর্ঘ্য ১৭ থেকে ৩১ সেন্টিমিটার। ওজন তিন থেকে চার কেজি। অন্যান্য বুনো বিড়ালের তুলনায় এর পা তুলনামূলক লম্বা। দেহের ওপরের অংশ হালকা হলুদাভ এবং নিচের অংশ সাদাটে। সারা শরীরে অসংখ্য কালো ফোঁটা ও দাগ থাকে, যা ঘাড়ের কাছে এসে দুটি চওড়া ছোপে পরিণত হয়েছে।

চিতাবিড়াল মূলত নিশাচর প্রাণী। তবে ভোর ও সন্ধ্যায়ও এদের সক্রিয় দেখা যায়। সাধারণত একাকী জীবন যাপন করে এবং গাছে চড়া ও সাঁতার কাটতে বেশ দক্ষ। বড় কীটপতঙ্গ, পাখি ও ছোট মেরুদণ্ডী প্রাণী এদের প্রধান খাদ্য। বনাঞ্চল, গাছপালায় ঘেরা এলাকা, ঝোপঝাড়, তৃণভূমি ও গরান বনে এদের বসবাস। সাধারণত বড় গাছের কোটরে আশ্রয় নেয়।

প্রজননের ক্ষেত্রে স্ত্রী ও পুরুষ চিতাবিড়াল দীর্ঘমেয়াদি জোড়া গঠন করে। সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে এদের প্রজননকাল। প্রায় ৬০ থেকে ৭০ দিন গর্ভধারণের পর একটি স্ত্রী চিতাবিড়াল দুই থেকে চারটি শাবকের জন্ম দেয়। শাবকগুলো প্রায় ১৮ মাস বয়সে পূর্ণবয়স্ক হয়। আবদ্ধ পরিবেশে এদের গড় আয়ুষ্কাল প্রায় ১৩ বছর।