শরীয়তপুর ও বরিশাল

জয়ন্তী নদীতে সেতু নির্মাণের দাবি, দুর্ভোগে চার উপজেলার মানুষ

শরীয়তপুর ও বরিশাল জেলার মাঝখানে জয়ন্তী নদী। এ দুটি জেলার লোকজনকে সড়কপথে যাতায়াত করতে মাদারীপুর দিয়ে অতিরিক্ত পথ ঘুরে যেতে হয়। এ ভোগান্তি কমাতে জয়ন্তী নদীর ওপর দীর্ঘদিন ধরে একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন দুটি জেলার মানুষ। কিন্তু দাবি আর পূরণ হচ্ছে না।

তবে ওই সেতু নির্মিত না হওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে বরিশালের মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ এবং শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার মানুষ।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) মুলাদী কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সেতুটি নির্মাণ করা হলে শরীয়তপুর জেলা শহর থেকে বরিশাল জেলা শহরের দূরত্ব কমবে ১০ কিলোমিটার। শরীয়তপুর শহর থেকে মুলাদী উপজেলা শহরের দূরত্ব কমবে ৩৫ কিলোমিটার। গোসাইরহাট সদর থেকে বরিশাল সদরের দূরত্ব কমবে ৩০ কিলোমিটার। আর মুলাদী সদর থেকে শরীয়তপুর সদরের দূরত্ব কমবে ৩৫ কিলোমিটার। একই সঙ্গে বরিশাল থেকে ঢাকার সড়কপথের দূরত্ব কমবে ৩৫ কিলোমিটার।

জয়ন্তী নদী নৌযানে পারাপার। সম্প্রতি বরিশালের মুলাদী উপজেলার ভেদুরিয়া ঘাটে

মুলাদী সদর থেকে গোসাইরহাট উপজেলা সদরের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার। গোসাইরহাটের আবুপুরা ঘাট থেকে উপজেলা সদর পর্যন্ত পাকা সড়ক রয়েছে। এদিকে জয়ন্তী নদীর অপর পাড়ের মৃধারহাট ঘাট থেকে মুলাদী উপজেলা সদর হয়ে বরিশালের দিকে পাকা সড়ক রয়েছে। মাঝখানে প্রায় দুই কিলোমিটার নদীপথ। এখানেই সেতুটি নির্মাণের দাবি উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দুই প্রান্তে সড়ক থাকার পরও সেতুর অভাবে তাঁরা এর পুরো সুফল পাচ্ছেন না। নৌযানে নদী পার হয়ে সড়কপথে যেতে হচ্ছে। বর্ষায় কিংবা বৈরী আবহাওয়ায় এ যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের অনেক বাসিন্দা ঢাকায় যাতায়াতের জন্য গোসাইরহাট-শরীয়তপুর হয়ে ঢাকার পথ ব্যবহার করেন। তাঁদের অনেকে ট্রলার বা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় জয়ন্তী ও আড়িয়াল খাঁ নদী পার হয়ে গোসাইরহাটে আসেন। এরপর অটোরিকশায় শরীয়তপুর জেলা শহরে গিয়ে ঢাকাগামী বাসে ওঠেন। এতে সময় ও অর্থের পাশাপাশি বাড়ে দুর্ভোগ।

নদীর দুই প্রান্তেই সড়ক আছে, কিন্তু সেতু না থাকায় তাঁরা এই সড়কপথের সুফল পাচ্ছেন না। একটি সেতু এ অঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতি বদলে দিতে পারে।
দেলোয়ার হোসেন, মালয়েশিয়াপ্রবাসী, মুলাদীর বাসিন্দা

দুই বছর চলছিল ফেরি

২০১৫ সালে আবুপুরা-মৃধারহাট নৌপথে ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়েছিল। তখন বরিশাল শহর থেকে মৃধারহাট এবং শরীয়তপুর শহর থেকে আবুপুরা পর্যন্ত বাস চলাচলও শুরু হয়েছিল। দুই বছর পর ফেরি সার্ভিস বন্ধ হয়ে গেলে বাস সার্ভিসও বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ট্রলারই হয়ে ওঠে নদী পারাপারের প্রধান ভরসা।

গত ২১ আগস্ট গোসাইরহাটের আবুপুরা এবং মুলাদীর ভেদুরিয়া ও মৃধারহাট ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের মানুষ ঢাকায় যাওয়ার জন্য ট্রলারে জয়ন্তী ও আড়িয়াল খাঁ নদী পার হয়ে গোসাইরহাটের দিকে আসছেন। তাঁদের মধ্যে অসুস্থ রোগীও ছিলেন।

মুলাদীর তালুকদারহাট এলাকার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন মালয়েশিয়াপ্রবাসী। পাঁচ বছর পর গত ২১ আগস্ট তিনি দেশে ফেরেন। ঢাকার বিমানবন্দর থেকে ব্যক্তিগত গাড়িতে আবুপুরা ঘাটে এসে পরে ভাইয়ের সঙ্গে নৌকায় করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে জানান, সারা পথ উড়োজাহাজ ও গাড়িতে করে এলেন। বাড়ির কাছে এসে আবার নৌকায় নদী পার হচ্ছেন। নদীর দুই প্রান্তেই সড়ক আছে, কিন্তু সেতু না থাকায় তাঁরা এই সড়কপথের সুফল পাচ্ছেন না। একটি সেতু এ অঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতি বদলে দিতে পারে।

শরীয়তপুর শহর থেকে মুলাদী উপজেলা শহরের দূরত্ব কমবে ৩৫ কিলোমিটার। গোসাইরহাট সদর থেকে বরিশাল সদরের দূরত্ব কমবে ৩০ কিলোমিটার। আর মুলাদী সদর থেকে শরীয়তপুর সদরের দূরত্ব কমবে ৩৫ কিলোমিটার। একই সঙ্গে বরিশাল থেকে ঢাকার সড়কপথের দূরত্ব কমবে ৩৫ কিলোমিটার।
জয়ন্তী নদী নৌকায় পার হয়ে গন্তব্যে যাচ্ছেন লোকজন। সম্প্রতি বরিশালের মুলাদী উপজেলার ভেদুরিয়া ঘাটে

কৃষিপণ্য ও মাছ পরিবহন

মুলাদীর ভেদুরিয়া এলাকার কৃষক আবদুর রহমান বলেন, যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় জমিতে উৎপাদিত বিভিন্ন কৃষিপণ্য, বিশেষ করে সবজি কম দামে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে হয়। সেতু নির্মাণ করা হলে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে। তখন ঢাকার বাজারে কৃষিপণ্য বিক্রি করে বেশি লাভ করা সম্ভব হবে।

বরিশাল ও শরীয়তপুর জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলা নদীবেষ্টিত বলে জানান নদী পরিব্রাজক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও শরীয়তপুর জজকোর্টের আইনজীবী নুরুজ্জামান শিপন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এখানকার বাসিন্দাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতের জন্য নৌপথই ভরসা। এ অঞ্চলের মানুষেরা কৃষি ও মৎস্যকেন্দ্রিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। সেতুটি হলে পুরো দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি আরও চাঙা হবে।

ইঞ্জিনচালিত নৌকায় জয়ন্তী নদী পারাপার। সম্প্রতি বরিশালের মুলাদী উপজেলার ভেদুরিয়া ঘাটে

সেতুর প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে

এলজিইডির বরিশাল কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জয়ন্তী নদীর মুলাদীর মৃধারহাট-ভেদুরিয়া পয়েন্টে সেতু নির্মাণের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবিত সেতুটির দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৪৮০ মিটার এবং সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা।

এলজিইডির মুলাদী উপজেলা প্রকৌশলী মো. জিয়াউল হক বলেন, ছোট একটি সেতুর অভাবে বরিশালের তিনটি উপজেলা এবং শরীয়তপুরের একটি উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ ভোগান্তিতে আছে। জয়ন্তী নদীতে একটি সেতু নির্মাণের জন্য চেষ্টা করছেন। সেতু নির্মাণের একটি প্রকল্প প্রস্তাব অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। সেখান থেকে অনুমোদন পেলে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে।