
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি এখনো দগদগে সন্দ্বীপবাসীর মনে। সেই রাতে দ্বীপের ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ১৫ থেকে ১৮ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়েছিল দ্বীপের জনপদগুলো। বাসিন্দাদের অনেকেই হারিয়েছেন বাড়িঘর আর পরিবারের সব সদস্যকে। প্রবীণ দ্বীপবাসীর মধ্যে যাঁরা সে রাতে ঝড়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তাঁরা কেউই ভাবেননি দুর্যোগ থেকে বেঁচে যাবেন।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে গাছপালা ও কাঠের গুঁড়ি আঁকড়ে বেঁচে যাওয়ার বহু গল্প আছে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপকূলে। এর মধ্যে রহমত উল্যাহর গল্পটা একেবারেই ব্যতিক্রমী। ঝড়ে সৃষ্ট প্রবল জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছিলেন তিনি। তাঁর পাশে প্রবল স্রোতে সাঁতরে যাচ্ছিল একটি গরু। প্রাণে বাঁচতে তিনি ওই প্রাণীর লেজ আঁকড়ে ধরেন। গরুটির সঙ্গে ভেসে যান অনেকক্ষণ। একসময় বুঝতে পারেন গরুটি আর বেঁচে নেই। তখন একটা কাঠের গুঁড়ি পেয়ে সেটি ধরেন আর জ্ঞান হারান। জ্ঞান ফিরলে দেখেন পানি নেমে গেছে। মৃত গরুটি তাঁর থেকে অল্প দূরে কাদার ওপর পড়ে আছে।
সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের বাংলাবাজারের বেড়িবাঁধের বাইরে দাঁড়িয়ে ২৯ এপ্রিল রাতে বেঁচে যাওয়ার গল্প বলছিলেন ৬৫ বছরের রহমত উল্যাহ। তাঁর কথা বলার ফাঁকেই সেখানে জড়ো হন বিভিন্ন বয়সী কয়েকজন ব্যক্তি। তাঁদের মধ্যে তিন-চারজন প্রবীণ ব্যক্তিও সেই রাতে ঝড়ের মুখে পড়েছিলেন। সেই রাতে প্রাণে বেঁচে যাবেন, কেউই ভাবেননি তাঁরা।
রহমত উল্যাহ বলেন, ‘গা থেকে কোর্তা (জামা) খুলি লইবার মতো বাতাস ছিল রাইতভর। শেষ রাইতে আচমকা আসা ঢলের পানিতে কে কোথায় চলি গেছি, তা জানি না। মা-বাবা, ভাই-বোনসহ পরিবারের সাতজনই ভাসি গেছে। কেউরে আর জীবিত পাই নাই।’ ঘূর্ণিঝড়ের পর রহমতের আপন বলতে কেউ বেঁচে ছিলেন না। এক প্রতিবেশীর ঘরে গিয়ে থাকতে শুরু করেন তিনি। টুকটাক কাজ করে সেখানেই মিলত দুই বেলার খাবার। পরের বছর বিয়ে করে সংসার পাতেন। স্ত্রী আর ৯ সন্তান নিয়ে এখন বাংলাবাজার ঘাটের কাছেই বসবাস করছেন।
মনবিহারির সঙ্গে কথা হচ্ছিল বেড়িবাঁধের ভেতরের পুরোনো একটি তালগাছের নিচে দাঁড়িয়ে। তিনি হাত দিয়ে দেখিয়ে দেন তালগাছের কতটুকু পর্যন্ত পানি উঠেছিল। সাগর যেন সব পানি নিয়ে ছুটে এসেছিল তাঁর বাড়িতে! দুঃস্বপ্নের মতো জেঁকে ধরা সেই রাতে নিজের দুই সন্তানকে হারিয়েছেন মনবিহারি। হারিয়েছেন পাড়ার ৪৫ স্বজনকে।
৩৫ বছর আগের স্মৃতিচিহ্ন প্রকৃতি থেকে মুছে গেলেও স্বজন ও সম্পদ হারানোর বেদনার কথা ভুলতে পারেননি মনবিহারি জলদাস (৭৫)। তাঁর বাড়িটিই সাগরঘেঁষা সন্দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তের শেষ বাড়ি। যেটি পড়েছে সারিকাইত ইউনিয়নের চৌকাতলী মৌজায়। মনবিহারির সঙ্গে কথা হচ্ছিল বেড়িবাঁধের ভেতরের পুরোনো একটি তালগাছের নিচে দাঁড়িয়ে। তিনি হাত দিয়ে দেখিয়ে দেন তালগাছের কতটুকু পর্যন্ত পানি উঠেছিল। সাগর যেন সব পানি নিয়ে ছুটে এসেছিল তাঁর বাড়িতে! দুঃস্বপ্নের মতো জেঁকে ধরা সেই রাতে নিজের দুই সন্তানকে হারিয়েছেন মনবিহারি। হারিয়েছেন পাড়ার ৪৫ স্বজনকে। তিনি বলেন, ‘গায়ে কাঁটা দেয় এখনো। আমার হাতেই ধরা ছিল পাঁচ বছরের ছেলে গোবর্ধন। বাতাস এত তীব্র ছিল যে ছেলেটা ছুটে গেল চোখের পলকে। যেন উড়ি গেল। সাগরের জল আকাশে উড়ে আসছিল। আরেক ছেলে রাজধন। সেও কীভাবে ভাসি গেল, তা জানি না।’
‘গা থেকে কোর্তা (জামা) খুলি লইবার মতো বাতাস ছিল রাইতভর। শেষ রাইতে আচমকা আসা ঢলের পানিতে কে কোথায় চলি গেছি, তা জানি না। মা-বাবা, ভাই-বোনসহ পরিবারের সাতজনই ভাসি গেছে। কেউরে আর জীবিত পাই নাই।’রহমত উল্যাহ, ২৯ এপ্রিল ঝড়ে বেঁচে যাওয়া দ্বীপবাসী।
সেদিন দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে হু হু করে ১৫ থেকে ১৮ ফুট উঁচু পানির প্লাবন তীব্র বেগে ধেয়ে এসেছিল বলে জানান মনবিহারি। মুহূর্তে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঘরবাড়ি, গাছপালা, গবাদিপশু আর মানুষকে। মনবিহারি বলেন, ‘পাড়ার কিছু মানুষ ভয়ে উঁচু বেড়িবাঁধে গিয়ে ঠাঁই লয়। শেষ রাইতে হঠাৎ আসা ঢেউ তাঁদের কারে কোথায় নিয়ে ফেলেছে, তা জানতে পারি নাই। সকালে দেখি গাছের ডালে ডালে আটকে আছে মানুষের লাশ।’
কেয়ামত নেমেছিল সেই রাতে
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল মধ্যরাতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলে ক্যাটাগরি ফোর বা চার মাত্রার সাইক্লোন। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ধ্বংসের ছাপ রেখে যাওয়া এই ঝড়ের গতিবেগ ছিল অকল্পনীয়, ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার। এমন গতির কাছে যেকোনো কাঠামোই তুচ্ছ। প্রবল বাতাসের সঙ্গে ৬ মিটার; অর্থাৎ প্রায় ২০ ফুটের মতো জলোচ্ছ্বাস আছড়ে পড়েছিল চট্টগ্রাম–কক্সবাজার উপকূলে। এক রাতেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ। ঘরহারা হয়েছিলেন এক কোটির বেশি মানুষ। সদ্য স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে তখন বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। দেশের একটা অংশের অবকাঠামো, রেল, বিদ্যুৎ ও টেলিকমিউনিকেশন একেবারেই ভেঙে পড়েছিল। এর মধ্যে সন্দ্বীপ, উড়িরচর, মহেশখালী, কুতুবদিয়াসহ চট্টগ্রাম–কক্সবাজারের বিভিন্ন দ্বীপে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সরকারি তথ্য বলছে, সে রাতে সন্দ্বীপে প্রাণ হারিয়েছিলেন অন্তত ২৫ হাজার মানুষ। স্বজন হারিয়ে বেঁচে থাকা মানুষদের কাছে ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি এখনো দগদগে।
সাবেক সংসদ সদস্য ওবাইদুল হকের ভাতিজা নাসির উদ্দিন সন্দ্বীপের একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের হিসাবরক্ষক। ঘূর্ণিঝড়টি যেন তাঁদের বাড়ির চিহ্নটুকু মুছে দিয়েছিল। সেই দিনের কথা স্মরণ করে নাসির প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিভিন্ন গ্রন্থে কেয়ামতের বর্ণনা পাওয়া যায়। সেই রাতে আমাদের বাড়িসহ সন্দ্বীপের উত্তর-পূর্ব বেল্টে কেয়ামতই যেন নেমে এসেছিল। বাড়িতে তখন ছিল ছয়টি পরিবার, ছয়টি ঘর। বাড়ির ছয়টি ঘরের পাঁচটিই হুড়মুড়িয়ে ভেসে চলে যায়। সেই সঙ্গে ২৯ জন বাসিন্দাও। বলা যায়, বাড়ির বেশির ভাগ মানুষ এক লহমায় কোথায় যেন হারিয়ে গেল।’
সন্তোষপুর ইউনিয়নের মুনসুর (৬০) জানিয়েছেন, ৩০ এপ্রিল তিনি পাশের ইউনিয়নে বোনের বাড়িতে যাচ্ছিলেন। নিজের গ্রামের রাস্তাঘাট চিনতে পারছিলেন না। স্থানীয় সন্তোষপুর মাদ্রাসার সামনের রাস্তার দুই পাশে অগণিত লাশ। মানুষ আর গবাদিপশুর মৃতদেহ একসঙ্গে ভাসছে জলাবদ্ধ জমিতে। নারী-পুরুষ, শিশু আর বৃদ্ধের লাশ দেখতে দেখতে ক্লান্ত মুনসুরের পা চলছিল না সামনে। মুনসুর বলেন, ‘মনে হচ্ছিল স্বপ্নের ভেতরই কোনো অজানা মৃত্যুপুরী পার হচ্ছি।’
মুনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই দৃশ্য বর্ণনা করার মতো নয়। থেমে থেমে কানে আসছিল মানুষের আহাজারি। শত শত গাছ উপড়ে গেছে। কিছু গাছ দাঁড়িয়ে থাকলেও পাতার চিহ্ন ছিল না। রাস্তার দুই পাশে থই থই পানিতে ভাসছিল অগণিত লাশ। মানুষ, গরু-মহিষ, কুকুরের মৃতদেহ পানিতে ভাসছে। কেউ কেউ পানিতে নেমে উল্টিয়ে দেখছে লাশটি তাঁর স্বজনের কি না।’