
মরিচ্চাপ নদীর পাড়ে আশাশুনি উপজেলা সদর। সাতক্ষীরা জেলা শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২৪ কিলোমিটার। নদীর ওপর সেতুটি চাপড়া সেতু নামে পরিচিত। সেতুর এক পাশে চাপড়া গ্রাম, অন্য পাশে আশাশুনি উপজেলা সদর।
শুক্রবার সকালে সেতুর ওপর উঠতেই চোখে পড়ে নদীতীরের ভাঙনের ভয়াবহ চিত্র। কোথাও পাড় ধসে গেছে, কোথাও বসতঘরের অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। কোথাও আবার ঘরের দেয়ালে দেখা দিয়েছে ফাটল। নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা ঘরবাড়ি ও দোকানপাট দেখে বোঝা যায়, ভাঙন কতটা কাছে চলে এসেছে।
চাপড়া সেতু থেকে আশাশুনি বাজারের দিকে তাকালেও ভাঙনের চিত্র স্পষ্ট। নদীর পাড়ের মাটি ধসে কোথাও খাড়া হয়ে আছে। কোথাও বাঁশ ও বালুর বস্তা দিয়ে পাড় রক্ষার চেষ্টা চলছে। নদীর তীরঘেঁষা আশাশুনি বাজারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িগুলোও এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে।
সেতু পার হয়ে নদীর তীরে ভাঙনকবলিত একটি বাড়িতে গিয়ে কথা হয় মিনারা বেগমের সঙ্গে। গত এক বছরে তাঁর বাড়ির তিনটি ঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। মিনারা জানান, প্রায় ১০ বছর আগে তাঁর স্বামী আরিফুল ইসলাম সরদার বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। তখন বাড়ি থেকে নদীর পাড় ছিল ২০ হাতের বেশি দূরে। এখন ভাঙতে ভাঙতে নদী এসে উঠানের কাছে ঠেকেছে।
মিনারা বেগম বলেন, ‘আমাগের পরিবারে আটজন মানুষ। স্বামী রাজমিস্ত্রি আর শ্বশুর দিনমজুরের কাজ করেন। অনেক কষ্ট কইরে নিজেরাই ইটের এই বাড়িডা বানাইছি। প্রায় দুই বছর আগে নদীডা খননের পর তোলা বালু-মাটি বাড়ির পাশে দেওয়া হইছিল। কিন্তু বৃষ্টি আর জোয়ারের টানে সেই মাটি ধুইয়ে আবার নদীতে চইলে যাচ্ছে। গত এক বছরে বাড়ির তিনটি ঘর নদীতে চইলে গেছে। এখন চোখের সামনে বাড়িডা নদীতে যাচ্ছে, আমাগের কিছুই করার নেই।’
শুধু মিনারাদের বাড়ি নয়, নদীর পাড়ের আরও অনেক ঘরবাড়ি এখন ঝুঁকিতে। স্থানীয় বাসিন্দা শামীম সরদার বলেন, ‘প্রায় দুই বছর আগে নদীটি খনন করা হয়েছে। আগে নদী বেশ দূরে ছিল। খননের সময় চর কেটে নদীটাকে এদিকে চাপিয়ে দেওয়ায় স্রোতের গতিপথও বদলে গেছে। এখন সেই স্রোত সরাসরি আশাশুনি বাজারের দিকে আঘাত করছে। এ কারণে বাজারসহ নদীর পাড়ের ঘরবাড়ি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।’
ভাঙন ঠেকাতে নদীর তীরে অল্প কিছু জায়গায় জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। কোথাও পুরোনো বালুর বস্তা পড়ে আছে, কোথাও নতুন করে পাড় রক্ষার চেষ্টা চলছে। তবে স্থানীয় লোকজন বলছেন, ভাঙনের তুলনায় এই প্রতিরোধব্যবস্থা খুবই সীমিত।
আশাশুনি বাজারে প্রায় ২৩ বছর ধরে চায়ের দোকান করেন মোহাম্মদ আবদুল হাই। তাঁর চোখের সামনেই নদী ধীরে ধীরে বাজারের দিকে এগিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, ‘নদী খননের আগে নদীর পাড় আমার দোকান থেকে বেশ দূরে ছিল। এখন নদী এক্কেবারেই ঘরবাড়ির কাছে চলে আইছে।’
ভাঙনের কারণ হিসেবে আবদুল হাই বলেন, ‘খননের সময় নদীর পাড়ের গোড়ার মাটি কেটে ওপরে তুলে দেওয়া হয়েছে। জোয়ারের পানিতে সেই মাটি ধুয়ে গোড়া ফাঁকা হয়ে পাড় ভাঙছে। মূল নদী আগে ওই পাশে ছিল, গতিপথ কেটে এদিকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এপাশের ভাঙন ঠেকাতে ঠিকমতো মাটি দেওয়া হয়নি।’
ভাঙনে নিজের ঘরও ঝুঁকিতে পড়েছে জানিয়ে আবদুল হাই বলেন, ‘দুই বছর ধরে শুনতেছি বস্তা দেবে, পাড় রক্ষার কাজ হবে। কিন্তু তেমন কাজ হয়নি। এখন ঘরে ফাটল ধরিছে, জোয়ারের পানি ঘরের ভেতরেও ঢোকে। একটু এদিক-ওদিক হলিই ঘরডা নদীতে চলি যাবে। প্রশাসনের লোকজন অনেকবার আইসে দেখে গেছেন, কিন্তু কাজের কাজ কিচ্ছু হইনি।’
আমাদের চলাচলের পথটাও নদীতে চলে গেছে। উপজেলার ইউএনও আমার দুরবস্থা দেখে ঘরের চাল মেরামতের জন্য কয়েকটি টিন দিয়েছিলেন। এখন সেই টিনের ঘরটিও নদীভাঙনের মুখে।নাজমা বেগম, মানিকখালী এলাকার বাসিন্দা
নদীতীরবর্তী মানিকখালী এলাকার বাসিন্দা নাজমা বেগম বলেন, ‘নদীভাঙনে আমাদের চলাচলের পথটাও নদীতে চলে গেছে। উপজেলার ইউএনও আমার দুরবস্থা দেখে ঘরের চাল মেরামতের জন্য কয়েকটি টিন দিয়েছিলেন। এখন সেই টিনের ঘরটিও নদীভাঙনের মুখে। নদীর তীরে মজবুত বাঁধ না দিলে এখানে থাকা সম্ভব হবে না। অন্য কোথাও যাওয়ার মতো জমিও নেই।’
আশাশুনি বাজার ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ভাঙন ঠেকাতে নদীর তীরে অল্প কিছু জায়গায় জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। কোথাও পুরোনো বালুর বস্তা পড়ে আছে, কোথাও নতুন করে পাড় রক্ষার চেষ্টা চলছে। তবে স্থানীয় লোকজন বলছেন, ভাঙনের তুলনায় এই প্রতিরোধব্যবস্থা খুবই সীমিত।
নদীভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি নিয়ে গত বুধবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি-কালীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মুহাদ্দিস রবিউল বাশার। সেখানে আশাশুনির নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শ্যামানন্দ কুণ্ডু বলেন, ‘আমাদের উপজেলার সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি নদীভাঙন। মরিচ্চাপ নদীর তীর ছাড়াও বুধহাটা, কাকবাসিয়া, কুড়িকাহনিয়া ও তেয়ারডাঙায় ভাঙন রয়েছে। আশাশুনি বাজারসংলগ্ন এলাকায় কিছু জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে, তবে বরাদ্দ কম হওয়ায় কাজের পরিমাণও কম। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে একাধিকবার কথা বলেছি। আমরা চেষ্টা করছি, আশা করছি দ্রুত সমাধানমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের শিডিউল ও ডিজাইন অনুযায়ী মরিচ্চাপ নদী পুনঃখনন করা হয়েছে বলে জানান সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী আবদুল আলিম। তিনি বলেন, ‘এখন ভাঙনকবলিত নদীর তীরে জিও ব্যাগ প্লেসিংয়ের কাজ চলছে। বৃষ্টির কারণে কাজ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। আপৎকালীন জরুরি কাজ হিসেবে প্রায় ২০০ মিটার এলাকায় কাজ ধরা হয়েছে। তবে এখনো নির্দিষ্ট বরাদ্দ চূড়ান্ত হয়নি। জরুরি কাজের জন্য চাহিদা দেওয়া হলেও অনেক সময় বরাদ্দ পাওয়া যায় না। তখন ঠিকাদারকেও কাজ করাতে সমস্যা হয়।’
আবদুল আলিম জানান, শুধু ২০০ মিটার এলাকায় কাজ করলে পুরো সমস্যার সমাধান হবে না। মরিচ্চাপ নদীর ওই এলাকায় প্রায় ৬০০ মিটার জায়গায় কাজের জন্য চাহিদা দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী বাকি অংশেও কাজ করা যাবে।