
পৌষসংক্রান্তি এলেই মৌলভীবাজারের শেরপুরে প্রাণ ফিরে পায় শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটির বাস্তব রূপ যেন এই আয়োজন। শুধু মাছকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ মেলা আজ আর কেবল কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি স্থানীয় মানুষের আনন্দ, উৎসব ও মিলনমেলার নাম।
পৌষসংক্রান্তির আগের সন্ধ্যা থেকেই শুরু হয় মাছ নিয়ে কোলাহল। সারা রাত ধরে চলে পাইকারি কেনাবেচা, পরদিন চলে খুচরা বিক্রি। দুই রাত ও এক দিনব্যাপী এ মেলা বছরে মাত্র একবারই বসে।
কুশিয়ারা নদীপাড়ের মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শেরপুর এলাকায় মেলাটির আয়োজন করা হয়। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা থেকে মাছের মেলা শুরু হয়েছে। রাতে প্রধানত পাইকারি কেনাকাটা চলে। আজ মঙ্গলবার সারা দিন ধরে খুচরা বিক্রি চলছে। আগামীকাল বুধবার সকাল পর্যন্ত এভাবেই মেলার আনুষ্ঠানিকতা চলবে। মাছের পাশাপাশি মেলায় রয়েছে খেলনা, রকমারি খাবার, খই-মোয়া-গজা, কৃষিপণ্য ও ঘরসংসারের নানা সামগ্রী।
স্থানীয় মানুষ, মৎস্য ব্যবসায়ী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, সন্ধ্যার পর থেকে লোকসমাগম বাড়তে থাকে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছোট-বড় ট্রাকসহ নানা যানবাহনে করে মাছ নিয়ে বিক্রেতারা মেলায় আসেন। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আড়তগুলোয় দরদাম হাঁকাহাঁকিতে জমে ওঠে কেনাবেচা। এখান থেকে মাছ ছড়িয়ে পড়ে জেলার ছোট-বড় হাটে।
সোমবার রাতে দেখা গেছে, ডালায় সাজানো মাছ ঘিরে ভিড় করছেন অনেকে। কেউ ঘুরে ঘুরে দেখছেন, কেউ ছবি তুলছেন, কেউ মাছের সঙ্গে সেলফি তুলছেন। পছন্দ হলে দরদাম করে কিনে নিচ্ছেন।
মাছ বিক্রেতা আরবেশ মিয়া বলেন, তিনি প্রায় ১০ লাখ টাকার মাছ নিয়ে মেলায় এসেছেন। প্রায় দুই মণ ওজনের একটি বাঘাইড় মাছের দাম তিনি চাইছেন তিন লাখ টাকা। আরেক বিক্রেতা মুহিবুর রহমান বলেন, মানুষ কিনছে কম। সেলফি তুলছে বেশি। প্রায় ১২ লাখ টাকার মাছ নিয়ে তিনি মেলায় এসেছেন।
শেরপুর মাছের মেলা মূলত স্থানীয় হাওর-বাঁওড় ও নদ-নদীর মাছকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। এখনো স্থানীয় মাছের প্রতিই ক্রেতাদের আকর্ষণ বেশি। বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার হাকালুকি, কাউয়াদীঘি, হাইল হাওরসহ বিভিন্ন হাওর এবং কুশিয়ারা নদীসহ অন্যান্য নদ-নদীর মাছই মেলায় আসা ক্রেতাদের প্রধান চাহিদা। এবারও স্থানীয় মুক্ত জলাশয়ের মাছ আলাদা করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। তবে হাওর–নদী ভরাটসহ নানা কারণে আগের তুলনায় স্থানীয় মাছের সরবরাহ কমেছে। দামও বেড়েছে, যা অনেক ক্রেতার নাগালের বাইরে। ফলে মেলায় চাষের মাছের সংখ্যাই বেশি।
মেলায় দেখা গেছে বাঘাইড়, আইড়, বোয়াল, রুই, কাতলা, মৃগেল, চিতল, কালবাউশ, গ্রাসকাপসহ নানা জাতের ছোট-বড় মাছ। অনেক মাছই ছিল একেবারে তরতাজা, কিছু মাছ নড়াচড়াও করছিল। বিক্রেতারা বলেন, শেরপুরের মাছের মেলাকে সামনে রেখে সারা বছর ধরেই মাছ সংরক্ষণ করা হয়। মেলার কয়েক দিন আগে শুরু হয় মাছ ধরা ও সংগ্রহ। কোনো কোনো মাছকে ডোবা কিংবা নৌকায় পানির মধ্যে রাখা হয়।
মাছ ব্যবসায়ী শহীদ মিয়া বলেন, ‘এ মেলা ময়মুরব্বিরা চালাইছইন। আমিও মাছ বেচরাম, আমার ছেলেও বেচবো।’
মাছের দাম নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সিলেট থেকে আসা শাহীন আহমদ বলেন, তিনি প্রায় চার কেজি ওজনের একটি বোয়াল সাড়ে চার হাজার টাকায় কিনেছেন। দাম তাঁর কাছে সুলভ মনে হয়েছে। অন্যদিকে মৌলভীবাজার শহরের চাকরিজীবী মো. ইসমাইলের মতে, দাম কিছুটা বেশি; রাত গড়ালে কমতে পারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১০০ বছর আগে পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মনুমুখ ইউনিয়নের মনুপাড় এলাকায় এই মাছের মেলা শুরু হয়েছিল। পরে মনু নদের ভাঙনে বাজারের পরিসর ছোট হয়ে গেলে মেলাটি শেরপুরে স্থানান্তর করা হয়। অর্ধশতাধিক বছর ধরে এখানেই এ মেলা বসছে।