
সিলেটসহ সারা দেশের গেজেটভুক্ত পাথরকোয়ারিগুলোর ইজারা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। গত সোমবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরিনা আফরিন মুস্তাফা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা। তাঁদের আশঙ্কা, ইজারাপ্রথা আবার চালু হলে কোয়ারি ও আশপাশের এলাকায় প্রাণ ও প্রকৃতির ব্যাপক ক্ষতি হবে। বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক শাহ সাহেদা আখতার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুমনকুমার দাশ
২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ও ৮ জুন সিলেটসহ সারা দেশের গেজেটভুক্ত পাথরকোয়ারি থেকে পাথর, বালু, মাটিসহ সব কোয়ারির ইজারা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এর পর থেকে এসব কোয়ারিতে পাথর, বালু ও মাটি উত্তোলন সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ছিল। এখন ইজারা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসায় কী কী ক্ষতি হতে পারে?
শাহ সাহেদা: পাথর উত্তোলন করে সিলেটের প্রকৃতি–পরিবেশ কতটুকু বিপর্যস্ত করা হয়েছে, সেটা নতুন করে বলার কিছু নেই। পাথরকোয়ারিই শুধু নয়, মাঠ, বনজঙ্গল, পাহাড়-টিলা, এমনকি ঘরবাড়ির আশপাশ থেকেও পাথর তোলা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। তবে একটি বিষয় মনে করিয়ে দিতে চাই, যে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ও ৮ জুন সিলেটসহ দেশের পাথরকোয়ারিগুলোর ইজারা প্রদান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, এখন সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা আত্মঘাতী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের যে অংশটুকু অবশিষ্ট আছে, সেটা শেষ হবে। পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে প্রাণহানির পুরোনো ঘটনা আবারও ঘটতে শুরু হয়েছে। প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ, এমনকি টেকসই উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সিলেটের পর্যটনশিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা গত দু–তিন বছরে একটু একটু করে ফিরতে শুরু করেছিল।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর টানা কয়েক মাস প্রকাশ্যে সিলেটের পাথরকোয়ারি থেকে পাথর ও বালু লুট করা হয়। প্রশাসন তো তা ঠেকাতে সেই অর্থে কোনো ভূমিকা রাখেনি বলে অভিযোগ আছে। কত টাকার পাথর এ সময়ে লুট হয়েছে। কিংবা সার্বিক বিষয়ে কী বলবেন?
শাহ সাহেদা: এ বিষয়ে আমি আগেও বিভিন্ন সময়ে বলেছি, গত ৫ আগস্টের পর লুটপাট হয়েছে কয়েক দিন। বাকি সময়ে প্রকাশ্যে অবৈধভাবে ব্যবসা চলে আসছে। এটা সত্যি, প্রশাসনের কার্যকর কোনো ভূমিকা ছিল না, এখনো নেই। আমরা বেলার পক্ষ থেকে সব সময়ই জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছি, কিন্তু কিছুই হয়নি। যদিও এটা কর্তৃপক্ষ হিসেবে তাদের কাজেরই অংশ।
আর কত টাকার পাথর লুট হয়েছে, টাকার হিসাবে তা বলতে পারব না। জেলা কিংবা উপজেলা প্রশাসন থেকেও কেউ কিন্তু আমাদের এ তথ্য দিতে পারেননি। আমরা সংবাদমাধ্যমে শত কোটি টাকার যে ক্ষতির হিসাব পাই, সে জায়গা থেকে যদি বলি, তাহলে বলব, প্রশাসনের উচিত সেটার হিসাব প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করা। আর এসব ক্ষয়ক্ষতি ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের সম্পূর্ণ দায়ভারও তাদের। এ জন্য জবাবদিহির প্রয়োজন।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে আপনাদের এখনকার চিন্তাভাবনা কী? কিংবা আপনার কোনো পরামর্শ আছে?
শাহ সাহেদা: আমরা আমাদের কাজ একইভাবে চালিয় যাব। পরিস্থিতির প্রয়োজনে যা করার, বেলা সেটিই করবে। আমাদের পরামর্শ কী, সেটা বলার আগে একটি বিষয় বলি, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ কর্তৃক যে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, অর্থাৎ সিলেটে পাথর উত্তোলনের কারণে প্রাণহানি ও পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয়ের বিষয়টি ভেবে ২০২০ সালের ১৮ ফ্রেব্রুয়ারি ও ৮ জুন সিলেটসহ সারা দেশের পাথর, সিলিকা বালু ও সাদা মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে এমন কী এর উন্নতি ঘটেছে যে সে সিদ্ধান্ত বাতিল করা হলো। আপনারা জানেন, পাথর উত্তোলনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হলো, কমিটি ২০২২ ও ২০২০ সালে দুই দফা কোয়ারিগুলো পরিদর্শন করে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত এসবের কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। তাহলে এখন অবস্থার কী উন্নতি হলো যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ নিজের সিদ্ধান্ত বাতিল করল? অতীতে দেখেছি, বিএমডির ভুলের কারণে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শাহ আরফিন টিলাকে পাথরকোয়ারি বানিয়ে টিলাকে শেষ করা হয়েছে। তাই আমার এবং আমাদের একটাই পরামর্শ, পাথরকোয়ারি ইজারা বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল থেকে সরকারের সরে আসা উচিত।
আপনাকে ধন্যবাদ।
শাহ সাহেদা: প্রথম আলোর পাঠকদেরও ধন্যবাদ।