মই বেয়ে তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদ থেকে নামছেন এক নারী যাত্রী। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে জামালপুরের ইসলামপুর রেলস্টেশনে
মই বেয়ে তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদ থেকে নামছেন এক নারী যাত্রী। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে জামালপুরের ইসলামপুর রেলস্টেশনে

আ জার্নি বাই ‘ঈদের ট্রেন’, ঢাকা থেকে জামালপুর

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জগামী তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনের ‘ত’ বগিতে আসন। গতকাল বৃহস্পতিবার ছিল ঈদযাত্রা। হিসাব অনুযায়ী বগিটি একেবারে পেছনের দিকে থাকার কথা। কমলাপুর রেলস্টেশনে খুঁজে পেতেও তেমন বেগ পোহাতে হলো না। হাতে সময় ছিল পর্যাপ্ত। তবে ধন্দে পড়লাম বগির দরজায় গিয়ে। সেখানে পা ফেলার মতো সামান্য জায়গাও নেই। নারী, শিশু, পুরুষ, বৃদ্ধ-নির্বিশেষে সবার ঠাসাঠাসি অবস্থা। টিকিটের আসন পর্যন্ত পৌঁছানোটা রীতিমতো দুরাশা।

অনেক চেষ্টায় ট্রেনের দরজায় এক পা রাখার জায়গা মিলল, তা–ও ঠেলেঠুলে ঢুকেছিলাম বলে। এবার এক পা বগিতে, আরেক পা দরজার বাইরে। ধীরে ধীরে শরীরটা বগির মূল কাঠামোতে নিতে পারলেও পিঠের ব্যাগটা তখনো বাইরে। হঠাৎ ব্যাগটা সজোরে টেনে কেউ দৃষ্টি ফেরালেন। প্ল্যাটফর্ম থেকে আকুতি জানালেন, তাঁদের দুজনকে যেন বগিতে ওঠার সুযোগ দিই, তাঁদের কাছে টিকিট আছে।

আমি নিজেই যেখানে অসহায়, তাঁদের আর কী সদুত্তর দেব। দায়িত্বরত ব্যক্তিরা অসহায়ের মতো তাকিয়ে দেখছিলেন, যেন কিছুই বলার নেই—কিছুই করার নেই৷ অনেক চেষ্টার পর আশাহত হয়ে একজন বললেন, ‘হাইরে, এক হাজার টাকায় বেলেকে টিকেট কিইন্নাও ট্রেনে উঠতে পারতাছি না।’

একপর্যায়ে নিরুপায় হয়ে ওই দুই যাত্রী চললেন নিজ আসনসংলগ্ন জানালার দিকে। একজন আরেকজনকে জানালা দিয়ে ঠেলে ভেতরে ঢোকালেন। শেষ জনকে সহায়তা করলেন কোনো এক দয়ালু সহযাত্রী।

আমি তখনো ট্রেনের টয়লেটের হাতলে ঝুলে এসব দেখছি! হঠাৎ সামনে থাকা দুজন নারী উঠে দাঁড়ালেন। তাঁরা এতক্ষণ টয়লেটের সামনে বসা ছিলেন। গলায় আকুতি নিয়ে আশপাশের সবার উদ্দেশে এক নারী বললেন, ‘ভাই, আঙ্গোরে ইকটু নামতে দেন। এম্নে যাওন সম্ভব না। দুম বন্ধ হইয়া মইরা যামু, এর চেয়ে জ্যাম ঠেইল্লা বাসে যামু।’

নারী দুজন নেমে যেতেই দেখলাম আর মাত্র দুই থেকে তিন হাত দূরে আমার আসন নম্বরটি। ঠিক করলাম, যেভাবেই হোক আসন পর্যন্ত যেতে হবে। আসন পর্যন্ত যেতে দেওয়ার কথা বলতেই ভেতর থেকে কেউ বলে উঠলেন, ‘আমরাই তো চ্যাপটা হইতাছি, আপনে এদ্দুর আইবেন ক্যামনে?’

ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে ততক্ষণে। ঘড়িতে তখন সকাল ৮টা ছুঁই ছুঁই, যদিও ট্রেন ছাড়ার কথা ছিল সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে।

কথা বলে জানা গেল, আপত্তি তোলা এসব যাত্রীর অধিকাংশের টিকিট নেই, কপালের নাম করে ট্রেনে উঠে পড়েছেন। কেউ কেউ উঠে বসেছেন ছাদে। সেখানেও গাদাগাদি অবস্থা। আর ভেতরে থাকা যাত্রীরা এটা ভেবে নিজেদের আশ্বস্ত করছিলেন, তাঁদের অন্তত ছাদ থেকে পড়ে হতাহত হওয়ার ঝুঁকি নেই। এ কারণে টয়লেটে দাঁড়িয়ে যেতেও কোনো সমস্যা নেই। ময়মনসিংহ পর্যন্ত টয়লেটের ভেতর ঠাঁই নিয়েছিলেন অন্তত তিনজন নারী যাত্রী।

সামনের যাত্রীদের অনেক বুঝিয়ে, আকুতি-মিনতির পর নিজ আসন অবধি যাওয়ার সুযোগ পেলাম। একরকম পায়ে পায়ে পাড়া দিয়ে আসনের দিকে এগোতে হলো।

মানুষের গা ঘেঁষে ঘেঁষে আর গাটরি-বোঁচকার চাপে আটকে যাচ্ছি। তবে সবার হাতে হাতে ভর করে মাথার ওপর দিয়ে ব্যাগটা এগিয়েছে নিমিষেই। সব মিলিয়ে একেবারে কাহিল অবস্থা। এই অবস্থায় নিজ আসনে গিয়ে যে একটু আয়েশ করে বসব, সেটারও উপায় নেই। আমার আসনে থাকা টিকিটবিহীন যাত্রী ভাইটিকে ওঠাতে গিয়ে আরেক যুদ্ধ। তাঁর কাছে নানাভাবে প্রমাণ করতে হলো, আসনটি আসলেই আমার।

কোনোরকমে বসলাম। তবে ব্যাগ রাখার মতো ফাঁকা জায়গা নেই। একমাত্র কোলই শেষ ভরসা। ব্যাগের ভারে বিরক্ত হয়ে আসনসংলগ্ন জানালার কাচ খোলার চেষ্টা করছিলাম। দেখি এটির শাটার লকড, দুই-তিনজনে টেনেও তোলা যাচ্ছে না।

বিষয়টি খেয়াল করে পেছনের আসনে থাকা মুরব্বি হেয়ালির সুরে বললেন, ‘তোমার কপাল ভালা, জানলা দিয়া বাইরের কেউ ঢুকতে পারত না।’

ওই বৃদ্ধর কথাই সত্যি হলো। প্রমাণ মিলল, বিমানবন্দর রেলস্টেশনের ঠিক আগে আগে। আমার সামনের আসনের যাত্রী নিজ পাশের জানালার শাটার নামিয়ে দিলেন। ট্রেনটি থামার মিনিট দুই পর সেই জানালায় কড়া নাড়লেন এক নারী যাত্রী। সঙ্গে ছিল এক কিশোরী। কিন্তু বগির ভেতরে আসনে বসা যাত্রীটি কিছুতেই শাটার খুললেন না৷

এরপর পরিবারটির এক পুরুষ সদস্যের হুমকিতে কাজ হলো। অনেক চেষ্টার পর শাটার উঠল। ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার আশঙ্কার মধ্যেও ঝুঁকি নিলেন ওই নারী আর কিশোরী। বগিতে ঢুকলেন জানালা দিয়েই। এটিসহ পুরো ট্রেনের ভিড় আর ভোগান্তির দৃশ্য ধারণ করছিলেন প্ল্যাটফর্মে থাকা কেউ কেউ৷

বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে ছাড়ার পর বগির যাত্রীদের সবাই যেন হাঁপ ছাড়লেন, যাক তেমন যাত্রী ওঠার সম্ভাবনা নেই।

কিন্তু সময় যত গড়াল, ততই বাড়তে থাকল গাদাগাদি, মানুষের হাঁসফাঁস আর অস্থিরতা। এদিক-ওদিক থেকে ভেসে আসতে লাগল মেজাজ হারানো মানুষের চড়া গলা, শিশুদের কান্না।

এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা লেট করে বেলা আড়াইটার দিকে পৌঁছালাম গন্তব্য জামালপুরের ইসলামপুর রেলস্টেশনে। প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনের দিকে তাকাতেই একটি কথা মনে এল, এ আমার ট্রেন না। যদি হতো তাহলে নিশ্চয় এমন সব তিক্ত অভিজ্ঞতা হতো না।