সাভার থানা ছাত্রদলের সহসভাপতি মোনারুল ইসলাম বকসী
সাভার থানা ছাত্রদলের সহসভাপতি 
মোনারুল ইসলাম বকসী

ছাত্রদল নেতার লাশ নিয়ে থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ

‘ও বাবা, বাবারে। তোক মারলে বাবা পুলিশেরে। এই পীরগাছার পুলিশে মারলে বাবা। টাকা খায়া মারলে বাবাক।’ আজ শনিবার সকালে পীরগাছা থানার সামনে অ্যাম্বুলেন্সে থাকা ছেলের মরদেহ জড়িয়ে ধরে এভাবেই বিলাপ করছিলেন জাফর আলী বকসী। তাঁর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে থানার সামনের পরিবেশ। একপর্যায়ে স্বজন ও পাড়া–প্রতিবেশীরা থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন।

নিহত যুবকের নাম মোনারুল ইসলাম বকসী (২৯)। তিনি সাভার থানা ছাত্রদলের সহসভাপতি ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশের অভিযানে সময় ঢাকার সাভারে বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) আবাসিক ভবনের ছাদ থেকে পড়ে তিনি মারা যান। তাঁর বাবা জাফর আলী প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তারক্ষী। সেখানকার আবাসিক ভবনে বাবার ফ্ল্যাটে থাকতেন মোনারুল। তাঁদের গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জের দক্ষিণ হাতিবান্ধায়।

আজ সকালে আমাদের সহযোদ্ধা মোনারুলের লাশ নিয়ে তাঁর পরিবার আসেন। আমরা চাই তাঁর মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, কারা জড়িত, তা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বের করে বিচার করা হোক। প্রকৃত অপরাধী যেন ছাড় না পায়, আবার সাধারণ মানুষও যেন হয়রানির শিকার না হয়।
মোফাচ্ছিরুল ইসলাম, সদস্যসচিব, পীরগাছা উপজেলা ছাত্রদল

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পীরগাছার এক কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার সাধারণ ডায়েরির (জিডি) পরিপ্রেক্ষিতে মোনারুলদের ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়েছিলেন সাভার মডেল থানা ও রংপুরের পীরগাছা থানার একদল পুলিশ সদস্য। তাঁদের কাছে তথ্য ছিল নিখোঁজ কিশোরী ফ্ল্যাটটিতে অবস্থান করছে। এ বিষয়ে মোনারুলের বাবার সঙ্গে পুলিশের কথাবার্তার এক পর্যায়ে ছাদ থেকে ভারী কিছু পড়ার শব্দ পাওয়া যায়। নিচে গিয়ে মোনারুলের নিথর দেহ পাওয়া যায়। রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পুলিশ।

ছাত্রদল নেতা মোনারুলের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স সামনে রেখে থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন স্বজ্ন ও পাড়া প্রতিবেশীরা। শনিবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে রংপুরের পীরগাছা থানার সামনে

গতকাল শুক্রবার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মোনারুলের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে সাভার মডেল থানা–পুলিশ। এরপর লাশ গ্রামের বাড়ি দক্ষিণ হাতিবান্ধা গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আজ শনিবার জোহরের নামাজ শেষে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

মোনারুলের লাশ বাড়ি নেওয়ার পথে সকাল আটটার দিকে পীরগাছা থানার সামনে থামানো হয় অ্যাম্বুলেন্স। খবর পেয়ে ১০–১২ কিলোমিটার দূরের মোনারুলদের গ্রামের দেড় শতাধিক মানুষ পীরগাছা থানার সামনে এসে বিক্ষোভ করেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে ওই কিশোরীর বাবা মিন্টু পুলিশসহ আমার ভাইকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছে। ছাদে আমার ভাইয়ের সঙ্গে হয়তো মিন্টুর কথা–কাটাকাটি হইছে, সে ধাক্কা দিয়ে আমার ভাইকে নিচে ফেলায় দিছে। নিচে নেমে বলছে তাড়াতাড়ি হাসপাতাল নিয়া যান। পরে পুলিশসহ তাঁরা চলে যান, কিন্তু ভাইকে আমরা বাঁচাতে পারি নাই।
মমদেল হোসেন বকসী, নিহত মোনারুলের ভাই

পীরগাছা উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মোফাচ্ছিরুল ইসলাম বলেন, ‘আজ সকালে আমাদের সহযোদ্ধা মোনারুলের লাশ নিয়ে তাঁর পরিবার আসেন। আমরা চাই তাঁর মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, কারা জড়িত, তা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বের করে বিচার করা হোক। প্রকৃত অপরাধী যেন ছাড় না পায়, আবার সাধারণ মানুষও যেন হয়রানির শিকার না হয়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পীরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেলিম মালিক মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘তাঁরা লাশ নিয়ে থানায় এসেছিল, কিছু কথা জিজ্ঞেস করার জন্য আসছিল। আমাদের থানা–পুলিশ কী কারণে সাভারে গেছি? কীভাবে গেছি? কী তথ্য–উপাত্ত? কারা কারা ছিল? এগুলোর বিষয়ে তাঁদের কিছু জিজ্ঞাসা ছিল। পরে লাশ নিয়ে আবার চলে গেছে।’

মোনারুলের স্বজনদের অভিযোগ, তাঁকে পরিকল্পিতভাবে ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, নিখোঁজ কিশোরীর সঙ্গে মোনারুলের এক ভাগনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাঁরা স্বেচ্ছায় বিয়ে করে সাভারে অবস্থান করছিলেন।

মোনারুলের ভাই মমদেল হোসেন বকসীর অভিযোগ, কিশোরীকে উদ্ধারে পুলিশের সঙ্গে তাঁর বাবা ও আরও একজন ব্যক্তি সাভারে যান। তাঁদের একজন পুলিশের পোশাক পরা ছিলেন। তাঁর দাবি, ছাদে মোনারুলের সঙ্গে কথা–কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেওয়া হয়।

মমদেল হোসেন বলেন, ‘পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে ওই কিশোরীর বাবা মিন্টু পুলিশসহ আমার ভাইকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছে। ছাদে আমার ভাইয়ের সঙ্গে হয়তো মিন্টুর কথা–কাটাকাটি হইছে, সে ধাক্কা দিয়ে আমার ভাইকে নিচে ফেলায় দিছে। নিচে নেমে বলছে তাড়াতাড়ি হাসপাতাল নিয়া যান। পরে পুলিশসহ তাঁরা চলে যান, কিন্তু ভাইকে আমরা বাঁচাতে পারি নাই।’

থানা সামনের অবস্থান নেওয়া মোনারুলের স্বজন ও পাড়াপ্রতিবেশীরা

এদিকে মোনারুলের নিহতের ঘটনায় আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা বা অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। মোনারুলের বড় ভাই মো. মমদেল হোসেন বকসী জানিয়েছেন, লাশ দাফন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তাঁরা মামলা করতে পারেননি। দ্রুতই পরিবারের পক্ষ থেকে সাভার মডেল থানায় মামলা করা হবে।

সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম বলেন, গতকাল বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে ছাত্রদল নেতা মোনারুলের মরদেহ তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখনো কেউ অভিযোগ বা মামলা করেননি।