
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসন থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। তাঁর জয়ের ব্যাপারে দলটির নেতা-কর্মীরা শুরু থেকেই বেশ আশাবাদী ছিলেন। তবে ৩৩ হাজার ৬৫৪ ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থী আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদের কাছে পরাজিত হন তিনি।
স্থানীয় ভোটারদের দাবি, জয়ের ব্যাপারে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, নির্বাচনী প্রচারণায় তুলনামূলক কম উপস্থিতি, মনোনয়নপত্র বাতিল নিয়ে সৃষ্ট বিভ্রান্তি হামিদুর রহমানের পরাজয়ের অন্যতম কারণ। এর বাইরে তরুণ ও নারীদের দাঁড়িপাল্লার পক্ষে তেমন টানতে পারেননি বলে মনে করেন ভোটারেরা।
২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আনসারুল করিমকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন হামিদুর রহমান আযাদ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় প্রায়ই হামিদুর বলে আসছিলেন, জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী তিনি। দলের নেতারাও প্রচারণায় বলেছেন, নির্বাচিত হলে এবং জামায়াত ক্ষমতায় গেলে হামিদুর রহমান আযাদ অবশ্যই মন্ত্রী হবেন।
হামিদুর রহমানের বাড়ি কুতুবদিয়াতে। আসনটিতে জয়ী বিএনপির প্রার্থী আলমগীর ফরিদের বাড়ি মহেশখালী উপজেলায়। কুতুবদিয়ার তুলনায় মহেশখালীর ভোটার অনেক বেশি। এর প্রভাবও নির্বাচনে পড়েছে বলে মনে করেন অনেক ভোটার।
বিএনপির নেতারা বলেন, এবারের নির্বাচনে আলমগীর ফরিদের জয় হবে কি না, তা নিয়ে দলে উদ্বেগ ছিল। কারণ, মহেশখালীতে বিএনপি দ্বিধাবিভক্ত ছিল। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু বক্কর ছিদ্দিকের সঙ্গে আলমগীর ফরিদের বিরোধ ছিল প্রকাশ্যে। তবে নির্বাচনের কয়েক দিন আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ মহেশখালীতে গিয়ে দুই নেতাকে এক মঞ্চে নিয়ে আসেন, আবু বক্করকে আলমগীর ফরিদের পক্ষে প্রচারণায় নামান। কোন্দল মেটার কারণে ধানের শীষের জয় সহজ হয়েছে। আলমগীর ফরিদ এর আগেও দুই বার (১৯৯৬ ও ২০০১ সালে) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
মহেশখালীর কুতুবজোম এলাকার ব্যবসায়ী শাহেদুল ইসলাম ও কফিল উদ্দিন জানান, হামিদুর রহমান আযাদের প্রথম ধাক্কা আসে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়। ২ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র বাছাইকালে তথ্য গোপনের অভিযোগে হামিদুর রহমানের মনোনয়ন বাতিল করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিলের মাধ্যমে তিনি মনোনয়নের বৈধতা ফিরে পান ১০ জানুয়ারি। মনোনয়নপত্র নিয়ে এসব দৌড়াদৌড়িতে হামিদুর রহমান ৮ দিন মাঠে থাকতে পারেননি। এ সময় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকেরা মাঠে ভোটারদের কাছে টানতে কাজ করেছেন, যার প্রভাব ভোটে পড়েছে।
কয়েকজন ভোটার বলেন, হামিদুর রহমানের মন্ত্রী হওয়া নিয়ে দলীয় প্রচারণা ভোটারদের বিভ্রান্ত করেছে। তাঁর জয়লাভের বিষয়েও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস হিতে বিপরীত হয়েছে।
গত ২ ফেব্রুয়ারি দুপুরে হেলিকপ্টারযোগে মহেশখালীতে যান জামায়াত আমির শফিকুর রহমান। বড় মহেশখালী ইউনিয়নের নতুন বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে দাঁড়িপাল্লার জনসভায় তিনি মহেশখালীকে একটি স্মার্ট ইকোনমিক জোন হিসেবে গড়ে তোলার আশ্বাস দেন। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছিলেন, ‘বহু উপজেলা টাউন ভিজিট করেছি, এ রকম বিধ্বস্ত, গরিব, পিছিয়ে পড়া টাউন আর চোখে পড়েনি। কথা দিয়ে যাচ্ছি, আপনারা আমার ভাই হামিদুর রহমান আযাদের হাতে আপনাদের আমানত বুঝিয়ে দিন। আমরা আপনাদের আস্থার প্রতিদান দেব ইনশা আল্লাহ।’
ফলাফলে দেখা গেছে, এবারের নির্বাচনে মহেশখালী উপজেলায় ধানের শীষ পেয়েছে ৯৫ হাজার ২৫৯ ভোট। আর দাঁড়িপাল্লা পেয়েছে ৫৪ হাজার ৫৬৯ ভোট। এই উপজেলায় উভয় প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান—৪০ হাজার ৬৯০। কুতুবদিয়া উপজেলায় দাঁড়িপাল্লা পেয়েছে ৩৫ হাজার ২৪৮ ভোট, আর ধানের শীষ পেয়েছে ২৯ হাজার ৪০১ ভোট। দুজনের ব্যবধান ৫ হাজার ৮৪৭।
আসনটিতে বিএনপি প্রার্থী আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ মোট ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৪৩। অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ পেয়েছেন ৯১ হাজার ৮৮৯ ভোট।
কুতুবদিয়ার কৈয়ালবিল এলাকার ভোটার আমজাদ হোসেন বলেন, ‘হামিদুর রহমানের বাড়ি কুতুবদিয়া হলেও তিনি আঞ্চলিকতাকে কাজে লাগাতে পারেননি। যে কারণে নিজের উপজেলাতে আশানুরূপ ভোট পাননি। জামায়াতের প্রচারণাও ছিল ঢিলেঢালা। জামায়াত নেতারা ধরে নিয়েছিলেন, হামিদুর রহমান এমপি হচ্ছেন, আর এমপি হলে মন্ত্রী হবেন। কিন্তু মাঠের অবস্থা ছিল ভিন্ন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতের একজন শীর্ষ নেতা প্রথম আলোকে বলেন, কক্সবাজারের চারটি আসনের মধ্যে কক্সবাজার-২ ও কক্সবাজার-৪ আসনে জামায়াত প্রার্থীর জয়লাভের বিষয়ে দল আশাবাদী ছিল। কক্সবাজার-৪ আসনে দেড় হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াত প্রার্থী নুর আহমদ আনোয়ারী পরাজিত হয়েছেন।