গ্রেপ্তারের পর পুলিশকে নিজের পরিচয় মশিউর রহমান (সম্রাট) বললেও তাঁর প্রকৃত নাম সবুজ শেখ
গ্রেপ্তারের পর পুলিশকে নিজের পরিচয় মশিউর রহমান (সম্রাট) বললেও তাঁর প্রকৃত নাম সবুজ শেখ

সাভারে ৬ মাসে ৬ লাশ

গ্রেপ্তার আসামি পুলিশকে নিজের ভুল পরিচয় দিয়েছেন, হত্যাকে বলেন ‘থার্টি ফোর’

ঢাকার সাভারে ছয় মাসে ছয়টি লাশ উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তি পুলিশকে নিজের ভুল নাম-পরিচয় দিয়েছেন। তিনি পুলিশ সদস্যদের নম্বর জোগাড় করে তাদের কল দিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলতেন। মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির মতো ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাঁর ব্যাগ তল্লাশি করে একাধিক সিম ও পুলিশ সদস্যদের মুঠোফোনের নম্বর পেয়েছে।

সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সবার কাছে গ্রেপ্তার আসামি নিজের নাম মশিউর রহমান ওরফে সম্রাট বলতেন। গ্রেপ্তারের পর তিনি পুলিশের কাছে নিজেকে সাভারের পৌর এলাকার ব্যাংক কলোনির মৃত সালামের ছেলে বলে পরিচয় দেন। তবে পুলিশ ওই এলাকায় খোঁজ নিয়ে এর সত্যতা পায়নি। পুলিশ বিভিন্ন মাধ্যমে পরে জানতে পারে, গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম সবুজ শেখ। তিনি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মৌছামান্দা গ্রামের পান্না শেখের ছেলে।

পুলিশ কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, সবুজ মিয়া হত্যাকে ‘থার্টি ফোর’ বলেন। ১৮ জানুয়ারি সাভারের পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টার থেকে দুটি পোড়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পরের দিন তাঁকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেছিলেন, ‘থার্টি ফোর’ করেছেন।

গ্রেপ্তার ব্যক্তি সম্পর্কে লোকজনের ভাষ্য

সাভার মডেল থানার মূল ফটক থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কাছেই সাবরেজিস্ট্রারের অফিস। ফলে সব সময়ই এখানে লোকজনের আনাগোনা থাকে। সেবাপ্রত্যাশী লোকজনের পাশাপাশি পুলিশ সদস্য ও সাংবাদিকসহ অনেকেই এখানকার চায়ের দোকানে সময় কাটান।

রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় সে (সবুজ শেখ) প্রায়ই লোকজনকে গালিগালাজ করত। থার্টি ফোর কইরা দিছি বলে চিৎকার করত।
মো. রহমান, স্থানীয় বাসিন্দা

সেখানকার লোকজনের ভাষ্য, এই এলাকাতেই উদ্দেশ্যহীনভাবে প্রায় তিন বছর ধরে সম্রাট পরিচয়ে ঘোরাঘুরি করতেন সবুজ শেখ। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় তাঁকে সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকার পদচারী–সেতুতেও দেখা যেত। পুলিশ বলছে, আগে সাভার মডেল মসজিদ এলাকায় থাকলেও পরে পরিত্যক্ত ওই পৌর কমিউনিটি সেন্টারে থাকতেন সবুজ।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে পৌর কমিউনিটি সেন্টার গিয়ে দেখা যায়, দোতলা ভবনটির জানালা ও দরজা ভাঙা, বিভিন্ন স্থানের দেয়াল ও ছাদের পলেস্তারা খুলে গেছে। দেয়াল ও ছাদের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ৫ আগস্ট দেওয়া আগুনের কালো ছাপ। দ্বিতীয় তলার টয়লেটে পোড়া কাপড়। নিচতলায় একটি অংশে জড়ো করে রাখা বেশ কিছু কাঁথা-কম্বল। ভবনের পেছন দিকে ঢাকনা খোলা সেপটিক ট্যাংক।  

সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনের চায়ের দোকানদার আশরাফ আলী বলেন, ‘সম্রাট (সবুজ শেখ) দিনে পাঁচ-সাতবার পোশাক বদলাইতো। দামি দামি জুতা, জামাকাপড় কই পাইতো জানি না। কানে হেডফোন দিয়া থাকতো। ছোট স্পিকার দিয়া জুরে জুরে গান শুনতো। অনেকে তাঁরে পাগল কইতো। আমার কাছে পাগল মনে হইতো না। গোয়েন্দা হইতে পারে মনে করতাম।’

স্থানীয় মো. রহমান নামের একজন বলেন, ‘রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় সে (সবুজ শেখ) প্রায়ই লোকজনকে গালিগালাজ করত। থার্টি ফোর কইরা দিছি বলে চিৎকার করত।’

একেক সময় দেন একেক তথ্য

১৯ জানুয়ারি গ্রেপ্তারের দিনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে দেন সবুজ মিয়া। তখন তিনি বলেন, যারা ‘অসামাজিক কর্মকাণ্ড’ করতেন, তাঁদের তিনি হত্যা করতেন। তবে পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছিলেন যে তিনি যেখানে থাকেন, সেখানে অন্য কেউ থাকতে শুরু করলে তিনি সহ্য করতে পারতেন না। তাঁদের তিনি হত্যা করতেন।

মরদেহ উদ্ধারের পর দ্রুত সময়ের মধ্যেই সবুজকে আইনের আওতায় আনা হয়। বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলেও দ্রুত সময়ে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে তাঁর পরিচয় বের করা হয়েছে।
আরাফাতুল ইসলাম, ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার

দুই পোড়া লাশ উদ্ধারের ঘটনায় হওয়া মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক মো. ফাইজুর খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার আসামি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য আমাদের দিয়েছেন। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ছয়জনকে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।’

ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস ও ট্রাফিক উত্তর) আরাফাতুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মরদেহ উদ্ধারের পর দ্রুত সময়ের মধ্যেই সবুজকে আইনের আওতায় আনা হয়। বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলেও দ্রুত সময়ে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে তাঁর পরিচয় বের করা হয়েছে। তিনি আইনশৃঙ্খলা–বহির্ভূত আরও কোনো ঘটনার সঙ্গে জড়িত বা ঘটিয়েছেন কি না, সে ব্যাপারে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত আছে।’

দুটি লাশের একটির পরিচয় মিলেছে

সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার থেকে উদ্ধার দুটি মরদেহের মধ্যে একজনের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। তাঁর নাম তানিয়া আক্তার (২৫)। তিনি ১ জানুয়ারি রাজধানীর উত্তরা থেকে নিখোঁজ হন। নিখোঁজের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিল তাঁর পরিবার। তিনি অটিজমে আক্রান্ত ছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনার আগের দিনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সেই ভিডিও দেখে তানিয়াকে শনাক্ত করেন পরিবারের সদস্যরা।  

সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, গত বছরের ৪ জুলাই সাভার মডেল মসজিদের পাশের একটি চায়ের দোকানের পেছন থেকে আসমা বেগমের (৭৫) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। শুরুতে এটি বার্ধক্যের কারণে মৃত্যু বলে মনে করেছিল পুলিশ। তবে ময়নাতদন্তের পর শ্বাসরোধে হত্যাকাণ্ড বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

এর প্রায় এক মাস পার ২৯ আগস্ট বিকেলে সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষ থেকে গলায় ওড়না প্যাঁচানো এবং দুই হাত গামছা দিয়ে বাঁধা অবস্থায় অজ্ঞাতনামা পুরুষের (৩০) অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রায় দেড় মাস পর ১১ অক্টোবর বিকেলে ওই ভবনের একই তলা থেকে অজ্ঞাতনামা নারীর (৩০) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রায় আড়াই মাস পর ১৯ ডিসেম্বর একই তলা থেকে আগুনে পোড়া অর্ধগলিত অজ্ঞাতনামা পুরুষের (৩৫) মরদেহ উদ্ধার হলে ভবনটি সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়। সর্বশেষ ১৮ জানুয়ারি একই তলা থেকে দুজনের আগুনে পোড়া মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।